ধূমপায়ীদের রোগ বার্জার’স ডিজিজ

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৩, ১৫:৩৫
বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে একদিন শুরু করলেন ধূমপান। প্রথমে শখের বশে, তারপর এক সময় পুরোপুরি চেইনস্মোকার বনে গেলেন আপনি। একদিন হঠাত্ অনুভব করলেন, আপনার পায়ের ডিমে (কাফ মাসল) ব্যথা করছে। হাঁটাহাঁটি কিংবা ক্লান্তির জন্য হতে পারে ভেবে বিশ্রাম নিলেন আপনি। বিশ্রাম নেয়ার পর ব্যথাটা চলে যেতেই আরামবোধ করলেন। কিন্তু কিছু দিন পর লক্ষ করলেন টনটনে ব্যথাটা আবার জেগে উঠেছে। হাঁটলে ব্যথা করে, বিশ্রাম নিলে চলে যায়। কিন্তু এরপর এমন হলো যে, বিশ্রাম নিলেও ব্যথা আর কমে না। ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছে ব্যাপারটা। রাতে ঘুমাতে পারেন না ব্যথায়। এ দিকে আবার আপনার পায়ের আঙ্গুলে ঘা দেখা দিয়েছে। কি হয়েছে আপনার বুঝতে পারলেন না। গেলেন চিকিত্সকের কাছে। চিকিত্সক আপনাকে পরীক্ষা করে বললেন, রোগটির নাম ‘বার্জার’স ডিজিজ’। আপনার আঙ্গুল কেটে ফেলতে হবে। আক্রান্ত আঙ্গুলটা কেটে ফেলার পর কিছু দিন স্বস্তিবোধ করলেন আপনি। ঝামেলা চুকে গেছে ভেবে নতুন উদ্যমে শুরু করলেন আবার ধূমপান। ফিরে এলো পুরনো ব্যথাটি। প্রচণ্ড ব্যথায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন আপনি। চিকিত্সক এবার যা বললেন, শুনে আপনার মুখ হাঁ হয়ে গেল। আপনার পুরো পাটাই কেটে ফেলতে হবে হাঁটু থেকে। সামান্য সিগারেট থেকে এই অসামান্য ক্ষতি হতে পারে জানলে কোনো দিন ভুলেও মুখে নিতেন সিগারেট? নিশ্চয়ই নয়। বার্জার’স ডিজিজ কি পায়ের ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকৃতির ধমনীগুলোতে রক্ত চলাচলে প্রতিবন্ধকতার ফলে সৃষ্ট অবস্থার নাম বার্জার’স ডিজিজ। ধূমপানের ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। আমেরিকার চিকিত্সাবিজ্ঞানী লিও বার্জার (১৮৭৯-১৯৪৩)-এর নামানুসারে রাখা হয় এর নাম। চিকিত্সা বিজ্ঞানে একটা কথা আছে- নো-স্মোকিং নো বার্জার’স। যারা ধূমপান করেন না তাদের কখনোই এ রোগটি হবে না। আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের মধ্যে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা প্রচুর। বার্জার’স রোগী অপারেশনের পর যদি আবার ধূমপান শুরু করে তাহলে পুনরায় দেখা দেয় রোগটি। ধমনীতে তিনটি স্তর থাকে। সব স্তরই আক্রান্ত হয়। রক্ত চলাচলে বাধাগ্রস্ততার জন্য পায়ে এক সময় পচন শুরু হয়। রোগের উত্সর্গ বার্জার’স রোগের উপসর্গের কয়েকটি ধাপ রয়েছে। ১. রোগী পায়ে, বিশেষ করে কাফ মাসলে ব্যথা অনুভব করে। কখনো কখনো উরু কিংবা নিতম্ব অথবা পায়ের পাতায় ব্যথা হয়। ব্যথা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। সাধারণত রোগী হাঁটলে কিংবা ব্যায়াম করলে শুরু হয় ব্যথা। বিশ্রাম নিলে ব্যথা সেরে যায়। রোগী আবার হাঁটা শুরু করলে তা আবার ফিরে আসে। এ অবস্থা বারবার চলতে থাকে। দেখা গেছে,্ এর আগে রোগী যতটুকু হাঁটার পর ব্যথা শুরু হতো, পরে তার চেয়ে কম হাঁটলেই ব্যথা শুরু হয়। অর্থাত্ আগে যেখানে আধা মাইল হাঁটলে পায়ে ব্যথা হতো, সেখানে বর্তমানে সিকি মাইল হাঁটলেই একই রকম ব্যথা হয়। অর্থাত্ ক্রমেই রোগীর