নিজেকে সারিয়ে তুলবে যে চিপ

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৩, ২১:৩১
প্রযুক্তির অগ্রগতি এখন এমন একটি পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, যেখানে কল্পনা আর কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং প্রযুক্তির কল্যাণে এখন অনেক কল্পনাই পরিণত হয়েছে বাস্তবে। নতুন নতুন কম্পিউটিং ডিভাইসের সাথে সাথে প্রসেসিং চিপেও আসছে পরিবর্তন। ঠিক এরকমই নতুন এক ধরনের চিপ উদ্ভাবন করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (ক্যালটেক)-এর গবেষকরা। এই চিপের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কোনো কারণে এই চিপ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা নিজে নিজেই নিজেকে সারিয়ে তুলতে পারবে। অর্থাত্, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এই চিপ নিজের যেকোনো ক্ষতিকে কাটিয়ে উঠে পূর্ণ কর্মক্ষম হয়ে উঠবে নিজে নিজেই, কারও সাহায্য ছাড়াই। মানব শরীরের কথা আমরা অনেকেই জানি। জীব জগতের অনেক জীবই রয়েছে, যাদের শরীরে কোনো ধরনের ক্ষতি হলে শরীর নিজেই তা সারিয়ে তুলতে সক্ষম। এই ঘটনা কোনো যন্ত্রের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়। এমন কোনো যন্ত্র নেই, যা নিজের ক্ষতিকে সারিয়ে উঠতে পারে। ক্যালটেক-এর গবেষকদের উদ্ভাবনের পর অবশ্য উপরের কথাগুলো কিছুটা বদলে যাবে। বলতে হবে এতদিন পর্যন্ত এমন কোনো যন্ত্র ছিল না। সেই ছিল না-কে বদলে দিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন এক ধরনের চিপ, যা নিজেই নিজেকে সারিয়ে তুলতে পারবে। একটি মুদ্রার আকারের মধ্যেই ৭৬টি পর্যন্ত চিপকে বসানো যাবে। আর এর মধ্যেই প্রতিটি চিপে নিজেদের সারিয়ে তুলতে যেসব উপাদান লাগবে, তার সবই থাকবে। ক্যালটেকের প্রকৌশল ও ফলিত বিজ্ঞান বিভাগের হাই-স্পিড ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ল্যাবরেটরিজের সদস্যদের নিয়ে তৈরি একটি দল। এই চিপ উদ্ভাবন করেছে। এই দলের কাছে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, এই চিপ উদ্ভাবনের একটি পর্যায়ে গবেষকরা লেজারের সাহায্যে চিপকে একাধিকবার নষ্ট করে ফেলে। পুড়ে নষ্ট হয়ে গিয়ে এই চিপগুলো তাদের কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তবে অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া এই চিপগুলো নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। এটাকে একটি বিরাট অর্জন হিসেবেই অভিহিত করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা। এ প্রসঙ্গে ক্যালটেকের থমাস জি. মেয়ার অধ্যাপক আলি হাজিমিরি বলেন, ‘প্রথমবার যখন একটি নষ্ট চিপকে নিজে নিজেই নিজেকে সারিয়ে তুলতে দেখলাম, সেটি ছিল এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা। আমাদের মনে হচ্ছিল, আমরা যেন এক নতুন যুগের বিবর্তন প্রত্যক্ষ করছি। আর এই বিবর্তন হচ্ছে ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটের দ্বিতীয় ধাপের বিবর্তন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আক্ষরিক অর্থেই চিপের প্রায় অর্ধেক অ্যামপ্লিফায়ারকে পুড়িয়ে ফেলেছিলাম এবং ট্রানজিস্টরসহ অনেকগুলো উপাদানকেই বাষ্পীভূত করেছিলাম। কিন্তু অবাক হওয়ার মতোই বিষয়, এটি নিজে নিজেই এমনভাবে নিজেকে সারিয়ে তুলতে সক্ষম হয়, যাতে মনে হচ্ছিল এটি এর আদর্শ কর্মক্ষম রূপটি ফিরে পেয়েছে।’ ক্যালটেকের গবেষকদের এই উদ্ভাবনকে গোটা বিশ্বের জন্যই এক বিশাল অর্জন বলেই মন্তব্য করছেন বিভিন্ন প্রান্তের প্রযুক্তি গবেষকরা। এর অন্যতম মূল কারণ হচ্ছে, এখন পর্যন্ত যেসব চিপ তৈরি হয়েছে, তার কোনো একটি উপাদানে সামান্যতম সমস্যা থাকলেও সেই চিপকে বাতিল বলে গণ্য করতে হয়। গোটা চিপকে বদলে ফেলা ছাড়া আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো উপায় থাকে না। ফলে এটি প্রযুক্তি বিশ্বে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম হবে বলেই অভিমত বিজ্ঞানীদের। এ প্রসঙ্গে আলি হাজিমিরি বলেন, ‘ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটে এরকম প্রতিরোধ ব্যবস্থা সংযুক্ত করার সুবিধা, যার মাধ্যমে সে নিজের সমস্যা নিজেই সমাধান করতে সক্ষম, বিশ্বের সামনে এক অসীম সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে। সার্কিটগুলোকে আমরা যেভাবে দেখি এবং সেগুলো যেভাবে কাজ করে, তাতে এক বড় পরিবর্তন হবে এই ধারণাটি। তারা এখন মানুষের সহায়তা ছাড়াই নিজেদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারবে এবং সেগুলোর সমাধানও নিজেরাই করতে পারবে। এর ফলে সার্কিটগুলো নষ্ট করা এক রকম অসম্ভব কাজে পরিণত হবে।’ আলি হাজিমিরির সাথে এই প্রকল্পে আরও কাজ করেছেন প্রিন্সটনের সহকারী অধ্যাপক কৌশিক সেনগুপ্ত। এই দুজনে মিলেই গত বছরে লিখে ফেলেন ‘ইন্টিগ্রেটেড সেল্ফ-হিলিং ফর মিলিমিটার-ওয়েভ পাওয়ার অ্যামপ্লিফায়ার’ শীর্ষক একটি পেপার। এই পেপারটি আবার আইট্রিপলই’র ২০১২ সালের অন্যতম সেরা গবেষণা কাজের স্বীকৃতি পেয়েছে।