যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের আসামি পক্ষের প্রধান কৌঁসুলি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। আমরা মনে করি তার বিরুদ্ধে এই রায় ‘সমপূর্ণ ন্যায়ভ্রষ্ট’। এই রায়ের মাধ্যমে সাঈদীর ওপরে চরম অবিচার করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের উচিত ছিল তাকে সমপূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দেয়া। তিনি বলেন, এই রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। আমরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব। আশা করি আপিলে সুবিচার পাব। গতকাল বৃহস্পতিবার ফাঁসির রায় ঘোষণার পর নিজ বাসভবনে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাঈদীর প্রধান আইনজীবী এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এ সময় এডভোকেট এম তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার তানভীর আহমেদ আলামিন প্রমুখ আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত ২০টি অভিযোগের মধ্যে ১৬টি অভিযোগ ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের। ৪টি ছিল গণহত্যার। একটি অভিযোগও তারা প্রমাণ করতে পারেনি। প্রসিকিউশন ২৮ জন সাক্ষীর বক্তব্য উপস্থাপন করেছে। প্রত্যেকটি সাক্ষীর বক্তব্য অসত্য প্রমাণ করতে আসামি পক্ষের কৌঁসুলিরা সক্ষম হয়েছেন। এর বাইরে ১৬ জন সাক্ষীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বা আদালতে আনা সম্ভব নয় বলে বক্তব্য দিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট তাদের কথিত বক্তব্যকে সাক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। তাদেরকে জেরা করা সম্ভব হয়নি। কথিত এই খুঁজে না পাওয়া সাক্ষীদের মধ্যে একজন উষারাণী মালাকার টেলিভিশনে প্রদত্ত সাক্ষাত্কারে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে, তার স্বামী হরলাল মালাকারের হত্যার সাথে সাঈদী কোনভাবেই জড়িত নন। অপর দুইজন আদালতে এসে প্রসিকিউশন যে তাদের নামে মিথ্যা বক্তব্য দিচ্ছে তা বলতে চেষ্টা করেছেন। তার মধ্যে বহুল আলোচিত ভাগিরথির ছেলে গণেশ সাহা আদালতে দাঁড়িয়ে তার মায়ের ব্যাপারে সাঈদীকে জড়িয়ে প্রসিকিউশন যে মিথ্যাচার করেছে তা তুলে ধরেছেন। অপরজন সুখরঞ্জন বালী তার ভাই বিশাবালী হত্যার ব্যাপারে সরকার পক্ষের মিথ্যাচার ফাঁস করে দেয়ার জন্য আদালতের দরজা পর্যন্ত আসতে পারলেও পুলিশ সেখান থেকে তাকে ৫ নভেম্বর অপহরণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আজও জানা যায়নি তিনি বেঁচে আছেন নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, আইনে সুযোগ থাকার পরেও প্রসিকিউশনের ২৮ জন সাক্ষীর বিপরীতে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে মাত্র ১৭ জন সাক্ষীর বক্তব্য দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এই ১৭ জন সাক্ষীকে বক্তব্য প্রদানে বাধা প্রদান করা হয়েছে এবং প্রসিকিউশনে সাক্ষীদেরকে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জেরা করতে বাধা দেয়া হয়েছে। এতসব প্রতিবন্ধকতার পরেও প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণে সাঈদীকে সাজা প্রদানের মতো ন্যূনতম উপাদান না থাকার পরেও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো যে কত বড় মিথ্যাচার সুখরঞ্জন বালীর প্রতি সরকারের আচরণ থেকে তা প্রমাণিত। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো যে, সাক্ষীদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে প্রচার করা হচ্ছিল, তাদের কাউকে কাউকে সর্বোচ্চ ৪৫ দিন পর্যন্ত সেফ হাউসে আটকে রাখা হয়েছিল। মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ঐ সাক্ষীরা মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হলে তাদেরকে অজ্ঞাত স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এর প্রমাণ পাঁচ শতাধিক পৃষ্ঠার দলিলপত্র আমরা আদালতে উপস্থাপন করেছিলাম। বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বাধীন তদানীন্তন ট্রাইব্যুনাল এই অকাট্য প্রমাণ গ্রহণ করেনি। পরবর্তী সময় বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপ সংলাপ এবং ই-মেইল থেকে প্রাপ্ত এসব অকাট্য দলিল ঐ ট্রাইব্যুনালের সামনে আসার পরেও এই ট্রাইব্যুনাল সেগুলোকে আমলে নিয়ে মামলা পুনঃবিচারের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে, যা বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক বড় কলংকজনক ঘটনা। এভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাঈদী মিথ্যাচার ও অবিচারের শিকার হয়েছেন।
