বিশ্বজুড়ে এখন প্রযুক্তি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট পিসির মতো সব মোবাইল ডিভাইস। আর তাতে করে অপারেটিং সিস্টেমগুলোকেও এখন মনোযোগ দিতে হচ্ছে এসব মোবাইল ডিভাইসের দিকেই। মাইক্রোসফটের সর্বশেষ উইন্ডোজ সংস্করণ উইন্ডোজ ৮-এও রয়েছে তার প্রমাণ। উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের সর্বশেষ এই সংস্করণে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট পিসির মতো সব টাচ ডিভাইসকে। অ্যান্ড্রয়েড, আইওএস বা উইন্ডোজের এই নতুন সংস্করণের পাশাপাশি এবারে মোবাইল ডিভাইসের জন্য তৈরি হলো আরেক অপারেটিং সিস্টেম ‘উবুন্টু টাচ’। ডেস্কটপ পিসির জন্য উবুন্টু রয়েছে অনেক আগে থেকেই। উন্মুক্ত এই অপারেটিং সিস্টেমের রয়েছে নিজস্ব বাজার। সময়ের সাথে তালমিলিয়ে চলতে গিয়ে এবারে মোবাইল ডিভাইসের জন্যও উবুন্টুর সংস্করণ তৈরি হয়েছে। সমপ্রতি স্পেনের বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে উবুন্টুর এই টাচ সংস্করণটি অবমুক্ত করা হয়। গুগল’র জনপ্রিয় নেক্সাস ডিভাইসে প্রথমবারের মতো প্রদর্শিত হয়েছে এই উবুন্টু টাচ।
উবুন্টু নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ক্যানোনিক্যালের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক শাটলওয়ার্থ মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে এই উবুন্টু মোবাইল সংস্করণটি অবমুক্ত করেন। সেখানেই প্রযুক্তি বিষয়ক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট জেডনেট-এর পক্ষ থেকে একটি সাক্ষাত্কার নেওয়া হয় শাটলওয়ার্থের। উবুন্টুর বর্তমান অবস্থান এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে এই সাক্ষাত্কারে নিজের মন্তব্য তুলে ধরেন শাটলওয়ার্থ। প্রযুক্তি বিশ্বের এই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের সাক্ষাত্কারটি ছাপা হলো ‘তথ্যপ্রযুক্তি’ পাতার পাঠকদের জন্য।
প্রশ্ন: মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস শুরু হওয়ার আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের ডিভাইসের জন্য উবুন্টুর কৌশল নিয়ে অনেক আলোচনা হয়ে আসছে। এই বিষয়ে আরও ঘোষণা আসবে কি?
শাটলওয়ার্থ: এইটা আমাদের জন্য খুব বড় একটি খবর। সিলিকননির্ভর একটি প্রতিষ্ঠানকে আমরা আমাদের পার্টনার হিসেবে পেয়েছি। এই প্রদর্শনীর শেষে সে সম্পর্কে আমরা জানাব। তবে এটুকু বলতে পারি, মোবাইল ডিভাইসে তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রেখেছে। তাদের নিয়ে আমরা অত্যন্ত আশাবাদী।
প্রশ্ন: দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পর অবশেষে মোবাইল ডিভাইসে প্রবেশ করেছে উবুন্টু। মোবাইল ডিভাইসে প্রবেশের পেছনে কোন বিষয়গুলো কাজ করেছে?
শাটলওয়ার্থ: প্রায় চার বছর আগে আমরা আমাদের পরিকল্পনাটি সাজিয়েছিলাম ফোন, ট্যাবলেট পিসি এবং টিভির জন্য। তখনই একটি ডিজাইন টিম গঠন করা হয় এই চ্যালেঞ্জ উত্তরণের জন্য। তারা সফলভাবেই সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে এবং এর ফলাফলটিও অত্যন্ত চমত্কার। মাস দেড়েক আগে আমরা যা প্রদর্শন করেছি এবং এরও আগে পিসির জন্য আমাদের যে সকল প্রচেষ্টা ছিল, তার মধ্যেকার একটি সেতুবন্ধন বলা যায় এবারের সংস্করণকে। এক অর্থে বলা যায়, আমরা সকলের সামনে উপস্থিত থেকেও অনেককিছুই গোপন রেখেছি। ২০০৯ সালে বা তারপরে যতগুলো ডিস্ট্রিবিউশন বের হয়েছে, তার অনেককিছুকেই টাচ এই সংস্করণে সমন্বিতভাবে দেখা যাবে।
প্রশ্ন: উবুন্টুর সংস্করণগুলো দেখে মনে হয়, উবুন্টুর প্রতিটি সংস্করণই অন্য সংস্করণের সাথে সম্পর্কযুক্ত; যেমন ট্যাবলেট এবং স্মার্টফোন সংস্করণ। সে ক্ষেত্রে আপনার কি মনে হয়, বিক্রেতারা উবুন্টু স্মার্টফোনের সাথে বান্ডল হিসেবেই উবুন্টু ট্যাবলেট জুড়ে দিবে?
