মোবাইলের বৃহত্তম প্রদর্শনী

মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস ২০১৩

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০১৩, ২১:১৬
জিএসএম অ্যাসোসিয়েশন বা জিএসএমএ’র আয়োজনে গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল চলতি বছরের মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস। গত বছরেই জিএসএমএ’র পক্ষ থেকে স্পেনের বার্সেলোনাকে ঘোষণা দেওয়া হয় বিশ্ব মোবাইল বাজারের রাজধানী হিসেবে। এবং এরপর থেকে বিশ্বব্যাপী মোবাইল ডিভাইসের প্রদর্শনীও প্রতি বছরেই বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই হিসেবেই ফেব্রুয়ারির ২৫ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিশ্বের সর্ববৃহত্ মোবাইল ডিভাইস ও প্রযুক্তির প্রদর্শনী ‘মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস ২০১৩’। নতুন নতুন স্মার্টফোন, ট্যাবলেট পিসি, হাইব্রিড ডিভাইস আর নতুন ধরনের মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম, প্রযুক্তির উপস্থিতিতে জমজমাট হয়ে উঠে এই আয়োজন। প্রযুক্তি বিশ্বের কাছে নানান চমক নিয়ে হাজির হওয়া এই মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসের নানা তথ্য তুলে ধরা হলো এই লেখায়। বিশ্বের বৃহত্তম মোবাইল প্রদর্শনী বার্সেলোনার ফিরা গ্র্যান ভিয়াতে অনুষ্ঠিত হয় এই বছরের মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস। বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশ থেকে আগত দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখরিত ছিল ৪ দিনের এই আয়োজন। ১৭ শ’রও বেশি কোম্পানি অংশগ্রহণ করে এই প্রদর্শনীতে। আর তাদের জন্য প্রদর্শনীতে ছিল ৮টি হল। এ ছাড়া বাইরের খোলা মাঠেও ছিল বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ে আসা নতুন নতুন ফোন, ট্যাবলেট পিসি, মোবাইল ডিভাইস, নতুন প্রযুক্তি, অ্যাপ্লিকেশন আর অ্যাকসেসরিতে উজ্জ্বল ছিল এই আয়োজন। নানা ধরনের ডিভাইস আর প্রযুক্তির মধ্যে এবারে মোবাইল ক্লাউড, মোবাইল মানি, মোবাইল পেমেন্ট, গ্রিন টেকনোলজি বা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে দেওয়া হয় বিশেষ গুরুত্ব। পাশাপাশি অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপারদের নিয়ে কনফারেন্স ছাড়াও ছিল নানা ধরনের সেমিনার। এসব আয়োজনের অনেকগুলোই ছিল সকলের জন্য উন্মুক্ত, যা উপভোগ করতে উপস্থিত সকলেই। প্রযুক্তি মহারথীদের মিলনমেলা বিশ্বখ্যাত সব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন এই আয়োজনে। বিভিন্ন কনফারেন্সে তারা তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত এসব রথী-মহারথীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের মধ্যে রয়েছেন জিএসএমএ’র চেয়ারম্যান ও টেলিকম ইটালিয়ার সিইও ফ্রাঙ্কো বার্নারে, এটিঅ্যান্ডটির প্রেসিডেন্ট ও সিইও র্যান্ডাল স্টিফেনসন, ভারতী এয়ারটেলের এমডি ও সিইও মনোজ কোহলি, চায়না মোবাইলের চেয়ারম্যান মি গুয়োহুয়া, ড্রয়ারক্সের প্রতিষ্ঠাতাও সিইও ড্রিউ হাউস্টন, এরিকসনের চেয়ারম্যান ও সিইও হ্যান্স ভেস্টবার্গ, মহিলার চেয়ারম্যান মিশেল বেফার, নকিয়ার প্রেসিডেন্ট ও সিইও