সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ফলে ১৯৭৫ এবং ১৯৮২ সালে সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো অকার্যকর হওয়ায় তা আবার আইনে পরিণত করতে জাতীয় সংসদে পৃথক দু’টি বিল পাস হয়েছে। অধ্যাদেশগুলো জারি করা হয়েছিল সামরিক শাসনামলের সাবেক দুই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও এইচএম এরশাদের সময়।
গতকাল সোমবার বিকালে ডেপুটি স্পিকার কর্ণেল (অব.) শওকত আলীর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বিল দু’টি পাসের প্রস্তাব করেন। পরে কণ্ঠভোটে বিল দু’টি পাস হয়। একটি বিল হলো ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে জারিকৃত কতিপয় অধ্যাদেশ কার্যকরণ (বিশেষ বিধান) বিল-২০১৩’ এবং দ্বিতীয়টি ‘১৯৮২ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে জারিকৃত কতিপয় অধ্যাদেশ কার্যকরকরণ (বিশেষ বিধান) বিল-২০১৩।’
১৯৭৫ এবং ১৯৮২ সালের সামরিক আইনের সময়ের ৫৪৫টি অধ্যাদেশ কার্যকর করতে বিল দু’টি আনা হয়। এর আগে এ অধ্যাদেশগুলো কার্যকর রাখতে দু’টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। গত ২৭ জানুয়ারি সংবিধানের ৯৩ (২) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী অধ্যাদেশগুলো সংসদে উপস্থাপন করা হয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে আপিল বিভাগের দু’টি রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে ১৯ অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করা হয়। পরে সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর এবং পরে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত মার্জনা করা হয়। সামরিক আইন নিয়ে যাতে ভুল বোঝাবুঝি না হয় সেজন্য সংসদীয় কমিটি বিলে শর্ত জুড়ে দিয়ে বলেছে, এই ধারার অধীন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে জারি করা অধ্যাদেশ কার্যকর করা হলেও যতটুকু তাদের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শুধু ততটুকু গ্রহণ করা হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। ওই সময়ের অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন সামরিক শাসনামলের কৃতকর্মের অনুমোদন ও সমর্থন করা হয়েছে বলে কোনোভাবেই বিবেচিত হবে না।
বিলের রিপোর্টে সংসদীয় কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বি মিয়া বলেন, বিলটি অবয়বে ছোট হলেও এর সঙ্গে কম-বেশি ৮৫টি মূল অধ্যাদেশ ও ১৫১টি সংশোধিত অধ্যাদেশ জড়িত। দীর্ঘদিনের সরকার পরিচালনার প্রয়োজনে বিভিন্ন সরকার অনেক অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। ফলে কিছু কিছু অধ্যাদেশ এরইমধ্যে কার্যকারিতা হারিয়েছে। কমিটি মনে করছে, অধ্যাদেশ দু’টি জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়। তবে তফসিলে উল্লিখিত অধ্যাদেশগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে বিল উত্থাপন করা উচিত ছিল। তিনি আরও বলেন, মন্ত্রণালয়গুলো তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে ও সময়মত পালন না করায় সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার দায়-দায়িত্ব বর্তমান সংসদীয় কমিটির ওপর পড়েছে। অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন সামরিক শাসনামলের কাজ গণতান্ত্রিক সরকার অনুমোদন ও সমর্থন করছে যাতে করে এরূপ ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয় । সেজন্য কমিটি একটি শর্তাংশ যোগ করেছে।
বিল দু’টির উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ওই অধ্যাদেশগুলো ও তার অধীন প্রণীত বিধি, প্রবিধান বা আদেশবলে কৃত কাজ-কর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাগুলো চলমান রাখাসহ উক্ত সময়ে জারিকৃত কতিপয় সংশোধনী অধ্যাদেশ দ্বারা প্রচলিত কতিপয় আইন সংশোধন করা হয়েছে বিধায় আইনের শাসন, জনগণের অর্জিত অধিকার সংরক্ষণ এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মের ধারাবাহিকতা বহাল ও অক্ষুণ্ন রাখার নিমিত্ত, জনস্বার্থে, উহাদের কার্যকারিতা প্রদান করা প্রয়োজন। আরও বলা হয়েছে, ওই অধ্যাদেশগুলোর অধীন সূচিত কার্যধারাগুলো বা গৃহীত ব্যবস্থা বা কাজ-কর্ম বর্তমানে অনিষ্পন্ন বা চলমান থাকলে, জনস্বার্থে ওই কার্যধারাগুলো বা গৃহীত ব্যবস্থা বা কাজ-কর্ম চলমান রাখা এবং জনজীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জনসাধারণের অধিকার সুরক্ষার স্বার্থে ওই অধ্যাদেশগুলো কার্যকর করা এবং এদের কার্যকারিতা হারাবার ফলে সৃষ্ট আইনি শূন্যতা পূরণ করা আবশ্যক।