শাটলওয়ার্থ: উবুন্টুর একটি সংস্করণের চিন্তাটি এমন ছিল, স্মার্টফোনের চলাকালে একে বড় একটি ডিসপ্লেতে সংযুক্ত করলে এটি পরিণত হবে ট্যাবলেট পিসিতে। আবার আনডক করলেই সেটি স্মার্টফোন হয়ে যাবে। অর্থাত্, এটি মূলত একটিই ডিভাইস।
প্রশ্ন: এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ে আপনাদের চিন্তাভাবনা কী?
শাটলওয়ার্থ: এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ে যারা কাজ করেন, তাদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কিছু ফিচার রয়েছে আমাদের। আমরা পূর্ণাঙ্গ ডিস্ক এনক্রিপশন সুবিধা প্রদান করব এবং প্রতিটি গ্রাহকের সেশনগুলোর জন্যও আলাদা এনক্রিপশন থাকবে। এটা এমনভাবে করা হবে যাতে এগুলো একটি অ্যাকটিভ ডিরেক্টরিতে যুক্ত হয়। এর ফলে উবুন্টুই প্রথম সম্পূর্ণ নিরাপদ একটি ট্যাবলেট পিসি প্রদানে সক্ষম হচ্ছে, যেগুলোকে সামরিক বাহিনী, চিকিত্সা ক্ষেত্র, আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে ব্যবহার করা যায়।
প্রশ্ন: আপনারা কি সবার অলক্ষেই উবুন্টুকে এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ে খুব দ্রুত উপরে উঠতে দেখতে চান? নাকি কোনো একটি কোম্পানি উবুন্টু ডিভাইসকে সর্বসাধারণের নিকটে নিয়ে আসবে বলে মনে করেন?
শাটলওয়ার্থ: এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ে উবুন্টুকে পছন্দ করার অনেক কারণই রয়েছে। বিশেষত অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে ম্যালওয়্যার একটি বড় সমস্যা, যার সমাধান হতে পারে উবুন্টু। আবার গ্রাহকরা যাতে উবুন্টু পছন্দ করে, তার সব উপকরণই যুক্ত রয়েছে এতে। ফলে গ্রাহকদের কাছেও এটি সমান গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলেই ধারণা আমাদের।
প্রশ্ন: আপনি চান না, এমন কোন জিনিসগুলোকে ছেড়ে দিতে হবে উবুন্টু থেকে কিংবা পুরোনো কোন ফিচারগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে?
শাটলওয়ার্থ: এটা খুবই চমত্কার একটি প্রশ্ন। আসলে আমরা প্রতি মুহূর্তেই নতুন নতুন অনেক আইডিয়া পাচ্ছি। আর ভালো ভালো অনেক আইডিয়াকেই বাতিল করে দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে অনেকগুলোই রয়েছে ডিজাইন সম্পর্কিত। আসলে অনেক বিষয়ের দিকে লক্ষ রেখে প্রতিটি আইডিয়াকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সাজাতে হয়। এরপর একেকটি প্ল্যাটফর্মের জন্য সেগুলোকে নির্বাচিত বা বাতিল করা হয়।
প্রশ্ন: তাহলে কবে নাগাদ আমরা উবুন্টু ট্যাবলেট বা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারব?
শাটলওয়ার্থ: আশা করছি সামনের বছর (২০১৪) জানুয়ারিতে স্মার্টফোন আর এপ্রিলে ট্যাবলেট পিসির পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ বাজারে চলে আসবে। এখন পর্যন্ত যে সংস্করণটি আমরা অবমুক্ত করেছি, তা মূলতই ডেভেলপারদের জন্য। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাধারণের ব্যবহারের জন্যও পরীক্ষামূলক সংস্করণ বাজারে এসবে।
প্রশ্ন: এখনও পর্যন্ত কী পরিমাণ উবুন্টু টাচ ডাউনলোড হয়েছে বলে তথ্য রয়েছে আপনাদের কাছে?
শাটলওয়ার্থ: এটি অবমুক্ত ঘোষণার প্রথম ৬ ঘণ্টাতে প্রায় ৭৫ হাজার ডাউনলোড হয়েছে। এটি নি:সন্দেহে আশবাদী হওয়ার মতো তথ্য।
প্রশ্ন: শেষ কোনো কথা।
শাটলওয়ার্থ: আমাদের আসলে আরও অনেক পথ পেরোতে হবে। তবে আমরা আমাদের চলার পথে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানকে পেয়েছি, যারা আমাদের অনুপ্রেরণা হিসেবেই কাজ করছেন। ডেস্কটপ পিসিতে লিনাক্সের যে অবদান রয়েছে, মোবাইল ডিভাইসে তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ এখন আমাদের সামনে। প্রযুক্তি গবেষক বা বিশ্লেষকদের অনেকেই ট্যাবলেট পিসির জন্য উবুন্টুকে উইন্ডোজ ৮-এর চাইতেও ভালো বলে অভিহিত করছেন। তাদের প্রত্যাশা পূরণেই কাজ করে যাচ্ছি আমরা।