স্টিফেন ইলোপ, এনটিটি ডোকোমো’র প্রেসিডেন্ট ও সিইও কাউরু কাটো, কোয়াল কমের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. পল জ্যাকবস প্রমুখ। নতুন প্রযুক্তির আর ডিভাইসের খবরাখবর দিয়ে তারা প্রযুক্তিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে রেখেছিলেন। এনএফসি এক্সপেরিয়েন্স জোন গত কয়েক বছর ধরেই এনএফসি প্রযুক্তি রয়েছে আলোচনার শীর্ষে। প্রযুক্তি বিশ্বের বড় ধরনের এক পরিবর্তন নিয়ে আসতে সক্ষম এই এনএফসি প্রযুক্তি—সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে খুব মানুষেরই। তবে এখনও পর্যন্ত সর্বত্র এই প্রযুক্তির সেই পরিমাণ প্রসার আমরা লক্ষ করতে পারিনি। তাই বলে এনএফসি’র ব্যবহার আর প্রসার নিয়ে প্রশ্ন নেই প্রযুক্তিবিদদের। তারই প্রমাণ আবারও মিলল মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে। এবারের আয়োজনে ছিল প্রথমবারের মতো এনএফসি এক্সপেরিয়েন্স জোন। গোটা প্রদর্শনী এলাকাজুড়ে ছিল এনএফসি পয়েন্ট। এনএফসি সমৃদ্ধ ডিভাইস দিয়ে এসব পয়েন্টে এনএফসি’র কার্যকারিতা হাতে-নাতে দেখার সুযোগ উন্মুক্ত ছিল দর্শনার্থীদের জন্য। শুধু তাই নয়, এনএফসি’র ব্যবহারকে উত্সাহিত করার জন্য ‘এনএফএস চ্যালেঞ্জ’ নামক একটি প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয় মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে। এনএফসি সংক্রান্ত অ্যাপ্লিকেশন, সেবা, পণ্য বা সলিউশন নিয়ে আয়োজিত হয় এই প্রতিযোগিতা। প্রদর্শনী প্রাঙ্গণের পাশাপাশি গোটা বার্সোলোনা শহরে এনএফসি পয়েন্ট স্থাপন করা হয়। এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে শহরের ব্যস্ততম সব স্থানে স্থাপন করা এসব পয়েন্ট থেকে প্রদর্শনীর তথ্য, ভ্রোশিয়ার, পোস্টারসহ অন্যান সেবা পাওয়ার সুবিধা ছিল। মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম গুগল’র অ্যান্ড্রয়েড আর অ্যাপল’র আইওএস দিয়েই স্মার্টফোন আর ট্যাবলেট পিসির বাজার সয়লাব হয়ে রয়েছে। এদের বাজারকে যখন অনেকটাই সুরক্ষিত মনে হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়েই প্রযুক্তি বিশ্বের সামনে হাজির হয়েছে বেশ কয়েকটি উন্মুক্ত মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম। এগুলো নিয়ে অবশ্য জল্পনা-কল্পনাও চলছে অনেকদিন ধরে। তবে এই মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসকেই এসব অপারেটিং সিস্টেম বেছে নিয়েছে নিজেদের আত্মপ্রকাশের জন্য। এর মধ্যে শুরুতইে আসবে মজিলা ফাউন্ডেশনের ফায়ারফক্স ওএস-এর কথা। বেশ কয়েকটি স্মার্টফোন মডেল দিয়ে মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে হাজির হয় ফায়ারফক্স ওএস। অ্যালকাটেল, জেডটিই, এলজি এবং হুয়াওয়ে’র কয়েকটি মডেল অবমুক্ত হয়েছে ফায়ারফক্স ওএস দিয়ে। এদিক উন্মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে লিনাক্সের ডিস্ট্রিবিউশন উবুন্টু প্রথমবারের মতো তৈরি করেছে মোবাইল সংস্করণ। ট্যাবলেট পিসি এবং স্মার্টফোন যেহেতু স্পর্শকাতর পর্দানির্ভর ডিভাইস, তাই উবুন্টুও তাদের মোবাইল সংস্করণটি তৈরি করেছে টাচ ফিচারকে মাথায় রেখেই। এর নামও দেওয়া হয়েছে ‘উবুন্টু টাচ’। এলজি নেক্সাস ৪ এবং গুগল