খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরিতকরণ ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধ-কালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আজ রায় ঘোষণা করবে যুদ্ধাপরাধ ট্রাই-ব্যুনাল। গতকাল বুধবার যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারমান এটিএম ফজলে কবীর এক আদেশে বলেছেন, মামলার রায় প্রস্তুত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (আজ) এই রায় ঘোষণা করা হবে। রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপু সাংবাদিকদের বলেন, অভিযুক্ত সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। তাই যথাযথ রায় পাবো বলে আশা করছি। সাঈদীর আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেছেন, সবগুলো অভিযোগই মিথ্যা, বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দেশের একজন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদের বিরুদ্ধে নিলর্জ্জ মিথ্যা অভিযোগ এনে তাকে জনসমক্ষে হেয় করা হচ্ছে। এদিকে, রায়কে কেন্দ্র করে রাজধানীতে আতঙ্ক ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। জামা-য়াতে ইসলামী রায়ের প্রতিবাদে আজ সারা-দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে। অন্যদিকে, রাজধানীজুড়ে সরকার কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছে। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ ঘিরে রেখেছে।
গতকাল বেলা সাড়ে ১২টার দিকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর আদালত কক্ষে এসে রায়ের দিন ধার্যের কথা জানান। তিনি বলেন, গত ২৯ জানুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় উভয়পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়। বিচার কাজ শেষে মামলাটির রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ ছিল। মামলার রায় প্রস্তুত করা হয়েছে।
এটি হবে বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন এবং বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এর প্রথম রায়। আর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর তৃতীয় রায় এটি। এর আগে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ দুইটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. মেজবাহউদ্দিন সাংবাদিকদের, ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষকে এ খবর জানিয়ে দেয়া হয়েছে। সকাল ১০টার মধ্যে আসামি সাঈদীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে বলা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষে সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনাকারী কৌঁসুলি সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগে মামলা হয়। একটি ছাড়া বাকি ১৯টি অভিযোগের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। বাকি একটি অভিযোগে দালিলিক সাক্ষ্য দিয়েছি। সব মিলিয়ে তথ্য-উপাত্ত, দলিলপত্র, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যুক্তিতর্ক দিয়ে মামলাটিকে আমরা প্রমাণ করেছি। তাই আশা করছি, তার সর্বোচ্চ শাস্তিই হবে। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ। এ সাক্ষ্য-প্রমাণে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর এক মিনিটেরও শাস্তি হতে পারে না। আমরা আশা করি তিনি বেকসুর খালাস পাবেন।
বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীর দায়ের করা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে একটি মামলায় সাঈদীকে ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। গত বছরের ১১ জুলাই সাঈদীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। পরে ১৪ জুলাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগের বিষয়ে শুনানি শেষে ৩ অক্টোবর সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
এ মামলায় সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর। প্রায় সাড়ে চার মাসে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। তাদের মধ্যে ২০ জন ঘটনার বিষয়ে এবং সাতজন জব্দ তালিকার বিষয়ে সাক্ষ্য দেন। রাষ্ট্রপক্ষের ২৮তম ও শেষ সাক্ষী হিসেবে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হেলালউদ্দিন সাক্ষ্য দেয়া শুরু করেন ৮ এপ্রিল। নয় কার্যদিবসে ২৪ এপ্রিল তার সাক্ষ্য শেষ হয়। আসামিপক্ষ ২৫ এপ্রিল তাকে জেরা শুরু করেন। ৪৮ কার্যদিবসে অর্থাত্ ১৩ আগস্ট তার জেরা শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা। এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া ১৫ সাক্ষীর জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালের আদেশে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এরপর ২ সেপ্টেম্বর থেকে সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীদের সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সাঈদীর পক্ষে আইনজীবীরা সাফাই সাক্ষ্য দিতে ৪৮ জনের নামের তালিকা দিলেও ২০ জনকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য অনুমোদন দেয় ট্রাইব্যুনাল। ২০ জনের মধ্যে ১৭ জন হাজির হয়ে সাফাই সাক্ষ্য দেন। গত ২৩ অক্টোবর তারা আর কোনো সাফাই সাক্ষী আনতে না পারায় সেদিনই সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ বন্ধ করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের তারিখ ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এদের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের গণেশ চন্দ্র সাহা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেন। অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষের আরেকজন সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে ট্রাইব্যুলের গেট থেকে অপহূত হয়েছেন। আজ পর্যন্ত তার হদিস মেলেনি।
উল্লেখ্য, গত ২৯ জানুয়ারি সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা দ্বিতীয়বারের মতো অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। গত বছরের ডিসেম্বরে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে সর্বপ্রথম সাঈদীর মামলার বিচার শেষ হয়। ৬ ডিসেম্বর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখে। ৯ ডিসেম্বর বেলজিয়াম প্রবাসী আইনজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে স্কাইপ কথোপকথনের খবর প্রকাশের পর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন বিচারপতি নিজামুল হক। ১৩ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১ পুনর্গঠিত হওয়ার পর নতুন চেয়ারম্যান সাঈদীর মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক পুনরায় উপস্থাপনের আদেশ দেন।
