২৫ ফেব্রুয়ারি শোক দিবস ঘোষণার দাবি, বনানী কবরস্থানে শোক-শ্রদ্ধা

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২৬
গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় পিলখানায় বিজিবি (সাবেক বিডিআর) সদর দফতরে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার বনানীর সামরিক কবরস্থানে নিহতদের পরিবারের সদস্য, সামরিক-বেসামরিক লোকজন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও রাজনীতিকরা নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। গভীর শোক ও ভালোবাসায় হাত বুলিয়ে নিহতদের কবর স্পর্শ করতে দেখা গেছে স্বজনদের। কারো বুক ফাটা কান্না আর কারো নীরবে অশ্রু বিসর্জন। সৃষ্টি হয় এক বেদনবিধুর পরিবেশের। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা বিজিবির সদর দফতরে কিছু উচ্ছৃংখল বিপথগামী বিজিবি সদস্য স্মরণকালের বর্বরোচিত এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ও একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন এ ঘটনায়। গতকাল ছিল তাদের চতুর্থ শাহাদাত বার্ষিকী। শহীদ পরিবারের সদস্যরা ২৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় শোক দিবস ও এই দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন। জাতীয় জাদুঘরে নিহতদের স্মৃতিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করারও দাবি জানান তারা। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচার করার দাবি জানানো হয়। সকাল ১০টায় রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কাজী ফকরুদ্দিন আহমেদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল জয়নুল আবেদীন বীর বিক্রম শহীদদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর ও স্বরাষ্ট্র্র প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট শামসুল হক টুকু, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূইয়া, নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস এডমিরাল মুহাম্মদ ফরিদ হাবিব, বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল মোহাম্মদ ইনামুল বারী সম্মিলিতভাবে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সি কিউ কে মোস্তাক ও বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ শহীদদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ স্যালুট প্রদান করেন। পরে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়। এছাড়া সকাল থেকে জোহর পর্যন্ত সকল সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মসজিদে স্ব স্ব এরিয়ার তত্ত্বাবধানে কোরআন খতম, বাদ জোহর শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। উক্ত মাহফিলে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। আওয়ামী লীগের পক্ষে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এবং যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব-উল-আলম হানিফের নেতৃত্বে এবং বিএনপির পক্ষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান ও বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে শহীদদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ সময় বস্ত্রমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর ও মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মুছে যাবে না স্মৃতি নিহত মেজর মিজানুর রহমানের মা কোহিনুর বেগম ছেলের কবর ধরে কাঁদছেন তো কাঁদছেন। বুকফাঁটা আর্তনাদ করে বলেন, বাবারে একবার মা বলে ডাকো, কতদিন তোমার ডাক শুনিনি। তার কান্না দেখে সেখানে উপস্থিত সেনা কর্মকর্তা, সেনা সদস্য ও স্বজনহারাদের অঝোরে চোখের পানি ঝরতে থাকে। এ সময় মেজর মিজানের বড় ছেলে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র রামী ও ৩ বছরের ছোট ছেলে সামী উপস্থিত ছিলেন। মেজর মো. মমিনুলের স্ত্রী সানজানা স্বামীর কবর ধরে করেছেন আহাজারি। এ সময় মমিনুলের ৪ বছরের শিশুপুত্র সাদাকাত উপস্থিত ছিল মায়ের সঙ্গে। মা-পুত্রকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা কারো ছিল না। লে. কর্নেল সাজ্জাদুর রহমানের দুই পুত্র মওতাসীন ও ইসহাক এসে বাবার কবর ধরে অসহায়ের মত কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এ সময় তারা এই প্রতিনিধিকে জানায়, আমরা কখনো ভাবিনি বাবা এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। এটা আমাদের নিয়তি। এ স্মৃতি কোনদিন মুছে যাবে না। দুই ভাই আদমজী স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্র। মেজর রফিকুল ইসলামের স্ত্রী শাহীন আকতার দুই শিশুপুত্র শাকিব ও রাগীব শাহরিয়ারকে নিয়ে স্বামীর কবর ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। মেজর এসএম মামুনুর রহমানের মা খালেদা আকতার পুত্রের কবর ধরে চিত্কার করে বলেন, বাবা তোর হত্যাকারীদের বিচার আমি দেখে যেতে চাই। এ সময় মেজর মামুনের ভাই ডা. শহীদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। মেজর হুমায়ুন হায়দারের কবরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিন বোন রোকশানা পারভীন, শানজিলা পারভীন ও শারমিনা পারভীন। কর্নেল শওকত ইমামের স্ত্রী নুসরাত, মেয়ে স্কলাস্টিকার ছাত্রী সুমেরা ও বোন শেলী অঝোরে চোখের পানি ছেড়ে বলেন, আর কতকাল এভাবে চোখের পানি ছাড়বো। দেখতে চাই খুনিদের ফাঁসি। কর্নেল কুদরাত এলাহীর পিতা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান কান্না বিজড়িত কণ্ঠে জানান, এদেশে ভাষা দিবস হয়েছে, আরও অনেক দিবস পালন করা হয়। শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে ২৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় শোক দিবস ও সরকার ছুটি ঘোষণার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান। খুনিদের দ্রুত বিচার করে স্বজনহারাদের কান্না থেকে রেহাই দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই আহ্বান জানিয়েছেন লে. কর্নেল লুত্ফুর রহমানের বোন তাসলিমা রহমান ও ভাই অ্যাডভোকেট এহতেশাম রহমান খানসহ সকল স্বজনহারা পরিবারের সদস্যরা।