চীনা অর্থনীতির ভিত্তি কারিগরি শিক্ষার উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই কারিগরি শিক্ষার উপর ভর করেই জাপানের অর্থনীতিকে পিছনে ফেলে, আমেরিকার অর্থনীতিকে পিছনে ফেলে এক নম্বর জায়গাটি দখলের পিছনে ছুটছে চীন। কিন্তু গত একদশক ধরে কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি চীন বহুলভাবে ঝুঁকে পড়েছে উচ্চ শিক্ষার দিকে। এই উচ্চ শিক্ষা চীনের চলমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কি আরো এগিয়ে নিতে পারবে? নাকি অদূর ভবিষ্যতে কোটি কোটি উচ্চ শিক্ষিত যুবক বেকারত্বের হতাশায় নিমজ্জিত হবে?
চাও ওয়েপিং মে-জুনের আপেল মৌসুমে একটি বাগানে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটেন। পোকা-মাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে তিনি কাঁচা আপেল প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে বেঁধে রাখেন। এভাবে তিন হাজার ব্যাগ বেঁধে দিনে তার গড়ে ১২ ডলার উপার্জন হয়। বছরের অন্য সময় তিনি একটা গুদামে কাজ করে দিনে কয়েক ডলার উপার্জন করেন যার সবটুকু ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার পিছনে ব্যয় হয়। ছেলে-মেয়েদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় স্কুল-কলেজের শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য পশ্চিমের অনেক পরিবারই সাধ্যাতীত ত্যাগ স্বীকার করে। ছেলে-মেয়ের যতদূর সম্ভব শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য চীনের স্বল্প আয়ের লাখ লাখ পরিবার যে আর্থিক সংকট সামলাচ্ছে তার সাথে পশ্চিমাদের খুবই অল্প প্রচেষ্টাকে তুলনা করা যেতে পারে। যদিও এখন কলেজের একটা ডিগ্রি ভালোমানের একটা চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না। কারণ গত এক দশকে স্নাতকধারীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে চারগুণ।
চীনের পশ্চিমাঞ্চলে একটা ক্ষুদ্র গ্রামে বেড়ে উঠা য়ু এবং কাও দম্পতি একটা ভালো কাজের জন্য গ্রাম ছাড়া হয়েছেন আর সারাজীবন কৃচ্ছ তা সাধন করে এসেছেন। প্রায় ২০০ বর্গফুটের একটা অতি ক্ষুদ্র পরিসরে গত দুই দশক ধরে বসবাস করছেন তারা। নিজেদের কোন গাড়ি নেই, নেই কোন ছুটি— তারা কখনো সমুদ্র দেখেননি। শুধু বাসভাড়া এবং উপহার ক্রয়ের টাকাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য গত পাঁচটি নববর্ষে পূর্বপুরুষদের ভিটা মাটিতে পদার্পণ পর্যন্ত করেননি। একটু বাড়তি উপার্জনের আশায় য়ু ছুটির দিনে খনিতে কাজ করেন। অতি সাবধানী হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রয়োজনীয় অবসরকালীন সঞ্চয় নেই।
বেইজিং থেকে ৯০০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, সাংহাই প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি অতি প্রাচীন গ্রামে য়ু দম্পতি বাস করতেন। অতি সম্প্রতি ধান, শস্য এবং তরকারী চাষবাসের জন্য উপযু্ক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত, ক্ষুদ্র নদীর পাশে উপত্যকাটির সমতল ভূমিটি সংরক্ষিত ছিল। গ্রামবাসীরা ছিল খুবই সাধারণ কৃষক। সকল বয়স্ক লোক এমনকি ছোট ছেলে-মেয়ে ছাড়া গ্রামবাসীদের সকলেই ধান, শস্য, সবজি ফলানোর কাজে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত থাকে। দম্পতির মাসিক আয় ছিল মাত্র ২৫ ডলার। তাদের কন্যাটি যখন সবেমাত্র হাঁটতে শিখেছে তখন তারা মুষড়ে পড়ল এই ভেবে যে তার কন্যার পক্ষে অতদূর হেঁটে স্কুলে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। শিক্ষার আলো থেকে সে হয়ত সারাজীবন বঞ্চিতই থাকবে। তাই চীনের লাখ লাখ পরিবারের মতো তারা তাদের পূর্বপুরুষদের গ্রাম এবং পরিবার ছেড়ে আসার জন্য সিদ্ধান্ত নেন।
ইতিমধ্যে য়ু মধ্য স্কুলে পড়াশুনা করছে আর পার্বত্য উপত্যকার স্মৃতি ফিকে হয়ে এসেছে। পরিবারকে যেতে হয়েছে হাংঝিইংয়ে, সাংহাই প্রদেশের উত্তর অঞ্চলে খনি সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের পূর্ব পুরষদের গ্রাম থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরে। এই ত্যাগ স্বীকারের কারণে তাদের ১৯ বছর বয়সী কন্যা য়ু কাওয়িং এখন কলেজছাত্রী। সে লাখ লাখ কলেজ ছাত্রদের একজন যারা তাদের পিতা-মাতার উচ্চাশার চেয়েও অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু পিতা-মাতা কঠোর পরিশ্রমী হওয়া সত্ত্বেও কন্যার ভবিষ্যত্ নিয়ে তারা নিশ্চিত নন। য়ু একটা বড় কোম্পানিতে কাজের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু জানে যে অনেক স্নাতকই বেকার। অভিজ্ঞতা এবং অর্থের সীমাবদ্ধতার কথাও সে স্বীকার করে।
প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় এবং কমিউনিটি কলেজ থেকে আশি লাখ যুবক স্নাতক ডিগ্রি লাভ করছে। সন্তানদের উচ্চশিক্ষা লাভ এবং উন্নত জীবন এবং বৃদ্ধ বয়সে তাদের ভরণ-পোষণের আশায় লাখ লাখ চীনা পরিবারের এই ত্যাগ স্বীকারেও তার নিশ্চিত নয় তাদের প্রিয় সন্তানদের ভবিষ্যত্।
কিন্তু উচ্চ শিক্ষার খরচের সাথে চীনের ধীরে অগ্রসরমান অর্থনীতির একটা সামঞ্জস্য আছে সেসাথে সাম্প্রতিক স্নাতকধারীদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে। স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর য়ু’র মত যুবক-যুবতীরা শুধু নিজেরা টিকে থাকার মত একটা চাকরি জোটাতে পারবে কিনা এবং সেসাথে আগামী বছরগুলোতে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা থাকবে কিনা চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের সেটা একটা বড় পরীক্ষা।