চলাচল এবং ব্যথার আক্রমণের মধ্যবর্তী সময়টা কমে আসতে থাকে। ২. রোগী বিশ্রামরত অবস্থায়ও যদি ব্যথা অনুভব করে, তবে বুঝতে হবে গ্যাংগ্রিন হতে আর বেশি দেরি নেই। সে ক্ষেত্রে রোগী পায়ের পাতায় বেশি ব্যথা অনুভব করে। রাতে এই ব্যথা তীব্রতর হয়। পা ওপরে তুলে বা বিছানার বাইরে ঝুলিয়ে রোগী ব্যথা থেকে মুক্তির পথ খোঁজে। কখনো কখনো শীতল মেঝেতে দাঁড়িয়ে আরাম পেতে চায়। কিন্তু ব্যথা একসময় এত অসহনীয় হয়ে ওঠে যে, রোগী ঘুমানোর জন্য বিছানা ছেড়ে চেয়ার বেছে নেয়। সারারাত কেটে যায় তার সীমাহীন অস্থিরতায়। ৩. বিশ্রামরত অবস্থায় যে ব্যথা হয়, পা ওপরে উঠালে বা নড়াচড়া করলে সে ব্যথা আরো বেড়ে যায়। রোগীর ঘুম নষ্ট হয়ে যায়। দিনে দিনে আরো বিধ্বস্ত হয়ে যায় সে। তার মুখের দিকে তাকালেই যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ চোখে পড়ে। ৪. রোগীর পা টনটন করে এবং তা অসাড় বা অনুভূতিশূন্য হয়ে আসে। আক্রান্ত অংশ শরীরের অন্যান্য অংশের চেয়ে ঠাণ্ডা থাকে। ৫. আক্রান্ত বা গ্যাংগ্রিনের জন্য কালো হয়ে যায় এবং কুঁচকে যায়। পচন থেকে দুর্গন্ধ বেরোতে থাকে। ৬. অবিরাম ব্যথা এবং নিদ্রাহীন রাত কাটানোর ফলে রোগীর চেহারায় অসময়ে বয়সের ছাপ পড়ে এবং চোখ-মুখ ভেতরে বসে যায়। নষ্ট হয়ে যায় চেহারার ঔজ্জ্বল্য। সেখানে দারুণ এক আতঙ্ক ভর করে। ৭. রোগী বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসতে পছন্দ করে। চিত্ হয়ে শুয়ে থাকতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। সে তার আক্রান্ত পা কাউকে ধরতে দিতে চায় না। এমনকি চিকিত্সকও তার পা স্পর্শ করামাত্র সে পিলে চমকানো কাতর ধ্বনি করে ওঠে। একজন চিকিত্সক রোগীর আক্রান্ত পায়ে কী পরীক্ষা করেন প্রথমত চিকিত্সক রোগীর পা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি সুস্থ পায়ের সাথে আক্রান্ত পাটি মিলিয়ে দেখেন। রোগীর পায়ের রঙ পরিবর্তন হয়েছে কি না বা কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে তা লক্ষ করেন। আক্রান্ত পায়ের ভালো অংশের সাথে খারাপ অংশের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট রেখা আছে কি না পরীক্ষা করেন, পায়ে স্বাভাবিক লোম আছে কি না, লোম কম কিংবা একেবারেই অনুপস্থিত কি না, রোগীর পায়ের ত্বক শুকিয়ে গেছে কি না বা তা কুঁচকে গেছে কি না, ঘা আছে কি না, নখের অবস্থা কেমন, মাংসপেশি শুকিয়ে গেছে কি না ইত্যাদি অনেক কিছু পরখ করেন। অতঃপর তিনি হাত দিয়ে রোগীর পায়ের উত্তাপ, রক্তনালীর স্পন্দন, অনুভূতি ইত্যাদি অনুভব করার চেষ্টা করেন। চিকিত্সক রোগীকে পরীক্ষা করে যা পান, তাহলো- এক. থেকে থেকে ব্যথার ক্ষেত্রে- ++পায়ের রঙ স্বাভাবিক থাকে। সুস্থ পায়ের তুলনায় আক্রান্ত পা ঠাণ্ডা থাকে। ডরসালিস পেডিস, পোস্টেরিওর টিবিয়াল, পপলেটিয়াল প্রভৃতি ধমনীর স্পন্দন দুর্বল কিংবা অনুপস্থিত থাকে। পায়ের রক্ত সঞ্চালন, সংবেদনশীলতা কিংবা উদ্দীপনা ক্রিয়া স্বাভাবিক থাকতে পারে। রোগীকে চিত্ করে শুইয়ে আক্রান্ত পা খাঁড়াভাবে ওপরে তুললে দুই-তিন মিনিটের মধ্যে পাটি ফ্যাকাসে, বিবর্ণ হয়ে যায়। আবার অনুভূমিক রেখার নিচে পা নামালে তা নীল হয়ে যায়। দুই. বিশ্রামকালীন