বিষাক্ত ডিডিটি পাউডার ও স্প্রে মিশ্রিত শুঁটকিতে সয়লাব হয়ে গেছে রংপুর বিভাগের হাট-বাজার। এসব শুঁটকি খেয়ে মানুষ চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছে।
রংপুর বিভাগের ৮ জেলার মধ্যে রংপুর জেলা ও নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলায় সবচেয়ে বড় শুঁটকির আড়ত রয়েছে। এসব আড়তে পোকা দমনে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিষাক্ত ডিডিটি পাউডারের ব্যবহার বেশি হচ্ছে। সেইসাথে শুঁটকির স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন তরল রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার করেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। শুঁটকির আড়তগুলোতে পাইকারি ক্রেতা হিসেবে প্রতিদিন হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে। আড়ত থেকে ডিডিটি মিশ্রিত শুঁটকি সংগ্রহ করে তারা গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজারে খুচরা বিক্রি করে থাকে। এসব শুঁটকি মাছ খেয়ে হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ভেজালবিরোধী অভিযানে রংপুর ও নীলফামারীর সৈয়দপুরে কিছু শুঁটকির আড়তে জরিমানা আদায়সহ শুঁটকিতে ডিডিটি পাউডার মিশ্রণের দায়ে অনেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিল করে দেয়া হয়েছিল। সে সময় ব্যবসায়ীরা কিছুদিন শুঁটকিতে ডিডিটি ব্যবহার বন্ধ রাখেন। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে ব্যবসায়ীরা পুনরায় শুঁটকিতে ডিডিটিসহ বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণ শুরু করে দেন।
রংপুর বিভাগের ৩টি বড় শুঁটকির আড়ত রংপুর-দিনাজপুর সড়কের দর্শনা এলাকায় ১টি, লালমনিরহাটের তিস্তায় ১টি ও অপরটি নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলায়। ওইসব আড়তে ৬ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতিমণ শুঁটকি মাছ রয়েছে। এসব শুঁটকি মাছের মধ্যে রয়েছে দেশি চাপিলা, কত্তি, শৌল, বোয়াল, ফ্যাসা, কামিলা, মোয়া, রুই, চান্দা, লইটকা, ছুরি, ভেটকি ছাড়াও সামুদ্রিক বিভিন্ন জাতের মাছ। আড়তগুলো থেকে প্রতিদিন শত শত মণ শুঁটকি অবাধে কেনা-বেচা হচ্ছে। আড়তদাররা জানান, শুঁটকি মাছে পোকার আক্রমণ রোধে এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী তাদের মাঝে পোকাবিহীন শুঁটকি মাছ সরবরাহ করতে বাধ্য হয়েই শুঁটকি মাছে পোকা প্রতিরোধক সামান্য রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার করা হয়। বড় বড় আড়তগুলোতে শুঁটকি ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে কয়েক হাজার শ্রমিক। রংপুর আড়তের শ্রমিক মফিজার, আবুল, আক্কাস, মজিবর অভিযোগ করেন, শুঁটকি মাছে ডিডিটি পাউডার মিশ্রণের কাজ করে অনেক শ্রমিকই দীর্ঘমেয়াদি চুলকানি ও চর্মরোগের শিকার হয়েছে।
রংপুর সিটি বাজারের শুঁটকি ব্যবসায়ী আনারুল, এনামুল, ফেরদৌস, আশেক আলী, আব্দুর রহিম, সবুজ, মোকছেদুলসহ অনেকের সাথে কথা হলে তারা বলেন, বর্তমান বাজারে শুঁটকির দাম প্রচুর। আমরা সরাসরি আড়ত থেকে শুঁটকি ক্রয় করে বিক্রি করি। সাধারণত কার্তিক থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত পটুয়াখালী, পাবনা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন মোকাম থেকে শুঁটকি আমদানি হয়। দীর্ঘদিন গুদামজাত করে রাখা হয়। এ সময় পোকার হাত থেকে রক্ষার জন্য শুঁটকিতে পোকা প্রতিরোধক রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার হয়। রংপুর মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন জানান, ডিডিটি পাউডার ও স্প্রে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা অনেক বেশি। শুঁটকি ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা শুঁটকিতে ডিডিটি পাউডার কিংবা পোকা দমনে কোন বিষাক্ত স্প্রে ব্যবহারের বিষয় অস্বীকার করে বলেন, সাধারণত রোদে শুঁকিয়ে চটের বস্তায় ভরে আমরা শুঁটকি গুদামজাত করে থাকি।