নেক্সাস৭ মডেলে প্রদর্শিত উবুন্টু টাচ নজর কেড়েছে সকলের। এর বাইরে স্যামসাং তাদের স্মার্টফোন অপারেটিং টাইজেনকেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছে সকলের মাঝে। সেরা সব স্মার্টফোন আকারের দিক থেকে স্মার্টফোন বেড়েই চলেছে। এই প্রবণতা গত বছরের মতোই এবারেও দেখা গেছে কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স শোতে। মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসেও ছিল তার ছাপ। আকারের দিক থেকে আবার স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটের মাঝামাঝি কিছু ডিভাইসও তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন স্মার্টফোনের মধ্যে যে কয়েকটি স্মার্টফোন সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে, তার মধ্যে শুরুতেই আসবে এলজি’র অপটিমাস জি প্রো-এর কথা। কোয়ার কোর প্রসেসরের অপটিমাস জি প্রোতে রয়েছে ১০৮০ পিক্সেল ডিসপ্লে, ৫.৫ ইঞ্চি ফুল এইচডি স্কিন, ১৩ মেগাপিক্সেল এইচডি ক্যামেরা। অন্যদিকে সাশ্রয়ী স্মার্টফোন হিসেবে নকিয়ার লুমিয়অ ৫২০ নজর কেড়েছে সবার। উইন্ডোজ ফোনে ৮ অপারেটিং সিস্টেমের ফোনটির মূল্য মাত্র ১৮০ ডলার। এর বাইরে আলোচিত স্মার্টফোনের মধ্যে ছিল নকিয়া লুমিয়া ৭২০, আসুস প্যাডফোন, আসুস ফোনপ্যাড, এইচটিসি ওয়ান, জেডটিই গ্র্যান্ড মেমো, হুয়অওয়ে অ্যাসেন্ড পি২, অ্যালকাটেল ওয়ানটাচ স্ন্যাপ, এসার লিকুইড ই১, লিকুইড জেড ২, এলজি নেক্সাস ৪, ওয়ানটাচ ফায়ার প্রভৃতি। সেরা সব ট্যাবলেট মোবাইল ডিভাইস হিসেবে ট্যাবলেট পিসির গ্রহণযোগ্যতা এখন স্মার্টফোনের মতোই। বিশেষ করে একটু ছোট আকারের ট্যাবলেট পিসিকে অনেকেই স্মার্টফোনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে চলেছেন। মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে তাই অনেকগুলো ট্যাবলেট পিসিই চোখে পড়েছে। এর মধ্যে সনির পানিরোধী এক্সপেরিয়া জেড ট্যাবলেট নজর কেড়েছে সকলের। কোয়াড-কোর স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসরের এই ট্যাবলেটের পাশাপাশি স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি ৮.০-ও নজর কেড়েছে সকলের। ছোট আকারের এই ট্যাবলেট আইপ্যাড মিনির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হতে সক্ষম বলেই ধারণা বিশ্লেষকদের। এছাড়া আসুস ফোনপ্যাড ও ৭” আকৃতির একটি ভালো ট্যাবলেট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন পর আবার এইচপি প্রবেশ করেছে ট্যাবলেট পিসির বাজারে ‘স্লেট ৭’ মডেলের ট্যাবলেট পিসি দিয়ে। আসুস মেমোপ্যাড ১০ আর লোনোভোর এস৬০০০ ট্যাবলেটও সাড়া জাগিয়েছে। অ্যাকসোসরিজ স্মার্টফোন আর ট্যাবলেট পিসির পাশাপাশি নানা ধরনের অ্যাকসেসরিজও ছিল প্রদর্শনীতে। এর মধ্যে স্যামসাংয়ের হোমসিংক নামের সেট-টপ বক্সটি ছিল প্রদর্শনীর অন্যতম সেরা অ্যাকসোসরিজ। ১.৭ গিগাহার্জ ডুয়াল-কোর প্রসেসরের এই ডিভাইসে রয়েছে ১ টেরাবাইট স্টোরেজ। এবার মোবাইলের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের সুরক্ষায় ছিল প্রটেক্ট কিউ। এ ছাড়া থ্রিজি ও জিপিএস দ্বারা ট্র্যাক করতে সক্ষম ট্র্যাকটিভ, এলকমের তৈরি আইফোন ৫ অ্যাকসোসরিজ ভি-ওয়ার্ল্ডের ব্লু-টুথ ফোনও ছিল আকর্ষণীয়।