সংঘাত-সহিংসতা চলছেই। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়ে আজ সোমবার পর্যন্ত পাঁচদিন ধরে সহিংসতা ঘটছে অনেকটা বিরতিহীনভাবে। প্রতিদিনই পড়ছে লাশ। এই লাশের সারিতে রয়েছেন পুলিশ, পথচারী ও সাধারণ মানুষসহ জামায়াত-শিবির কর্মীরা, রয়েছেন আওয়ামী লীগ কর্মীও। আহত হচ্ছেন শত শত মানুষ। চলছে যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক আর অজানা ভীতি। গত কয়েকদিনে ১৫ থেকে ২০টি জেলায় ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও রাজধানীসহ সারাদেশের মানুষ মূলত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, বর্তমান সরকারের আমলে প্রথমবারের মত টানা ৬০ ঘণ্টার হরতাল এবং বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীরা সড়ক কেটে ফেলায় রাজধানী কার্যত এখন গোটা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সবমিলিয়ে দেশময় এক অশান্ত পরিস্থিতি।
উদ্ভূত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সম্পর্কে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আমরা নিজেরাও আতঙ্কে। দেশের ১৬ কোটি মানুষ এখন উদ্বিগ্ন, উত্কণ্ঠিত। এর কোনো সহজ সমাধানও নেই। রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই এই সামাজিক সমস্যা। তার মতে, রাজনীতির কারণেই এই সমস্যার সৃষ্টি, তাই রাজনীতিবিদদেরই এর সমাধান বের করতে হবে, মানুষকে আতঙ্ক থেকে মুক্তি দিতে হবে। বাইরের কেউ এসে এর সমাধান দিতে পারবে না।
জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পরপরই ঢাকায় কিছুটা কম হলেও দেশের ১৪টি জেলায় ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। সেদিন ৩৯ জন নিহত হওয়াসহ গত কয়েকদিনের সংঘাত-সংঘর্ষ আর গুলি ও ককটেলে মানুষ নিহত-আহত হওয়ার খবর সারাক্ষণ প্রচার হচ্ছে টিভি চ্যানেলগুলোতে, সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে কেবল সংঘাত, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ আর মর্মান্তিক প্রাণহানির খবর। এসব দেখে কখনও ভয়ে আঁঁতকে উঠছে মানুষ, কখনও কাঁপছে অজানা শঙ্কায়। বিশেষ করে তুলনামূলকভাবে ঢাকায় সহিংসতার ঘটনা কম ঘটলেও এটি এখন যেন এক আতঙ্কের নগরী। প্রয়োজনের তাগিদে যারা সন্ধ্যার পরে ও গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে থাকেন তাদের আতঙ্ক আরও বেশি।
রাজধানীর বিভিন্ন পেশার মানুষজনের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি পার করছেন তারা। যাদের বাইরে খুব বেশি কাজ নেই তারা বর্তমানে বাড়িঘরে এক রকম অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। আতঙ্কের কারণে খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কেউ বাসার বাইরে যাবারও সাহস করছেন না। বের হলেই মনে হচ্ছে এই বুঝি গোলাগুলির মধ্যে পড়তে হচ্ছে, এই বুঝি গুলি এসে শরীরে বিদ্ধ হচ্ছে, কিংবা মাথায় এসে পড়ছে ইট-পাথর বা ককটেল। অনেকে বলছেন, বাড়ির বাইরে গেলে সুস্থভাবে বাসায় ফিরতে পারবেন কিনা, প্রতিটি মুহূর্তে এখন এ রকম অনিশ্চয়তা।
প্রায় দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলায় এবং টানা ৬০ ঘণ্টার হরতালের প্রভাব পড়েছে প্রতিটি নাগরিকের উপর। দোকানপাট বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। সবজিসহ নিত্যপণ্য বাইর থেকে আসতে না পারায় রাজধানীবাসী পড়েছে চরম ভোগান্তিতে। ঢাকার কাঁচা বাজারগুলোতে দেখা দিয়েছে পণ্য ঘাটতি, বেড়েছে মূল্য। মুদি দোকানগুলোতেও অনেক পণ্য ফুরিয়ে গেছে। অন্যদিকে, হাসপাতাল ও চিকিত্সকের কাছে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগীদের। বেশিরভাগ চিকিত্সকই নিজ চেম্বারে না আসার কারণে ভোগান্তি আরও বেড়েছে। এছাড়া সিংহভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং পূর্ব নির্ধারিত বিভিন্ন পরীক্ষা স্থগিত কিংবা পিছিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরাও পড়েছেন হতাশায়। এনিয়ে অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায়।
চলমান এই অবস্থাকে ‘বিভীষিকাময়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম. হাফিজউদ্দিন খান। গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, জামায়াত-শিবির সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালাচ্ছে, এটা সত্য। যা কোনভাবে সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। বিএনপি তাদের পক্ষ নেয়ায় তারা আরও সাহস পেয়েছে। কিন্তু তাদের মোকাবেলায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে গুলি চালাচ্ছে সেটিও ঠিক হচ্ছে না। এ রকম দমবন্ধ অবস্থা থেকে মানুষকে নিষ্কৃতি দেয়ার লক্ষ্যে সরকারের উচিত তাদেরকে (জামায়াত-শিবির কর্মীদের) ডেকে কথা বলা, তাদের বুঝানো উচিত। অন্যথায় দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে, মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে।
এদিকে, টানা ৬০ ঘণ্টার চলমান হরতালের কারণে রাজধানী বর্তমানে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। গত চারদিনের সংঘাতে বগুড়া, নোয়াখালী, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, গাইবান্ধা, রংপুর ও খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবির কর্মীরা মহাসড়ক বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার কারণে হরতালের আগে থেকেই অন্তত ৮টি জেলার সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ঢাকা। একই কারণে কোথাও কোথাও জেলার সঙ্গে সেখানকার উপজেলাগুলোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গণপরিবহন না থাকায় অনেকে ঢাকায় আটকা পড়েছেন, কেউ আটকা পড়েছেন অন্যান্য নগরী ও জেলা সদরে।
চলমান হরতালের আগেই সারাদেশে বিভিন্ন স্থানে গাড়ি ভাংচুর, কোনো কোনো জায়গায় হরতাল ও ১৪৪ ধারা জারি ছিল। যার কারণে হরতালের আগে থেকেই অনেক রুটে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়ড়।
দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে বিরাজমান আতঙ্ক, ভীতি ও তাদের ভোগান্তির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর ও আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম গতকাল গণমাধ্যমকে বলেছেন, তারা আশা করছেন-দু’একদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
