ফণী গত কয়েকদিন টক অব দ্য কান্ট্রি হইয়া গিয়াছিল। প্রবল ফণা তুলিয়া বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ফণী যতখানি বিষাক্ত ছোবল মারিবে বলিয়া মনে করা হইতেছিল, তাহা হয় নাই। ইহা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য স্বস্তির। তবে ফণী তাহার যাত্রাপথে ঠিকই ধ্বংসলীলা চালাইয়া গিয়াছে। বঙ্গোপসাগরের বিষুবরেখার কাছে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ফণীর আয়তন প্রায় দুই লক্ষ বর্গকিলোমিটার, যাহা বাংলাদেশের চাইতেও বৃহত্তর। দীর্ঘ পথ ও সময় ধরিয়া উত্তর বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হইতে হইতে ফণী বিপুল পরিমাণ জলীয়বাষ্প সঞ্চয় করিয়াছিল। প্রবল ধ্বংসাত্মক রূপ লইয়া ইহা অবশেষে ঘণ্টায় ২১০ কিলোমিটার গতিবেগে আঘাত হানে ভারতের ওড়িশা উপকূলে।
ঘূর্ণিঝড় তথা আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যেই বিপুল সংখ্যক প্যারামিটার থাকে তাহার কোনো একটির সামান্য পরিবর্তনেও সম্ভাব্য গতিপথ ও শক্তির পরিবর্তন হইতে পারে। ফণীর ক্ষেত্রে তাহাই ঘটিয়াছে। আশঙ্কা ছিল ইহা আইলা বা সিডরের মতো বাংলাদেশে ধ্বংসলীলা চালাইতে পারে। তবে ওড়িশা উপকূলে আঘাত হানিবার পর ইহা স্থলভাগে ঢুকিয়া ক্রমশ শক্তি হারাইতে থাকে। ইহাই বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হইয়া দেখা দেয়। জানা গিয়াছে, গত চার দশকের মধ্যে সবচাইতে শক্তিশালী ছিল এই ঘূর্ণিঝড়টি। ওড়িশা উপকূলের পুরী, গোপালপুর ও ভুবনেশ্বরসহ বিভিন্ন অঞ্চল এক অর্থে লণ্ডভণ্ড করিয়া দেয় ফণী। লক্ষ লক্ষ মানুষকে সরাইয়া নেওয়া হয় ওড়িশার উপকূল অঞ্চল হইতে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রতাপে সেইখানে নিহত হইয়াছে কমপক্ষে ৮ জন, যাহা ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপকতার তুলনায় অনেক কমই বলা যায়। যদিও প্রতিটি মৃত্যুই দুঃখজনক।
আমাদের উপকূলবর্তী অঞ্চলের মানুষ অসম সাহসী হইলেও প্রকৃতির রোষানলে তাহারা বারংবার বিপন্ন হয়। ২০০৭ সালে ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতের দুই বছরের মাথায় ২০০৯ সালে ২৫ মে আঘাত হানিয়াছিল আইলা। সরকারি তথ্য মতে, সিডরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ও আইলায় সাড়ে তিন শত মানুষের প্রাণহানি হইয়াছিল, গৃহহীনের ও সম্পদহানির পরিমাণ ছিল অপরিমেয়। তবে ফণী অতি দুর্বল হইয়া উপকূলবর্তী এলাকার পরিবর্তে পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন স্থলভাগ দিয়া বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সমতলে আসার পর ফণী উত্তরাঞ্চলে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে প্রবেশ করিয়া গভীর নিম্নচাপে পরিণত হইয়াছে।
ফণীর ছোবল হইতে রক্ষা পাইতে উপকূলবর্তী ১৯টি জেলার ৪ হাজার ৭১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৬ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষকে আশ্রয় দেওয়া হইয়াছিল। ফসল এবং গবাদি পশুর তেমন কোনো ক্ষতি হয় নাই। তবে ফণী ঘূর্ণিঝড়ের সহিত শনিবারের অমাবস্যার যোগ থাকায় তাহা উপকূলজুড়িয়া স্বাভাবিকের চাইতে দুই হইতে চার ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হইয়াছে। ফণীর প্রভাবে সৃষ্ট বজ্রপাত, ঝড় ও বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হইয়া সারাদেশে গতকাল সন্ধ্যা অবধি ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। বাংলাদেশ বরাবরই দুর্যোগপূর্ণ দেশ বিধায় দুর্যোগ মোকাবিলায় আমরা এখন অনেক বেশি সচেতন এবং সক্ষম। ফণীর সম্ভাব্য আঘাত ও বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেও সরকারের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করিতেই হয়।
