অবনীদের ইচ্ছেপূরণ

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:০৩
আপু। এত্তো সকালে কোথায় যাও? একদিন নয়। দুদিন নয়। প্রতিটা দিন। চুপ। ঘুমো। আমি কোথায় যাই। তা জানার তোর দরকারটা কি? যদি মা এসে যান। তখন আমি কি বলব? মা এতো সকালে কোনোদিনই আসবেন না। বলেই হনহনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় অবনী। রবি খানিকটা সময় ভেবে নিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। ভোরের গ্রাম্য প্রকৃতি। মৃদুমন্দ বাতাসের একটা সজীবতা। আর স্নিগ্ধ শীতল আবেশ। যা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেহ ও মনকে সতেজ করে তোলে। তেমনই সতেজ হয়ে ওঠে অবনীর মনটাও। সে মৃদু পায়ে হাঁটতে থাকে। দুর্বাঘাস। ডগায় ডগায় বিন্দু বিন্দু ওস। টলমল করতে করতে ঝুলে আছে। অবনীদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে তাদের বড় পুকুরটা। তারই পাড় ধরে টানা লম্বাভাবে ঝোপ-ঝাড়ে পূর্ণ হয়ে আছে। ওখানে বেতঝাড়টা সবুজের সমারোহে আলাদা একটা সৌন্দর্য নিয়ে আছে। অবনী পুকুরপাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। তার চোখের সামনে অসংখ্য প্রজাপতি উড়াউড়ি করছে। প্রথমে চোখ ভরে দৃশ্যটা দেখে নেয়। তারপর মমতা জড়ানো কচি হাতে ওদের পাখায় ছুঁতে চেষ্টা করে। পারে না। উড়ে যায়। ধারে-কাছে কোথাও গিয়ে বসে। অবনী উড়ু উড়ু মনে বার বার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়। তবু খুশিতে মনটা ভরে থাকে। পুকুরটার দক্ষিণ কোণে পাশাপাশি কয়েকটা আম ও জাম গাছ। গাছগুলোর পেছনে বিরাট বড় একটা বাঁশঝাড়। বাঁশগুলো বেশ ঘন। বাঁশঝাড়ে নানা জাতীয় অসংখ্য পাখির বসবাস। সকাল -সন্ধ্যা পাখির ডাক। পুরো গ্রামটাই মুখর হয়ে থাকে। অবনী বাঁশঝাড়টার নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। কখনো এদিক-ওদিক, কখনো আবার উপরের দিকে তাকায়। তখন অনেক পাখি গাছ থেকে নিচে নেমে আসে এবং মিষ্টিস্বরে অবনীর সঙ্গে কথা বলে। অবনী গভীর আগ্রহে জানতে চায়। ওরা সারাদিন কোথায় থাকে। কোন্ অঞ্চলে যায়। প্রত্যেকদিন কি একই অঞ্চলে যায়? না এক-একদিন এক এক অঞ্চলে। কোন্ এলাকাটা ভালো। কোথায় খাদ্য সংগ্রহ করা সহজ এবং বিপদের আশঙ্কা কম। অনেক দূরে চলে গেলে সন্ধ্যার আগে ফিরে আসতে কষ্ট হয় কিনা? এমনই আরো হাজারোরকমের কথা। তার মনে যা ইচ্ছে জাগে তাই জিজ্ঞাসা করে। পাখিরাও অবনীর সঙ্গে কথা বলে অনেক আনন্দ পায়। অনেক সময় তাদের কষ্টের কথা বলে বুকটা হালকা করে নেয়। মাঝে মাঝে অবনী তাদেরকে সান্ত্বনা দেয়। বাচ্চাদেরকে অধিক আদর করতে বলে। বেশি দূরে যেতে নিষেধ করে। পাখিরা অবনীকে তাদের রানি বলে ডাকে। তখন তার খুবই ভালো লাগে। সেখান থেকে নেমে আসে পুকুর ঘাটে। পুকুরের স্বচ্ছ জল হালকা কুয়াশায় ঢাকা বলে কেমন যেন আবছা আবছা দেখায়। তখন আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে মজা নিতে ইচ্ছে করে তার। পুকুরের অর্ধেকটায় শাপলা ফুটে আছে। যা অসাধারণ একটা দৃশ্য। অবনীর বড় ইচ্ছে করে শাপলা ফুলের মালা গাঁথতে। আর তা গলে পরে এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু পারে না। কারণ প্রতিদিন শাপলা ছিঁড়ে নিলে একদিন পুকুরটাই শাপলাশূন্য হয়ে পড়বে। তখন এই সৌন্দর্য আর থাকবে না। তাই প্রতিটা দিন খুব ভোরে গিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে চোখ জুড়িয়ে যায়, মনটাও খুশিতে ভরে যায়। মাঝে মাঝে পুকুরে ডুবিয়ে ডুবিয়ে গোসল করতে ইচ্ছে করে তার কিন্তু পারে না। কারণ বাবা রাগ করবেন। ধমক ঝেড়ে বলবেন অবনী মেয়েদের খোলা আকাশের নিচে গোসল করতে নেই। প্রতিদিনকার মতো ঘুরে উঠোনে এসে দাঁড়ায় অবনী। গতকাল খবরটা শোনার পর থেকেই তার দুর্ভাবনাটা বেড়েই যাচ্ছে। রাতেও ভালো ঘুম হয়নি। যে অন্ধকারটা ধেয়ে আসছে। তা প্রতিরোধ করা কি সম্ভব? তবে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাবে। অবনী একবার ভাবে ছোট ভাই রবি আর মাকে নিয়ে বাবার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। আরেকবার ভাবে এই কাজটা ঠিক হবে না। কারণ বাবা একগুঁয়ে ও জেদি মানুষ। একবার না করে বসলে তাকে আর হ্যাঁ করানো যাবে না। আর যদি রেগে যান তা হলে কি রক্ষা আছে। অবনী বুকে সাহস নিয়ে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার পেছনে যায় ছোট ভাই রবিও। বাবা তোমাকে একটা অনুরোধ করতে এসেছি। অনুরোধটা কি রাখবে বাবা? অবনী তুমি তো কখনো এমন করে কথা বলোনি। একি। তোমার চোখে পানি। বলো। যতো কঠিনই হোক, তোমার কথাটা আমি রাখবই। বাবা, আমাদের ওই দক্ষিণের জমিটুকু বিক্রি না করলে কি হয় না। তুমি কি চাও না। আমাদের সংসারে আরো স্বচ্ছলতা আসুক। তোমাদের জন্য অর্থবিত্ত রেখে যাই। একটা মোটা অঙ্কের টাকা পাব। তা ছাড়া বড় ধরনের একটা কারখানা হবে। এই এলাকার অনেক লোক কাজ করবে। এতে কি কম উপকার হবে? অবনী বিনীত গলায় বলল, এখন কি কম উপকার হচ্ছে বাবা? রবি, তুমি কি বলো? এটা শুধু আপুর দাবি নয়। আমারও দাবি। গ্রামবাসীরও দাবি। তাই! ঠিক আছে যাও। কথা দিলাম। ওই জমি আমি আর কখনো বিক্রি করব না। তাদের ইচ্ছেটা পূরণ হওয়ায় দু’জনেই খুশিতে গদগদ হয়ে বেরিয়ে আসে।