তরুণ প্রকাশক মাজেদুল হাসান পায়েল। রবিবার রাতের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তার স্টল ‘জয়তী’। আগুনে পুড়ে যাওয়া স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আবেগ সংযত করতে পারলেন না। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘আগুনে আমার স্টল নয়, আমার স্বপ্ন পুড়ে ছাই গেছে। আমার সকল সঞ্চয় এই স্টলে লগ্নি করেছিলাম। কিন্তু, আগুনে পুড়ে সব শেষ। জানি না, কিভাবে এর থেকে নিজেকে গোছাতে পারবো।’
পায়েলের এই হাহাকার গুমড়ে ফিরছে পুরো বইমেলায়। যারা গতকাল মেলায় এসেছিলেন তারাও শোক জানালেন ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের প্রতি। পুরো বইমেলাতেই শোকের আবহ। আগুনে পুড়ে ২৭টি স্টল ছাই হয়ে যাওয়ায় সোমবার মেলায় পাঁচ মিনিট বিক্রি বন্ধ করে সমবেদনা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন প্রকাশকরা। তারা মেলার তথ্যকেন্দ্রের সামনে এ মৌন সমাবেশ করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশক পললের স্বত্বাধিকারী খান মাহবুব বলেন, ‘নাশকতা বা দুর্ঘটনা যা-ই হোক না কেন, এর দায় বাংলা একাডেমী এড়াতে পারে না। কেননা, মেলা বন্ধের পর বইপুস্তক কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তায় রেখে প্রকাশ করা চলে যান পরদিন যথাযথভাবে বুঝে পাওয়ার নিশ্চয়তায়। গত কয়েক বছর ধরে এটাই চলে আসছে।’
মুক্তদেশ প্রকাশনের প্রকাশক জাভেদ ইমন বলেন, ‘বাংলা একাডেমীর কাছে মেলার এ এক মাস সকল জিনিস গচ্ছিত ছিল। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবের কারণেই অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। একাডেমী স্টল পুনর্বাসন করে দিয়েছেন। কিন্তু, এতে লাভ কি? বই আনবো কোথা থেকে? আমার স্টলের সব বই ছাই হয়ে গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখন আমাদের দাবি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যেহেতু বাংলা একাডেমী আমাদের বইয়ের নিরাপত্তা দিতে পারেনি, তাই তাদেরকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’ একাডেমী সূত্র জানায়, রবিবার রাতের আগুনে পুরোপুরি পুড়ে যাওয়া স্টলের মধ্যে রয়েছে ২৫টি বেসরকারি প্রকাশনা সংস্থা ও দুইটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও পর্যটন বিভাগ। ব্যক্তি মালিকানাধীন স্টলের মধ্যে রয়েছে- রূপ, সিদ্দিকীয়া, শিরীন, পারিজাত, বর্ণবিচিত্রা, মূর্ধণ্য, মুক্তদেশ, গদ্যপদ্য, পলল, পলাশ, জয়তী, কিশোর ভূবন, চারুলিপি, কাশবন, তৃপ্তী প্রকাশ কুঠি, দি রয়েল পাবলিকেশনস, ঘাস ফুল নদী, নিমফিয়া, ঐক্য, গাজী প্রকাশনী, জ্যোস্না, শৈলী, গতি, পাঠক সমাবেশ, বিউটি বুক হাউস ও হাসি প্রকাশনী।
এদিকে মেলা প্রাঙ্গণে আগুনের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে প্রকাশকদের মধ্যে। বেশির ভাগ প্রকাশক বলেছেন, এটা পূর্বপরিকল্পিত এবং অবশ্যই নাশকতা। তাদের আরো অভিযোগ, একাডেমী কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শিতার কারণেই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। শ্রাবণ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী রবীন আহসান বলেন, রাতের অন্ধকারে স্টল পোড়ার জন্য সব দায়-দায়িত্ব বাংলা একাডেমীকেই নিতে হবে। বাংলা একাডেমী অন্য কোনও চেষ্টা করলে ক্ষতিপূরণ প্রদানে বাধ্য করা হবে।
