সন্ধ্যা নদীর সকালের হাট

আপডেট : ০৫ মে ২০১৯, ১৮:১৩

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

 

নদীর নাম সন্ধ্যা। এটি বাংলাদেশের অপরূপ সুন্দর খরস্রোতা নদীগুলোর একটি। বরিশাল বিভাগের বানারীপাড়া, স্বরূপকাঠি ও কাউখালী উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে এটি। তার মধ্যে বানারীপাড়ায় সন্ধ্যার বুকে সপ্তাহে দু-দিন ভোরে শতশত নৌকা বেসে বেড়ায়। ধান-চাল বিক্রি হয়। নদীর পাড়েই ধান চালের আড়ত। রাইস মিলও কাছে, সেখানে উত্পাদিত চাল আসে এই বাজারে।

আলো ফোটার সাথে সাথে মোল্লা, বেপারি, মৃধা, সরদারদের কর্মতত্পরতায় মুখরিত হয় নদীপাড়। প্রাণচাঞ্চল্যে কমতি থাকে না এতটুকু। দূর-দূরান্ত থেকে বেপারিরা আসেন। ধান বিক্রি করে চাল কিনে নিয়ে যান। জানা যায়, প্রায় ২শ’ বছর ধরে এখানে হাট বসছে। বালাম চালের জন্যও বিখ্যাত এই বাজারটি। সুস্বাদু এই চাল কিছুটা সরু। এটি সবচেয়ে বেশি উত্পাদিত হয় বানারীপাড়ায়।

বালাম ছাড়াও গোদাই, আউশ চাল পাওয়া যায়। মনের দিক থেকে এখানকার চাল অন্যান্য জায়গার চেয়ে উন্নত। ধান থেকে চাল প্রক্রিয়াজাতকরণে নানা ধাপ পেরুতে হয়। এই কাজটি যাঁরা করেন তাঁদের কুটিয়াল বলে। কুটিয়ালরা চাল কিনে নৌকায় ভিজিয়ে রাখে। ভোররাতে তাফালে (বড় চুলা) দিয়ে ডোঙ্গায় (সিদ্ধ করার পাত্র) সিদ্ধ করে পরের দু-তিন রোদে শুকায়। তারপর রাইচ মিলে নিয়ে ভাঙালে সুন্দর ঝরঝরে চাল বের হয়। কিছুদিন আগে প্রায় ২৫ হাজার কুটিয়াল ছিল এই উপজেলায়। তবে এখন নদী ভাঙন, ব্যবসায় মন্দা, আধুনিক মেশিনের কারণে এই পেশায় লোকজনের সংখ্যা কমে গেছে বলে জানা যায়। আগের জৌলুস ভাটা পড়েছে। বানারীপাড়ার শ্রমজীবী মানুষরা কেবল ধান উত্পাদন করেই বসে থাকে না। তাঁরা ধান থেকে চাল ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করে সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে। চালে রঙ দেওয়া, পালিশ করে সুন্দর করা, কাটছাট করা—এসব ব্যাপার এখানে নেই।

বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুরসহ বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা এখানে ধান বিক্রি করতে আসে। পরে তাঁরাই চাল কিনে নিয়ে বাড়ি ফেরে। তাঁদের একজন জামাল উদ্দিন। জানা যায়, তিনি বরগুনা থেকে এক নৌকা ধান নিয়ে  এসেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে ধানের দাম ভালো পেয়ে থাকি। আবার তুলনামূলক কম দামে ভালো চাল কিনতে পারি। দূরত্ব বেশি হওয়া সত্ত্বেও এসব কারণে এখানে আসি।’

বেপারিরা এখানে আসেন বাহারি সব রঙের নৌকা নিয়ে। যদিও যুগের পরিবর্তনে যন্ত্রচালিত নৌযানের আগমন ঘটেছে। মূল হাট বসে শনি ও মঙ্গলবার। আগের দিনের হাটের রেশ ধরে রবি ও বুধবারও হাট বসে। একে বলা হয় গালার হাট। পাইকার, কুটিয়াল, শ্রমিকরা দম ফেলার সুযোগ পায় না। শতশত নৌকায় ধান চাল বিক্রি হয়। ছোট নৌকায় মুড়ির মোয়া বিক্রি করে অনেকে। কাজের ফাঁকে মুড়ির মোয়া খেয়ে শ্রমিকরা পেটের ক্ষুধা মেটানোর সুযোগ পান।

চাল কিনতে এসেছেন জয়নাল মিয়া। তিনি জানান, এখানে ভালোমানের চাল পাওয়া যায়। সারাবছরের খাবারের চাল তিনি কিনেছেন। আগে বানারীপাড়ার ধান-চাল ব্যবসার যে জৌলুস বা রমরমা অবস্থা ছিল তা এখন অনেকটাই ধূসর অতীত। এর মূল কারণ যে সব স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা চাল কিনতে আসতো সেসব স্থানে এখন চাল প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির বদলৌতে এমনটা সম্ভব হয়েছে। কুটিয়ালদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে!