যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে আপস করবেন না

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২০
মিরপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর না করে ঘরে ফিরবে না বলে শপথ নিলেন লাখো মানুষ। গতকাল মিরপুরের দশ নম্বর গোল চক্করে লাখো মানুষ সমবেত হয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে। গণজাগরণ মঞ্চ থেকে আন্দোলনের নেতা ইমরান এইচ সরকার বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয়দাতা জামায়াত-শিবির চক্র দেশ ও মানবতার শত্রু। জামায়াত-শিবির ধর্মকে ব্যবহার করে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। মসজিদকে অপবিত্র করে আগুন জ্বালানো, বোমাবাজি, বায়তুল মোকাররমের খতিবকে লাঞ্ছিত করার মত ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা। জামায়াত-শিবিরের হয়ে ধর্মের নামে মিথ্যা অপবাদ ছড়াচ্ছেন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। ধর্মকে ব্যবহার করে মুসল্লিদের উস্কানি দিচ্ছেন তিনি। গণজাগরণ মঞ্চের তরুণরা আলটিমেটাম দেয়ার পরও সরকার তাকে গ্রেফতারে গড়িমসি করছে। তিনি সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে আপস করবেন না। মানুষ মেনে নেবে না। তিনি বলেন, মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেব। আমরা অহিংস আন্দোলন করছি বলে আমাদের দুর্বল মনে করবেন না। ইমরান এইচ সরকার আরো বলেন, দৈনিক আমার দেশ আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। মাহমুদুর রহমান টাকার জোরে সম্পাদক হয়ে মিথ্যাচার করে নাস্তিকতার বুলি সারা দেশে ছড়িয়েছেন। তিনি পাকিস্তানের নীল-নকশায় আরো একটি পাকিস্তান-আফগানিস্তান বানাতে চান। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের দেহে এক ফোঁটা রক্ত থাকতে তার এ স্বপ্ন পূরণ হবে না। এদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে আর কোন চেতনা থাকবে না। তিনি বলেন, জামায়াত-শিবির রবিবারের হরতালে পাকিস্তান থেকে লোক ভাড়া করে এনেছে। তারা গ্রেফতার হয়েছে। পাকিস্তান থেকে উগ্রপন্থিদের ভাড়া করে এনে বাঙালিদের রক্তাক্ত করে তারা পাকিস্তানের তাঁবেদারি করে। দেশের চাল খেয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করছে। জামায়াত-শিবিরকে সন্ত্রাসী সংগঠন উল্লেখ করে তিনি অবিলম্বে তাদের নিষিদ্ধ করার দাবি তোলেন। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে শাহবাগের বাইরে মিরপুরে দ্বিতীয় সমাবেশ করল গণজাগরণ মঞ্চ। গতকাল লাল সবুজ পতাকা হাতে নিয়ে আর যুদ্ধাপরাধীদের শ্লোগান মুখে নিয়ে গোলচক্করে ছুটে এসেছিলেন মিরপুরবাসী। স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের হাত ধরে এসেছিলেন শিক্ষার্থীরা। মা-বাবার সঙ্গে ছোট্ট শিশুরা যেমন এসেছিল, তেমনি এসেছিলেন শ্রমিক, রিকশাচালকসহ সর্বস্তরের মানুষ। বিকালে হাজার হাজার মানুষের এই সমাবেশ জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। জাতীয় সঙ্গীতের পর একাত্তরের সব শহীদ এবং পিলখানা বিদ্রোহে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর সমাবেশে পোড়ানো হয় যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লার কুশপুত্তলিকা। একাত্তরে মিরপুরে এই জামায়াত নেতার যুদ্ধাপরাধের বিবরণ সমাবেশে তুলে ধরেন ইমরান সরকার। এরপর দুটি ট্রাকের ওপর নির্মিত মঞ্চ থেকে বক্তব্য দেন ছাত্র নেতারা। ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকারের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি হোসাইন আহমেদ তফছির, সাধারণ সম্পাদক শামসুল ইসলাম, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাসান তারেক, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক তানভীর রুসমত, ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সদস্য কল্যাণ দত্ত, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক হিল্লোল রায়, ছাত্র ঐক্য ফোরামের আহ্বায়ক সোহান সোবহান, ছাত্র ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান। সমাবেশ পরিচালনা করেন যুব ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক খান আসাদুজ্জামান মাসুম এবং ব্লগার মারুফ রসুল। সমাবেশ নির্বিঘ্ন করতে দুপুর থেকেই ১০ নম্বর গোল চক্কর সংলগ্ন রাস্তাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। আগারগাঁও, সনি সিনেমা হল, ১৪ নম্বর এবং পল্লবী থেকে গোল চক্করমুখী রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মিরপুরের পর বৃহস্পতিবার আরেকটি সমাবেশ হবে রাজধানীর বাণিজ্য কেন্দ্র মতিঝিলে। জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজার রায় প্রত্যাখ্যান করে তার ফাঁসির দাবিতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগের এই আন্দোলন শুরু হয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। জাগ্রত শাহবাগ শ্লোগানে, গানে, গণস্বাক্ষরে, মুক্তিযুদ্ধের গল্পে গতকাল সোমবার শাহবাগে গণজাগরণের ২১তম দিন পার করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। মিরপুরে গণজাগরণ মঞ্চের মূল কর্মসূচি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলেও শাহবাগের শ্লোগান থামেনি। সড়কের একপাশে জমায়েত হয়ে সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসিসহ ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা। সন্ধ্যায় মিরপুরের সমাবেশ শেষ হওয়ার পর শাহবাগে জমায়েত বাড়তে থাকে। রাতে হাজারো মানুষ দাবি আদায়ে শ্লোগান তোলেন। সময়ভেদে জমায়েত হওয়া মানুষের সংখ্যা কম-বেশি হলেও দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই জাগ্রত রয়েছে শাহবাগ। এর আগে গতকাল দুপুরে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে মিরপুরের দিকে যাত্রা করেন আন্দোলনরতরা। যাওয়ার পথে শ্লোগান, প্ল্যাকার্ড, পোস্টারের মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরেন তারা। একইসাথে ছয় দফা দাবির পক্ষে গতকালও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পুরোদমে চলে। সকাল সোয়া নয়টার দিকে শুরু হওয়া গতকালের গণস্বাক্ষর কর্মসূচি চলে গভীর রাত পর্যন্ত। গতকাল হাজারো মানুষ দাবির পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন বলে জানিয়েছে প্রজন্ম চত্বরের মিডিয়া সেল। এদিকে আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে গণগ্রন্থাগারের সামনে মুক্তিযুদ্ধের গল্প উপস্থাপন করেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। গেরিলা-মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প শুনেন উপস্থিত নানা বয়স ও পেশার মানুষ। তিনদিকের সড়কে যান চলাচল শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ সংলগ্ন তিনদিকের সড়ক সাময়িকভাবে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। ছয় দফা দাবিতে চলমান এ আন্দোলনের ২১তম দিনে মিরপুরে সমাবেশের কারণে গতকাল শাহবাগে মানুষের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম। তাই গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে শাহবাগ মোড়ের তিনদিকের সড়ক যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় পুলিশ। গত ৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া আন্দোলনের পর থেকেই শাহবাগ মোড় দিয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। কয়েকদিন অল্প সময়ের জন্য দুইদিকের সড়ক উন্মুক্ত থাকলেও গতকালই প্রথম এ চার রাস্তা মোড়ের তিনদিকের সড়ক খুলে দেয়া হয়। শাহবাগ মোড় থেকে মত্স্যভবন, কাঁটাবন ও হোটেল রূপসী বাংলার দিকের সড়কে যান চলাচল শুরু হয়। তবে টিএসসির দিকের রাস্তা আগের মতোই বন্ধ রয়েছে।