এ প্রসঙ্গে একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান জানান, এ ঘটনায় ইতিমধ্যে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলো হচ্ছে- কারিগরি কমিটি, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কমিটি ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা কমিটি। বিদ্যুতের শট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে বলে মনে হয় না। কারণ রাত ৯টায় মেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর স্টলগুলোর বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এ কারণে সে আশংকা নেই।
আজ প্রকাশকদের সাংবাদিক সম্মেলন
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে আজ মঙ্গলবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন প্রকাশকদের সব কয়টি সমিতি। তারা জানান, আজ বিকেল ৫টায় মেলার তথ্যকেন্দ্রের সামনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রবাসী লেখক পুরস্কার প্রদান
সোমবার মেলার মূলমঞ্চে প্রদান করা হয় বাংলা একাডেমী প্রবাসী লেখক পুরস্কার ২০১২। কথাশিল্পী সালেহা চৌধুরী এবং ডা. মাসুদ আহমেদকে সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য এ পুরস্কার ২০১২ প্রদান করা হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদ্বয়ের হাতে পুষ্পস্তবক, পুরস্কারের চেক, ক্রেস্ট এবং সনদ তুলে দেন একাডেমীর সভাপতি ড. আনিসুজ্জামান ও মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।
নতুন বই : একাডেমীর সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সোমবার মেলার ২৫তম দিনে ৭৭টি নতুন বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ১৪, উপন্যাস ১৩, প্রবন্ধ ৬, কবিতা ১৮, গবেষণা ৩, ছড়া ৫, শিশুসাহিত্য ১, জীবনী ১, মুক্তিযুদ্ধ ২, নাটক ১, ইতিহাস ১, রাজনীতি ১, রম্য/ধাঁধা ১, অনুবাদ ২ এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর এসেছে ৮টি নতুন বই।
এছাড়াও সোমবার মেলার নজরুল মঞ্চে ১৫টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বসাহিত্য ভবন এনেছে মোনায়েম সরকারের নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ, এ এইচ ডেভেলপমেন্ট পাবলিশিং হাউস এনেছে এম শাহজাহান মিয়ার ‘সমস্যা ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’, শ্রাবণ এনেছে নাসির আলী মামুনের ‘আহমদ ছফার সময়’, চারুলিপি এনেছে আহমাদ মাযহারের ‘কিশোর বিশ্বসাহিত্যসংগ্রহ’, ধ্রুবপদ এনেছে কাজী মাহমুদুর রহমানের ‘মুক্তিযুদ্ধের দশটি নাটক’, পার্ল পাবলিকেশন্স এনেছে নুরুন নাহার খানের ‘জ্যোত্স্না স্নানে ভেজাবো তোমাকে’, অনন্যা এনেছে হানিফ সংকেতের ‘নিয়মিত অনিয়ম’, মো. জেহাদ উদ্দিনের ‘নজরুল: সাম্যে, প্রেম দ্রোহে’ প্রভৃতি।
মেলামঞ্চের আয়োজন : সোমবার বিকেলে মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘চারুশিল্পের অগ্রপথিক ও কীর্তিমান শিল্পপুরুষ রশিদ চৌধুরী’ শীর্ষক আলোচনা সভা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি ও শিল্পসমালোচক রবিউল হুসাইন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী, স্থপতি সামসুল ওয়ারেস এবং চিত্রসমালোচক মঈনুদ্দীন খালেদ। সভাপতিত্ব করেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। সন্ধ্যায় রিফাত নিগার শাপলার পরিচালনায় ‘শাপলাকলির আসর’ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন।
আজকের আয়োজন :আজ মঙ্গলবার বিকেলে মেলার মূল মঞ্চে রয়েছে ‘বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের শতবর্ষ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ফিরোজ মাহমুদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন সাইফুদ্দীন চৌধুরী, প্রকাশ চন্দ্র দাস এবং হাশেম সূফী। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরী। যথারীতি সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