ব্যথার ক্ষেত্রে- ++পায়ের রঙ কালো হতে পারে। ++লোমের অনুপস্থিতি থাকতে পারে। ++মাংসপেশি শুকিয়ে যেতে পারে। ++পায়ের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে তাপ কম থাকে। ++রক্তনালীর স্পন্দন দুর্বল কিংবা তা অনুপস্থিত থাকে। ++রোগীকে চিত্ করে শুইয়ে তার পা ২০ ডিগ্রি উঠালেই তা বিবর্ণ হয়ে যায়। তিন. গ্যাংগ্রিনের ক্ষেত্রে- ++পায়ের আঙুল থেকে পচন শুরু হয়, পা কালো হয়ে যায়। ++আক্রান্ত স্থান শুকিয়ে যায় ও কুঁচকে যায়, মাংসপেশি শুকিয়ে যায়। ++মৃত এবং জীবিত টিস্যুর মধ্যবর্তী স্থানে স্পষ্ট রেখা থাকে। ++লোম খসে পড়ে। ++নখ পড়ে যায় কিংবা নখের পরিবর্তন হয়। ++গ্যাংগ্রিনে আক্রান্ত অংশে রক্তনালীর স্পন্দন অনুপস্থিত থাকে। ++মৃত অংশ অনুভূতিহীন থাকে। ++পা ঠাণ্ডা থাকে। চার. ঘা বা ক্ষতের ক্ষেত্রে- ++গ্যাংগ্রিন এবং ঘা প্রায় একই সময়ে শুরু হয়। যেসব স্থানে চাপ লাগে সেসব স্থানে ঘা থাকে। রোগী ব্যথায় ছটফট করে। চিকিত্সা ব্যবস্থা এর দুই ধরনের চিকিত্সা রয়েছে। একটি সতর্কতামূলক, অপরটি শল্য চিকিত্সা। সতর্কতামূলক চিকিত্সা হলো স্রেফ রোগীকে রোগ সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া। তাতে কাজ না হলে পরে রোগ এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছায় যে অপারেশন বা শল্য চিকিত্সা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সতর্কতামূলক চিকিত্সা ++রোগীকে কড়াকড়ি ধূমপান বর্জন করতে হবে। ++পায়ের পাতা সর্বদা পরিষ্কার ও শুকনো রাখতে হবে। ++পায়ের আঙুলের নখ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং সতর্কভাবে কাটতে হবে। ++সর্বদা নরম এবং ঠিকমতো পায়ে লাগে এমন জুতো পরতে হবে। ++পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, ব্যায়াম করতে হবে। ++ব্যথানাশক এবং রক্তনালীর প্রস্রারণের ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। ++প্রয়োজন হলে নিয়মিত ড্রেসিং করতে হবে এবং কোনো ইনফেকশন থাকলে তার চিকিত্সা করতে হবে। শল্য চিকিত্সা বার্জার’স ডিজিসের রোগীকে রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে শল্য চিকিত্সা প্রদান করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রথম যে অপারেশনটি করা হয় তার নাম ‘লাম্বার সিমপ্যাথেকটমি’। এ ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে আক্রান্ত পা কেটে বাদও দেয়া হয়। সাধারণত পচন শুরু হলে রোগীর পা কেটে ফেলতে হবে। আবার সিমপ্যাথেকটমি করানোর চার থেকে ছয় সপ্তাহ পরও অ্যামপুটেশন বা পা কেটে ফেলা হয়। আক্রান্ত পা কেটে বাদ না দিয়েও বার্জার’স রোগের চিকিত্সা সম্ভব। এ অপারেশনটির নাম ওমেনটো প্লেক্সি। এ ক্ষেত্রে পাকস্থলীর কাছ থেকে ওমেনটাম শিরা বিচ্ছিন্ন করে লম্বা সুতার মতো করে তা ত্বকের ঠিক নিচ দিয়ে পায়ের আঙুল পর্যন্ত টেনে আনতে হয়। ফলে রক্তসঞ্চালনের বাধা দূর হয়। কিন্তু এতে প্রচুর সময় লাগে। এ ছাড়া কিছু জটিলতার কারণে পদ্ধতিটি জনপ্রিয় হয়নি। তবে চিকিত্সকরা যদি রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে ওমেনটো প্লেক্সি শুরু করেন, তাহলে আশা করা যায় অনেক রোগী পঙ্গুত্বের হাত থেকে মুক্তি পাবেন।