আসমানী
আসমানীদের দেখতে যদি তোমরা সবে চাও
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।
পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক-খান হাড়,
সাক্ষী দিছে অনাহারে কদিন গেছে তার।
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি
থাপড়েতে নিবিয়ে গেছে দারুণ অভাব আসি।
পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালি তার গা বরণের করছে উপহাস।
ভোমরা-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি।
বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হল তাই কেঁদে,
হয়নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।
আসমানীদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে
ব্যাঙে ছানা শ্যাওলা-পানা কিলিবলিবল্ করে।
ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে,
সেই জলেতে রান্না-খাওয়া আসমানীদের চলে।
পেটটি তাহার দুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,
বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।
পঞ্চাশ দশকের প্রথম দিকে কবি জসীমউদ্দীন একবার লন্ডন সফরে যান। উদ্দেশ্য ছিলো লোকসঙ্গীত সম্মেলনে যোগদান করা। সেই সম্মেলনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে যেয়ে তিনি বলেছিলেন: ‘লোকসঙ্গীতের এক বিরাট সম্মেলনে যোগ দিতে লন্ডনে তো গিয়েছি, কিন্তু আমি বাংলার এক পল্লী কবি। কবিতা লিখি, গান লিখি, মনের সুখে হেড়ে গলায় সে গান গাইও কখনো কখনো। কিন্তু সেইসব বিষয় নিয়ে কথা বলা এত বড় শহরের গুণী-জ্ঞানীর সমাবেশে সাজে কিনা ঠাহর করতে পারছিলাম না। তাই শুরু করি ঢাকা শহরের কথা দিয়ে। বলি, ঢাকা খুব পুরোনো আর বড় শহর। বিরাট বিরাট বল্ডিং হচ্ছে, আজদাহা সব অফিস উঠছে আকাশ ফুঁড়ে। রাজধানী শহরতো, পূর্ব-পাকিস্তানের রাজধানী।’ এইসব কথা বলি, আর শ্রোতাদের চোখ-মুখের দিকে তাকাই। না, কাজ হয় না। শ্রোতাদের চোখ যেন পাথরের চোখের মতো মনে হয়—চেহারায় কোনো ঔত্সুক্য ও কৌতূহল নেই। কী করি, আবার বলি, আমাদের দেশ নতুন, তবে খুব বড় বড় নেতা আছেন আমাদের। তাতেও কোন ফল হয় না। হঠাত্ মনে হয় মায়ের কাছে মামার বাড়ির গল্প বলছি না তো! লন্ডন শহরে এসে আমি যে বলছি ঢাকা খুব বড় শহর, আর আমাদের নেতারা খুব বড়— এইসব কথা এখানে বিকোবে কেন? এঁরাতো আমাকে আহাম্মক ভাববে। তাই মন ঠিক করে ফেললাম। ভাবলাম, যে বিষয় বাংলায় আমাকে গৌরব দিয়েছে আমি সেই বিষয় নিয়েই বলবো, যা থাকে কপালে।
একটু কেশেটেশে নিয়ে শুরু করি। ‘আহারে কী সুন্দর আমার পল্লী বাংলা। ধানের ক্ষেতে সেখানে বাতাস ঢেউ তুলে খেলা করে। লাউয়ের কচি ডগার মতো কোমল মেয়েরা পাছাপেড়ে শাড়ি পরে যখন আলপথ ধরে জলকে যায় সে দৃশ্য আর কোন দেশে পাওয়া যাবে! আমার দেশের লোকসঙ্গীত এই আবহের মধ্য থেকে সৃষ্টি হয়। এইবার দেখি স্রোতারা নড়ে-চড়ে বসছেন, চোখের দৃষ্টিতেও এসেছে কোমলতা ও আগ্রহের ছাপ।’ আমি এইবার আসল সত্যটি বুঝে যাই। ‘যা আমার নিজস্ব এবং খাঁটি শুধু তাই অন্যকে আকৃষ্ট করতে পারে—অন্যের বৈশিষ্ট্যকে নিজের বলে চালানোতে কোন গৌরব নেই।’
১৯৫৭ সালে মানিকগঞ্জের চারিগ্রামে কবি মঈনুদ্দীনের জন্মোত্সবে প্রধান অতিথির ভাষণে কথাগুলো বলেছিলেন কবি জসীমউদ্দীন। আমি ঐ অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা হিসেবে কবিকে নিয়ে গিয়েছিলাম এবং সব সময়ে তাঁর সঙ্গে ছিলাম। অনুষ্ঠানের প্রথমেই তিনি বেদেদের নিয়ে আসতে বলেন। তাদের গান শুনতে চান। আর বলেন, এদের সামান্যতম অসম্মান যদি আপনারা করেন তাহলে আমি অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যাব।
এইরকমই ছিলেন কবি জসীমউদ্দীন। সহজ-সরল, সাদাসিদে একজন মানুষ। পায়ের নথ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত খাঁটি বাঙালি। কবি হিসাবেও তিনি বাংলার কবি—বাঙালির কবি। ‘এক পয়সার বাঁশি, হাসু, ডালিম কুমার, যে দেশে মানুষ বড়ো’, ‘বাঙালির হাসির গল্পসহ কতো মনোমুগ্ধকর বই লিখেছেন তিনি। তাঁর এইসব বইয়ে বাংলাদেশের মাটির সোঁদা গন্ধের পরিচয় আছে। বাংলা ও বাঙালিকে ভালো না বাসলে, হূদয় দিয়ে তাদের না জানলে এমন বই লেখা যায় না। তাঁর কবিতা ও গদ্যে আছে এক ভিন্ন স্বাদ, অনন্য জাদু। তাঁর ভাষা ও বলবার ভঙ্গির এই চমত্কারিত্বের জন্য ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বলেছিলেন: ‘জসীমউদ্দীনের কবিতা পড়লে মনে হয় মায়ের হাতে তৈরি পিঠা খাচ্ছি।’ জসীমউদ্দীনের গদ্যও খুব স্বাদু—অন্য কারু মতন না। গদ্য ও কবিতা দুইয়ের জন্যই তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
কবি জসীমউদ্দীন বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও ছিলেন সোচ্চার। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সকল সংগ্রামে তিনি ছিলেন এক লড়াকু যোদ্ধা। এক্ষেত্রে তাঁর প্রজ্ঞা, সাহস ও লেখনি শক্তিকে তিনি তাত্পর্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করেছিলেন। উদ্বুদ্ধ করেছিলেন গ্রামীণ কবিয়াল, বয়াতি ও গায়কদেরও। সেদিক দিয়ে তিনি এক মহান দেশপ্রেমিক এবং গণমানুষের কবি। বাংলা সাহিত্যে জসীমউদ্দীনের তুলনা শুধু জসীমউদ্দীনের সঙ্গেই হতে পারে। অন্য কারো সঙ্গে নয়। আমরা বাংলাদেশের হূদয় থেকে উঠে আসা এই কবিকে তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাই। জয়তু জসীমউদ্দীন। (প্রথম পর্ব)
