দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মুক্তিযুদ্ধকালে পিরোজপুর জেলায় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ এবং এ ধরনের অপরাধে সাহায্য করা ও জড়িত থাকার ২০টি অভিযোগ উত্থাপন করে। এর মধ্যে মদন সাহার মেয়ে ভানু সাহাকে নিয়মিত ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বাবা পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান আহমেদকে হত্যার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০১১ সালের ৩ অক্টোবর সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। সাঈদীর বিরুদ্ধে ১ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৪ মে সাঈদীর নেতৃত্বাধীন দলের সদস্যরা পাকিস্তানি সেনাদের খবর দিয়ে পিরোজপুর সদর এলাকার মধ্য মাসিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পেছনে নিয়ে যায়। সেখানে পরিকল্পিতভাবে আগে থেকে জড়ো করা ২০ জন নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২)(এ) ধারা অনুসারে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ৪ মে সাঈদী ও তার দল পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে মাসিমপুর হিন্দুপাড়ায় যায়। সেখানে হিন্দু বাড়িগুলোতে লুট করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। মানুষ পালাতে শুরু করলে সাঈদী ও তার দলের সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করলে ১৩ জন মারা যান।
৩ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ৪ মে সাঈদী পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে মাসিমপুর হিন্দুপাড়ায় মনীন্দ্রনাথ মিস্ত্রী ও সুরেশ চন্দ্র মণ্ডলের বাড়ি লুট করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়।
৪ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ৪ মে সাঈদী ও তার রাজাকার বাহিনী এবং পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে ধোপাবাড়ীর সামনে এবং পিরোজপুর সদর পুলিশ স্টেশনের এলজিইডি ভবনের পেছনের হিন্দুপাড়া ঘিরে ফেলেন। এ সময় গুলি চালানো হলে দেবেন্দ্রনাথ মণ্ডল, জগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, পুলিন বিহারী ও মুকুন্দ বালা মারা যান।
৫ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, তত্কালীন পিরোজপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাইফ মিজানুর রহমান সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। সাঈদী ও তার সহযোগী শান্তি কমিটির সদস্য মন্নাফ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা সদস্যকে নিয়ে ৫ মে পিরোজপুর হাসপাতাল থেকে তাকে ধরে বলেশ্বর নদের তীরে নিয়ে যান। একই দিনে পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান আহমেদ (লেখক হুমায়ূন আহমেদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের বাবা) এবং ভারপ্রাপ্ত এসডিও আবদুর রাজ্জাককেও কর্মস্থল থেকে ধরা হয়। সাঈদীর উপস্থিতিতে এ তিন সরকারি কর্মকর্তাকে গুলি করে লাশ বলেশ্বর নদে ফেলে দেয়া হয়।
৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ৭ মে সাঈদীর নেতৃত্বে শান্তি কমিটির একটি দল পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে পাড়েরহাট বাজারের আওয়ামী লীগ, হিন্দু সম্প্রদায় এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের বাড়িঘর ও দোকান চিনিয়ে দেয়। এসব দোকান ও বাড়িতে লুটপাট করা হয়।
৭ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৮ মে বেলা দেড়টার দিকে সাঈদী পাকিস্তানি সেনাদের নেতৃত্ব দিয়ে বাদুরিয়া গ্রামের নূরুল ইসলাম খানের ছেলে শহীদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে নূরুল ইসলাম খানকে আওয়ামী লীগার ও শহীদুল ইসলামকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং পাকিস্তানি সেনাদের হাতে সোপর্দ করেন।
৮ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ৮ মে বেলা তিনটার দিকে সাঈদী ও তার দলের সদস্যরা চিথোলিয়া গ্রামের মানিক পসারির বাড়ি লুট করেন। এখানে পাঁচটি ঘরে কেরোসিন দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। মানিক পসারির ভাই ইব্রাহিমকে সাঈদীর প্ররোচনায় পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে।
৯ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ২ জুন সকাল নয়টার দিকে সাঈদী ও তার সশস্ত্র সহযোগীরা ইন্দুরকানি পুলিশ স্টেশনের নলবুনিয়া গ্রামের আবদুল হালিম বাবুলের বাড়িতে লুটপাট করে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট এবং আগুন ধরিয়ে দেন।
১০ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ২ জুন সকাল ১০টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে সশস্ত্র দল উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার ২৫টি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাঈদীর ইন্ধনে বিসাবালী নামের একজনকে নারকেলগাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়।
১১ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ২ জুন সাঈদী টেংরাখালী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে যান। সেখানে তার বড় ভাই আবদুল মজিদ হাওলাদারকে ধরে নির্যাতন করা হয়। এরপর সাঈদী নগদ টাকা ও মূল্যবান জিনিস লুট করে নিয়ে যান। পরে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।
১২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, সাঈদীর নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি সশস্ত্র দল পাড়েরহাট বাজারের ১৪ জন হিন্দুকে ধরে দড়ি দিয়ে বেঁধে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে নিয়ে যায়। পরে তাদের গুলি করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
১৩ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দুই থেকে তিন মাস পর সাঈদীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনারা নলবুনিয়া গ্রামের আজহার আলীর বাড়িতে গিয়ে তাকে ও তার ছেলে সাহেব আলীকে ধরে নির্যাতন করে, সাহেব আলীকে পিরোজপুরে নিয়ে হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
১৪ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে ৫০-৬০ জনের একটি রাজাকার বাহিনী হোগলাবুনিয়ার হিন্দুপাড়ায় যায়। এখানে একজনকে ধর্ষণ করা হয়। পরে এই হিন্দুপাড়ার ঘরে আগুন দেয়া হয়।
১৫ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের রাজাকার দল হোগলাবুনিয়া গ্রামের ১০ হিন্দু নাগরিককে ধরে আনলে পাকিস্তানি সেনারা তাদের হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়।
১৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, সাঈদীর নেতৃত্বে ১০-১২ জনের রাজাকার দল পাড়েরহাট বন্দরের গৌরাঙ্গ সাহার বাড়ি থেকে তার তিন বোনকে ধরে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তিন দিন ধরে ধর্ষণ করে পরে ছেড়ে দেয়া হয়।
১৭ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, সাঈদী ও তার নেতৃত্বের রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা পাড়েরহাটের বিপ্লব সাহার মেয়েকে তার বাড়িতে আটকে নিয়মিত ধর্ষণ করে।
১৮ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, ভাগীরথী পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে কাজ করতেন। সাঈদী এক দিন খবর দেন, ভাগীরথী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত নানা খবরা খবর দেন। পরে পাকিস্তানি সেনারা তাকে হত্যা করে লাশ বলেশ্বর নদে ফেলে দেয়।
১৯ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, সাঈদী প্রভাব খাটিয়ে পাড়েরহাটসহ অন্য গ্রামের ১০০-১৫০ হিন্দুকে ইসলাম ধর্মে রূপান্তর করে। তাদের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে বাধ্য করা হতো।
২০ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, নভেম্বরের শেষ দিকে সাঈদী খবর পান, সাধারণ মানুষ ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে। তার নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি সশস্ত্র দল পরিকল্পিতভাবে ইন্দুরকানি গ্রামের তালুকদার বাড়িতে আক্রমণ চালায়। ৮৫ ব্যক্তিকে আটক করে তাদের কাছ থেকে মালামাল কেড়ে নেয়া হয়। ১০-১২ জন ছাড়া বাকিদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।
