কোনো কারণে হরতাল আহ্বান করা হলে ক্ষমতায় থাকা মানুষ অথবা হরতালবিরোধীরা রাস্তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে স্লোগান দিতে থাকে—‘হরতাল মানি না, হরতাল মানবো না’। আমরা লক্ষ্য করেছি, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, তখন রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যু ও জনস্বার্থে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বিরোধী দল হরতাল আহ্বান করলে ক্ষমতাসীন দল বিএনপিসহ ৪ দল হরতাল প্রতিহত করার জন্য তাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনে হরতালবিরোধী স্লোগান দিয়েছে। শুধু তাই নয়, হরতাল আহ্বানকারীদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করেছে। ক্ষমতাসীনরা তাদের পুলিশ বাহিনী দিয়ে হরতালকারীদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারসেল নিক্ষেপ করেছে। সরকারের নির্দেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী হরতাল আহ্বানকারীদের গণগ্রেফতার করে জেল-হাজতে প্রেরণ করেছে। এই হরতাল নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে গ্রেফতার বাণিজ্যেরও অভিযোগ থাকে সব সময়। বর্তমানেও একই অবস্থা চলছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট দেশ শাসন করছে। বিরোধী দলে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল। বিএনপিও তাদের পক্ষ ভারী করার জন্য ইতিমধ্যে ১৮ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করেছে। এ সময় লক্ষণীয় বিষয় যে, সরকারের কোনো কার্যক্রমের বিরোধীতা বা সমালোচনা করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট কোনো হরতাল বা অবরোধ কর্মসূচি দিলে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের তাদের দলীয় কার্যালয়ের আশেপাশে হরতালবিরোধী মিটিং, মিছিল সমাবেশ করে থাকে। হরতালকারীদের ধাওয়া করে ছত্রভঙ্গও করে দেয়।
হরতাল একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বা সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানানোর জন্য রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠনগুলো হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দিতেই পারে। কিন্তু বর্তমানে হরতাল, অবরোধ কর্মসূচির নামে যেভাবে মানুষ হত্যা, গাড়ি ভাংচুর, যানবাহন পোড়ানোর মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চলছে তা মেনে নেয়া যায় না। বিএনপি আহুত একটি হরতালে বাসের মধ্যে জীবন্ত মানুষকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে মারা হয়েছে। অবরোধ চলাকালে একটি ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা নিরীহ পথচারী বিশ্বজিেক কুপিয়ে হত্যা করেছে। এ দৃশ্য সাধারণ মানুষকে হতভম্ব করেছে। আওয়ামী লীগ যখন বিরোধীদলে ছিল তখন তারা হরতাল আহ্বান করলেও এভাবে রাস্তায় গাড়ি ভাংচুর করতো। এ যেন হরতালের চিরাচরিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হরতাল কর্মসূচির নামে বর্তমানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তার সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র শিবির সারাদেশে যে তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। জামায়াত-শিবির একটি ইসলামী দল পরিচয় দিয়ে হরতাল, বিক্ষোভ কর্মসূচির নামে যেভাবে মানুষ হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও, গাড়ি ভাংচুর চালাচ্ছে তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইতিমধ্যে আতংক সৃষ্টি হয়ে গেছে। হরতাল কর্মসূচি দিয়ে জামায়াত-শিবির পুলিশের ওপর যেভাবে আক্রমণ চালায় এটা কী ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি তা মানুষ ভেবে পায় না। জামায়াত-শিবিরের আক্রমণে ইতিমধ্যে কয়েকজন পুলিশ, সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। শুধু তাই নয় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হরতালকারীদের হাতে অনেক গণমাধ্যমকর্মী আহত হয়। ভাংচুর হয় গণমাধ্যমের গাড়ি। জামায়াত-শিবির চাইছে দেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের বাঁচাতে। যারা ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আকাতরে মানুষ হত্যা করেছে। নিরীহ মা-বোনদের ইজ্জত নষ্ট করছে। তারা বিগত ৪১ বছর বিচারের বাইরে ছিল এটাই তো তাদের ভাগ্য। বিগত ৪০ বছর যারা সরকার পরিচালনা করেছে— এই মানবতাবিরোধীদের বিচার না করে তারা অন্যায় করেছে বলে সাধারণ মানুষের ধারণা। এখন হরতাল হলে হরতালবিরোধীরা হরতাল বন্ধের আহ্বান জানিয়ে সভা, সমাবেশে ও মিছিল-মানববন্ধন করে পত্রিকায় বিবৃতি দেয়। এটাই যথেষ্ট নয়, সামাজিকভাবে হরতালের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করতে হবে। পাড়ায়-মহল্লায়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে হরতালের বিরুদ্ধে সোচ্চার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
একদিনের হরতালে কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হয় রাষ্ট্রের। শ্রমজীবী মানুষ তাদের নির্দিষ্ট কাজ না করে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটায়। শ্রমজীবী মানুষ হরতালের কারণে তাদের জীবিকা হারায়। তাই ক্ষতিকর হরতাল কারো কাম্য হতে পারে না। সুতরাং আমরা সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী সচেতন মানুষ হরতাল মানি না। হরতাল বন্ধে প্রয়োজনে জাতীয় সংসদে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হোক।
ঢাকা
