রায়ের খবরে গণজাগরণ মঞ্চে সন্তোষ

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২৮
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ে আনন্দ প্রকাশ করলেও এ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চ। সেইসঙ্গে এ বিজয়ে না ভুলে আন্দোলনে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানান তারা। আন্দোলনের নেতারা বলছেন, সারাদেশে যে গণহত্যা জামায়াত-শিবির শুরু করেছে এতে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, এ লড়াই শুধু রায় ঘোষণার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় না। তাই যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকরসহ জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলবে। লড়াই এখানেই শেষ নয়। জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবের প্রতিক্রিয়ায় ইমরান এইচ সরকার বলেন, লড়াই শুরু হলো মাত্র। বিজয়ে না ভুলে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। এখনো অনেক হায়েনার ফয়সালা বাকি। ইতিমধ্যে তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। প্রতিবেশীর বিপদে এগিয়ে আসুন। সবাই মিলে ভালো থাকুন। বিজয়ের সূর্যোদয় হবেই। এর আগে রায় প্রকাশের পর তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, এ রায় জনতার বিজয়। স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ ও গণজাগরণ মঞ্চের শহীদদের প্রতি এ বিজয় উত্সর্গ করলাম। এ রায়ের জন্য জনতাকে অভিনন্দন। রায়কে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেইল্লা রাজাকারের বিরুদ্ধে রায় পেয়েছি। ফাঁসির রায়। কাঙ্ক্ষিত রায়। বিচারপতি ও ট্রাইব্যুনালকে অভিনন্দন। জনগণকে রাজপথে নেমে এসে উত্সব করার আহবান জানিয়ে ইমরান বলেন, জাতির কলঙ্কমুক্তির ক্ষণ এটি। ঘর থেকে বেরিয়ে রাজপথে এসে আনন্দ-উল্লাস করুন। জামায়াত-শিবিরকে প্রতিহত করে পুলিশের হাতে তুলে দিন। আইন নিজেদের হাতে তুলে নেবেন না। সারাদেশে আনন্দ মিছিল করুন। কোন বিশৃংখলা করবেন না। সুশৃংখলভাবে আনন্দ উদযাপন করুন। কলঙ্কমুক্তিতে আনন্দ ঃ গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর একটা ৪০ মিনিটে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায়ের খবর শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে পৌঁছাতেই আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠে পুরো প্রজন্ম চত্বর। উপস্থিত ছাত্র-জনতা এ রায়কে জাতির কলঙ্কমুক্তির পথে প্রথম বিজয় এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর জাতীয় পতাকা উড়িয়ে, ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে, পানি ছিটিয়ে ও পরে মিষ্টিমুখ করে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠেন তারা। আনন্দে উদ্বেল তারুণ্যের বিজয় শ্লোগানে প্রকম্পিত হয় শাহবাগ এলাকা। ফাঁসির রায় প্রকাশের পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে এসে সমবেত জনতার সাথে আনন্দে মেতে উঠেন সর্বস্তরের মানুষ। আনন্দ মিছিলে জাগ্রত জনতা সাঈদীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় হলে উত্সব করা হবে বলে গত বুধবারের মতিঝিলের সমাবেশেই ঘোষণা দিয়েছিল গণজাগরণ মঞ্চ। গতকাল রায় হওয়ার পরই শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেকে একটি আনন্দ মিছিল বের করে মঞ্চ। মিছিলে জনতা শ্লোগান তোলে ‘এইমাত্র খবর এলো, সাঈদীর ফাঁসি হলো’; ‘ফাঁসি, ফাঁসি, ফাঁসি’; ‘জনতার রায়, সাঈদীর ফাঁসি’; ‘স-তে সাঈদী, তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে কেন্দ ীয় শহীদ মিনারে গিয়ে কিছুক্ষণ অবস্থান করে। এরপর আবারো শাহবাগে এসে গানে-শ্লোগানে বিজয় উত্সব পালন করে। দুপুরে শুরু হওয়া উল্লাস রাতভর চলতে থাকে। রাজধানী প্রদক্ষিণ গতকাল জামায়াত-শিবিরের ডাকা হরতাল প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। গতকাল দুপুরে এক হরতালবিরোধী মিছিল থেকে এ ঘোষণা দেন আন্দোলনরতরা। গতকাল বেলা ১০টা ৫০ মিনিটে শাহবাগ থেকে মিছিলটি শুরু হয়। মিছিলে যুবনেতা, ছাত্রনেতাসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে। মিছিলটি মত্স্যভবন, প্রেসক্লাব, পুরানা পল্টন, বিজয়নগর, কাকরাইল, মালিবাগ, মৌচাক, মগবাজার, বাংলা মোটর, রূপসী বাংলা হয়ে শাহবাগে এসে পুনর্মিলিত হয়। পথে বিভিন্ন পেশার মানুষ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলনরতদের শ্লোগানের সাথে কণ্ঠ মেলান সড়কের পাশে দাঁড়ানো জনগণও। শ্লোগান পরিবর্তন গণজাগরণ মঞ্চের গতকাল গণজাগরণ মঞ্চ থেকে একটি শ্লোগান পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়া হয়। ‘আমি কে তুমি কে বাঙালি, বাঙালি’ বলে যে শ্লোগান দেয়া হতো এতদিন সে শ্লোগানের পরিবর্তে এখন থেকে ‘আমি কে তুমি কে চাকমা, মারমা, বাঙালি’, ‘ ‘আমি কে তুমি কে আদিবাসী-বাঙালি’ এবং ‘আমি কে তুমি কে পাহাড়ি-বাঙালি’ বলে শ্লোগান দেবে এ মঞ্চ। সেইসঙ্গে সারাদেশের প্রতিটি মঞ্চেই এ শ্লোগান দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। ঢাবি শিক্ষকদের মিছিল এদিকে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে এবং জাতীয় পতাকা পোড়ানো, শহীদ মিনার ও ধর্মীয় স্থাপনাসমূহে হামলার প্রতিবাদে গতকাল সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। মানববন্ধনের পর ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দের’ ব্যানারে শিক্ষকরা একটি মিছিল বের করেন। মিছিলটি ট্রাইব্যুনালের পার্শ্ববর্তী দোয়েল চত্বর ঘুরে শাহবাগে গিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের সাথে সংহতি জানায়। এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে আজ শুক্রবারের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচিতে আজ জুমার নামাজে মুক্তিযুদ্ধে সকল শহীদের স্মরণে দোয়া এবং বিকাল তিনটায় সারাদেশের প্রতিটি গণজাগরণ মঞ্চে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। আজ শুক্রবার সারাদেশে সমাবেশ শনিবার উড়বে জাতীয় পতাকা জামায়াত-শিবিরের সহিংসতার প্রতিবাদে ২ দিনব্যাপী কর্মসূচি দিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকার রাত পৌনে ৮টায় শাহবাগের গণজাগরণ চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে এ নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, আজ শুক্রবার বাদ জুমা মসজিদে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া, বিকাল ৩টায় গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোগে জেলা, উপজেলায় জনসমাবেশ ও সন্ধ্যায় অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা। এছাড়া এদিন পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী শাহবাগের গণজাগরণ চত্বরে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে বিকাল ৩টায়। এর বাইরে শনিবার সকাল থেকে দেশের সকল সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিল্প কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাসা বাড়ি ও সব ধরনের যানবাহনে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানান ডা. ইমরান। শনিবার দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সকাল ১১টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ডাক দেয়া হয়েছে। এ ঘোষণা দেয়ার সময় ইমরান বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় জামায়াত-শিবির সারা দেশে গণমাধ্যম কর্মী, পুলিশ ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে। তারা যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে ফায়দা লুটতে চাইছে। জামায়াত-শিবিরের এ তাণ্ডব প্রতিহত করতে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।