প্রকাশকরা ক্ষতিপূরণের আশ্বাস পেলেন

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৩৩
বইমেলায় আগুনে পুড়ে গিয়ে সর্বস্ব হারানো প্রকাশকরা গতকাল বুধবার থেকে ক্ষতিপূরণের দাবিতে কঠিন আন্দোলনের পথে এগুচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অমর একুশে গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির পদেক্ষেপে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস পাওয়ায় আন্দোলনের পথ থেকে প্রকাশকরা সরে এসেছেন। ফলে গতকাল এক ঘণ্টা মেলা বন্ধ রাখা এবং প্রয়োজনে আজ মেলা বন্ধ রাখার কর্মসূচি প্রকাশকরা স্থগিত করেছেন। সবমিলিয়ে অনেক ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলা শেষ হচ্ছে আজ। বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ গত মঙ্গলবার রাতেই সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে আলোচনা করে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে রাজি করান। এর প্রেক্ষিতে গতকাল দুপুরে মন্ত্রীর সঙ্গে পুস্তক প্রকাশকদের দুটি সমিতির পক্ষ থেকে পুস্তক প্রকাশক সমিতির সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটন এবং জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির নির্বাহী পরিচালক ফরিদ আহমেদ, বাংলা একাডেমীর সচিব আলতাফ হোসেন, বইমেলার সদস্য সচিব শাহিদা খাতুন এবং জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বৈঠকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ সময় মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রতিটি প্রকাশকের ক্ষতির পরিমাণের সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে জমা দিলে ক্ষতিপূরণ প্রদানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। আন্দোলনকারীদের নেতা ও পুস্তক প্রকাশক সমিতির সভাপতি আলমগীর সিকদার লোটন বলেন, ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রী ক্ষতিপূরণ প্রদানের আশ্বাস দেয়ায় আমরা কর্মসূচি স্থগিত করেছি। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, সংস্কৃতি মন্ত্রী ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন। অর্থ মন্ত্রীর সঙ্গে এমনকি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বিষয়টি গড়িয়েছে। বিষয়টি সবাই সহানুভূতির সঙ্গে দেখছেন। ‘হুমায়ূন আহমেদ এক নিমগ্ন শিল্পী’ সদ্য প্রয়াত জননন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমদকে উত্সর্গ করা হয়েছিল এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলা। মেলার ২৭তম দিনে গতকাল মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হলো তার স্মরণে সভা। এতে ‘প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বতে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, অন্যপ্রকাশের স্বত্ব্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম এবং স্থপতি শাকুর মজিদ। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুুজ্জামান খান। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো কথাসাহিত্যিক পূরবী বসুর ‘হুমায়ূনের কথা ভেবে’ শীর্ষক লেখা পাঠ করা হয়। ইমদাদুল হক মিলন বলেন, হুমায়ূন আহমেদ এক নিমগ্ন শিল্পী। লেখক হিসাবে আবির্ভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল তার। সরলতা ও গভীরতার মেলবন্ধন রচনা করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। বিষয় ও শৈলীতে নিত্য নবায়নশীল এই লেখকের প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিল মানুষ। আকস্মিক মৃত্যু এসে তার জীবনের ইতি টেনেছে মাত্র। কিন্তু অসংখ্য পাঠকের মাঝে তিনি বেঁচে থাকবেন বহুদিন। শামসুজ্জামান খান বলেন, হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে বাংলাদেশের বইয়ের প্রতি তরুণ পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। বাংলা একাডেমী শীঘ্রই এই শক্তিমান লেখকের মূল্যায়নভিত্তিক স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করবে এবং স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করবে। আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, লেখক হুমায়ূন ও ব্যক্তি হুমায়ূনে কোন ভেদ ছিল না। ব্যক্তিগত সারল্য ও ঔদার্যের ছায়া পড়েছে তাঁর কথাসাহিত্যে। শাকুর মজিদ বলেন, হুমায়ূন আহমেদের ভেতর এক বাউলসত্তার বসতি ছিল যা তাকে সহজিয়া মানবিক দর্শনের অধিকারী করেছিল। মাজহারুল ইসলাম বলেন, হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো তিনি বাংলাদেশের পাঠককে টেনে নিয়ে গেছেন তার কালজয়ী সৃষ্টির ভুবনে। এখন প্রয়োজন হুমায়ূন আহমেদের প্রকৃত সাহিত্যিক মূল্যায়ন। সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন তার অনন্য সাধারণ উপন্যাস, গল্প, শিশুসাহিত্য, সায়েন্স ফিকশনের জাদুতে। তার চলচ্চিত্র, নাটক ও গান বাঙালি সংস্কৃতিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিতে যে বৈশিষ্ট্যে ও গৌরবে চিত্রিত হয়েছে তার তুলনা সমকালীন সাহিত্যে বিরল। হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে