আমার কথা

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:০৩
ছেলেবলা পাঠ্যপুস্তকে কবিতা পড়তে পড়তে মনে লাগত দোলা। সাদামাটা গদ্যের বাইরে মনে দোলা দিয়ে কথা বলেন যারা, নিজের অজান্তেই তারা হয়ে গেলেন আমার সখা। তাদেরকে বলা হয় কবি। শৈশবেই কবিতার ছন্দ আর অন্ত্যমিল আমাকে মুগ্ধ করেছে— অভিভূত করেছে। ভালোবেসেছি কবিতাকে, সেসঙ্গে কবিদেরও। উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তে পড়তে কবিতা লিখতে থাকি— কিশোর কবিতা। শুরুর দিকের সে সব কবিতা বাদ পড়েছে সবই, কেবল ‘তালগাছ’ নামের একটি কবিতা ছাড়া। বেশ রদবদল করে কবিতাটিকে আমার ‘মায়াবী জাহাজ’ নামের কিশোর কবিতার বইয়ে স্থান দিয়েছি। স্কুলজীবনের লেখাগুলো ছিল পুরনো ধাঁচের— পাঠ্যপুস্তকে ছাপা কবিতার ভাবধারায় লেখা। যখন পড়ি কলেজে, প্রকৃত অর্থে তখনই আধুনিক ছড়া লেখার পথটি খুঁজে পাই। বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে আমার লেখা। এভাবেই লেখালেখির জগতে আসি আমি। মনে আছে, যখন পড়ি দ্বিতীয় শ্রেণিতে, একটি কবিতা আমাকে বেশ আলোড়িত করে। কবিতার নাম ‘ঘুম জাগানো পাখী’। ‘আমি হব সকাল বেলার পাখী/সবার আগে কুসুমবাগে/ উঠব আমি ডাকি! কিংবা আমরা যদি না জাগি মা/ কেমনে সকাল হবে,/তোমার ছেলে উঠলে মা গো / রাত পোহাবে তবে।/ এ সব পঙক্তি আমাকে কবিতার দিকে টেনে নেয়। কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতাটির পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছোট নদী’, যতীন্দ্র মোহন বাগচীর ‘কাজলা দিদি’, জসীম উদ্দীনের ‘রাখাল ছেলে’র মত কবিতাগুলো আমাকে আলোড়িত করে। স্কুলের হাতে লেখা ম্যাগাজিন কিংবা নিলামের কাগজে লেখা প্রকাশ বাদ দিলে প্রকৃতপক্ষে আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় দৈনিক সংবাদ-এর ‘খেলাঘর’-এ। এই পাতায় পাঠানো কবিতাটির নাম ‘আগলার আরফিন’। কবিতাটি কবে ছাপা হবে জানা ছিল না। একদিন বরিশালের সদর রোড ও কালীবাড়ি রোডের সংযোগস্থলে একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম। টেবিলে পড়ে আছে ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকাটি। খেলাঘর’-এর পাতাটি খুলে দেখি দিব্যি ছাপা হয়ে বসে আছে আমার ছড়াটি। তখন বসন্ত কাল। আমার মনেও বসন্ত এল। এমন মর্যাদাপূর্ণ একটি পাতায় আমার ছড়া দেখে সেদিন মনটা অভূতপূর্ব এক আনন্দে ভরে উঠেছিল। সেই আনন্দের অনুভূতির সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা হয় না। ছেলেবেলায় স্বপ্ন দেখতাম, বড় হয়ে কবি হব। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে কবিতা লিখতে শুরু করলাম। মাথায় নজরুলের মত সোজা সিঁথি কাটলাম। সে সময় ভাবতাম বাবড়ি না থাকলে কিসের কবি। পরে অবশ্য ছড়ার দিকে ঝুঁকে পড়ি। সোজা সিঁথি আর কাটি না। আমার নিজের প্রিয় লেখা অনেক। যদি আমার নিজের একটি প্রিয় লেখার নাম উল্লেখ করতে বলা হয়, আমি বলব ‘ভূত’। একটি লোক ভূত আসতে দেখে ভয় পেয়ে যায়। আসলে একটা পলিথিন ব্যাগ উড়ে এসে মাটিতে পড়ে। বাড়ির দরজায় মাদ্রাসাঘর। তখন পড়ি ষষ্ঠ শ্রেণিতে। ভোর রাতে একটা কক্ষে বসে পড়াশোনা করছি। পরীক্ষা কাছে। সামনেই জানালা খোলা। হঠাত্ চুল এলোমেলো একটা পেত্নি আমাকে ধমক দিল— অ্যাই-অ্যাই। আমি ভয়ে চিত্কার দিয়ে পাশের খাটের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম কয়েকজনের ওপর! সেখানে শোয়া ছিলেন আমার বড়ভাই এবং আরো দুজন। তারাও হাউমাউ করে চিত্কার দিয়ে উঠলেন। বাড়ির ভেতর থেকে চাচা এসে আমার গালে চড় বসিয়ে দিলেন। আসলে ঘটনাটা কী? কে এই পেত্নি। বাড়ির কাজের মেয়েটি এসেছিল আমাকে ডাকতে। সন্ধ্যারাতে ভাত খাইনি— এখন যেন ভাত খেয়ে আসি। সদ্য ঘুম থেকে জাগা— মেয়েটির চুল ছিল এলোমেলো। জানালার পাশে বাইরে তাকে দেখে ভূত-পেত্নি একটা কিছু মনে হয়েছিল। প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো: ছানাবড়া, তোলপাড়, চড়ুইভাতি, তিতকুটে, ঝিলিকমিলিক, ছয় ঋতুর আল্পনা, মজার ছড়া, ঘুঙুর,ছড়া সংগ্রহ, ছড়া সমগ্র। নিরালা দুপুর, মায়াবী জাহাজ। মেঠোপথ, মিছিল, চিতু ও পাতু, ক্ষুদে নাগরিক, ডাইনি, দুই কবি, বেতাল বুড়োর কবলে। গল্পের আল্পনা (রূপকথা), গল্পে উপদেশ, কুসুম কলিকা, ইবনে বতুতা, আলোয় ভরা দিনগুলি, আমরা বাঙালি, মহীয়সী নারী। পুরস্কার পেয়েছি অনেক। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৪১২), অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার (১৪০৩), ঢাকা সংস্কৃতি সংসদ পুরস্কার (১৯৮৯), শিরি শিশু সাহিত্য কেন্দ্র সনদ (১৯৯৩), ছোটদের মেলা-সেরা বই পুরস্কার (২০১০) ও বেগম বদরুন্নেসা আলী সাহিত্য সম্মাননা (২০১০)।