সন্ধ্যায় প্রদর্শিত হয় তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’। সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা ষষ্ঠ বছরের মতো সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন—‘ক’ শাখায় প্রবন্ধে অন্বেষা থেকে প্রকাশিত সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘রাষ্ট্রতন্ত্রে সমাজদ্রোহিতা, উপন্যাসে প্রতীক থেকে প্রকাশিত বরেন চক্রবর্তীর ‘দূরবর্তিনী, কবিতায় বিভাস থেকে প্রকাশিত মুহম্মদ নুরুল হুদার ‘যতদূর বাংলা ভাষা ততদূর এই বাংলাদেশ’ এবং শিশু সাহিত্যে শব্দশৈলী থেকে প্রকাশিত আমিরুল ইসলামের ‘কোনালের বাবা বন্ধু ও অন্যান্য গল্প’। ‘খ’ শাখায় তরুণ ক্যাটাগরিতে (জীবনের প্রথম বই) অনন্যা থেকে প্রকাশিত মৃত্তিকা গুনের কবিতার বই ‘আমার আকাশে বৃষ্টি’ ও সূচিপত্র থেকে প্রকাশিত আশা নাজনীনের উপন্যাস ‘শ্বাশুড়ি পুরাণ’ পুরস্কার পেয়েছে। মেলার তথ্যকেন্দ্রের সামনে পুরস্কার কার্যক্রম ঘোষণা করেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। উল্লেখ্য, এই পুরস্কারের মূল্যমান ‘ক’ শাখায় প্রতিটি ৩০ হাজার টাকা এবং ‘খ’ শাখায় প্রতিটি ১০ হাজার টাকা। আগামী ৫ মার্চ চ্যানেল আইয়ের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার প্রদান করা হবে। হুমায়ুন আজাদ দিবস পালিত ২০০৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনে লেখক হুমায়ুন আজাদের উপর হামলা চালায় একটি মৌলবাদী গোষ্ঠী। এ দিনটিকে স্মরণ করতেই গতকাল বাংলা একাডেমীর বর্ধমান হাউজের সামনে অবস্থিত তথ্য কেন্দ্রের সামনে হুমায়ুন আজাদের হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে লেখক প্রকাশক পাঠক ফোরাম। ‘মিনার মাহমুদ সমগ্র ০১’র মোড়ক উন্মোচন শ্রাবণ প্রকাশনীর সামনে গতকাল প্রয়াত বিশিষ্ট সাংবাদিক মিনার মাহমুদের রচনা সংগ্রহ -১’র মোড়ক ইন্মোচন করা হয়। মেলার নজরুল মঞ্চে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন দৈনিক সমকালের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আবু সাঈদ খান। এ সময় সাংবাদিক মেহেদী হাসান ও প্রকাশক রবীন আহসান উপস্থিত ছিলেন। আহমদ পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত বিশিষ্ট উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংগঠক এএইচএম নোমানের লেখার সংকলন ‘ধ্বংস থেকে সৃষ্টি’ বইটির মোড়ক গতকাল উন্মোচন করা হয়। নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন তথ্য কমিশনের প্রধান তথ্য কমিশনার রাষ্ট্রদূত (অব.) মোহাম্মদ ফারুক। এছাড়াও মেলার নজরুল মঞ্চে আরো ১০টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়। ‘পদ্মা সেতু: পর্দার অন্তরালে’ পদ্মা সেতুর দুর্নীতির ষড়যন্ত্র নিয়ে সাংবাদিক মিজান মালিকের লেখা অনুসন্ধানমূলক তথ্যভিত্তিক গ্রন্থ ‘পদ্মা সেতু: পর্দার অন্তরালে’ আজ মেলায় আসছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আজ বিকাল তিনটায় দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে বইটির মোড়ক উন্মোচন করবেন। নতুন বই বাংলা একাডেমীর সমন্বয় ও জনসংযোগ উপ-বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মেলার ২৭তম দিনে নতুন বই এসেছে ১১৪টি। এর মধ্যে গল্প ১০টি, উপন্যাস ২১টি, প্রবন্ধ ৮টি, কবিতা ৩৭টি, গবেষণা ৫টি, ছড়া ২টি, শিশুতোষ ১টি, জীবনী ৫টি, মুক্তিযুদ্ধ ২টি, ভ্রমণ ১টি, ইতিহাস ১টি, রাজনীতি ২টি, ধর্মীয় ১টি, অনুবাদ ২টি এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর এসেছে ১৫টি নতুন বই। ইউপিএল এনেছে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ‘কারাগারে কেমন ছিলাম ২০০৭-২০০৮’, বিশ্বসাহিত্য ভবন এনেছে সঞ্চিতা লিখিতের ‘মোনায়েম সরকার বাংলাদেশের রাজনীতির নেপথ্য কর্মী’, অন্যপ্রকাশ এনেছে মাজহারুল ইসলামের ‘হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে নয় রাত’, অনিন্দ্য প্রকাশ এনেছে মোকারম হোসেনের ‘জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার পুষ্প-বৃক্ষ’, অবসর এনেছে মুহম্মদ নুরুল হুদার ‘এক যে ছিল হুমায়ূন’, বিভাস এনেছে ‘গণমাধ্যম নিপীড়ন ১৯৭২-২০১২’, জাগৃতি এনেছে মনিজা রহমানের ‘গুরু শিষ্য’ প্রভৃতি। সমাপনী অনুষ্ঠান আজ মেলার মূল মঞ্চে আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে সমাপনী অনুষ্ঠান। এতে স্বাগত ভাষণ একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান ও শুভেচ্ছা ভাষণ ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান ও স্টেপ মিডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা তৌহিদ খান প্রদান করবেন। মেলার প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব শাহিদা খাতুন। এছাড়াও বাংলা একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি সচিব সুরাইয়া বেগম। এতে সেরাগ্রন্থের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ ও সর্বাধিক সংখ্যক মানসম্মত গ্রন্থ প্রকাশের জন্য ‘শহীদ মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হবে। সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।