(পূর্ব প্রকাশের পর)
শুধু তাই নয়, প্রয়োজনীয় দলিল, বিয়ে শাদীর কাবিন ইত্যাদি সমস্ত কিছু লেখার আগে আল্লাহর নাম লিখতো। তারা লিখতো বেসেমকা আল্লাহুম্মা, অর্থাত্ তোমার নাম নিয়ে (আরম্ভ করছি) হে আল্লাহ। আরবের মোশরেকরা আল্লাহর বিশ্বাসী ছিল এ কথায় সাক্ষ্য স্বয়ং আল্লাহ। কুরআনে তিনি তাঁর রসূলকে বলছেন- তুমি যদি তাদের (আরবের মোশরেক, কাফের অধিবাসীদের) জিজ্ঞাসা করো, আসমান ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন? তবে তারা অবশ্যই জবাব দেবে- সেই সর্বশক্তিমান, মহাজ্ঞানী (আল্লাহ) (সূরা যুখরুফ- ৯)। এমন আয়াত আরও আছে। ইতিহাস ও আল্লাহর সাক্ষ্য, দু’টো থেকেই দেখা যায় যে, মোশরেকদের মধ্যে আল্লাহর রসূল প্রেরিত হলেন তারা আল্লাহকে গভীরভাবে বিশ্বাস করতো অর্থাত্ আল্লাহর ওপর তাদের ঈমান ছিল। তারা হাবল, লা’ত, মানাতের পূজা করতো ঠিকই কিন্তু ওগুলোকে তারা আল্লাহ বলে বিশ্বাস করতো না, ওগুলোকে স্রষ্টা বলেও মানতো না। তারা বিশ্বাস করতো যে হাবল, লা’ত, মানাত, ওজ্জা এরা দেব-দেবী, যারা ওগুলোকে মানবে, পূজা করবে তাদের জন্য ঐ দেব-দেবীরা সেই আল্লাহর কাছেই সুপারিশ করবে (কুরআন- সূরা ইউনুস- ১৮, সূরা যুমার ৩)। সুতরাং তারা আল্লাহ বিশ্বাস করত, হজ্ব, রোজা করত, খাতনা করতো, অর্থাত্ ঠিক আজকে মোসলেম নামক এই জাতি যে অবস্থায় আছে তাদের চাইতে কোন অংশে কম নয়। এরাও আল্লাহ বিশ্বাস করে, নবী বিশ্বাস করে, হজ্ব করে, কুরবানী করে, খাতনা করে। মক্কার এই লোক গুলো ব্যক্তি জীবনে এত কিছু করার পরও তাদেরকে আল্লাহ, কাফের মোশরেক বললেন কেন? কারণ তারা আল্লাহর তাওহীদ মানতো না, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মানতো না, তাদের জাতীয়, সমষ্টিগত জীবন পরিচালিত করত নিজেদের সমাজপতিদের তৈরি করা আইন বিধান দ্বারা। নবী করিম (স.) প্রচণ্ড বাধা স্বত্বেও, বিরোধিতা স্বত্বেও নিরবচ্ছিন্ন ভাবে তিনি কালেমার বালাগ চালিয়ে গেলেন। তাঁর নবুয়্যতের ২৩ বত্সরের ১৩ বছরই কেটেছে মক্কায়। এই ১৩ বছর তিনি আর অন্য কোন কিছুর দিকে আহ্বান করেন নি। তিনি বলেন নি যে, তোমাদের হজ্ব হয় না, হজ্ব ঠিক করে নাও, নামাজ হয় না নামাজ ঠিক করে নাও, কুরবানী হয় না ইত্যাদি ঠিক করে নাও। এমন কি সমাজে তাঁর চোখের সামনে যে অবিচার হতো তিনি সেগুলোরও কোন প্রতিবাদ করেন নি। শুধু মাত্র নিরবচ্ছিন্ন্নভাবে তাওহীদের ডাক দিয়ে গেছেন, কারণ তিনি জানতেন তওহীদ অর্থাত্ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা হলে সমাজ থেকে সর্বরকম অন্যায়, অবিচার অর্থাত্ অশান্তি দূর হয়ে যাবে। এই সময় তার ওপর যে অত্যাচার হয়েছিল সে সম্বন্ধে সবাই অবগত আছেন। তাঁকে বার বার মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখা হয়েছে, পিঠে উটের নাড়ি ভুড়ি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে, কবি, যাদুকর, গণক, জ্বীন, ভূতে আসরগ্রস্থ, উন্মাদ ইত্যাদি বলে অপবাদ দেওয়া হয়েছে। যারা তাকে রসূল হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে তাওহীদের ওপর ঈমান এনে তার অনুসারী হয়েছেন তাদের ওপর নির্মম, নিষ্ঠুর, নির্যাতন চালানো হয়েছে, অনেককে হত্যা করা হয়। সুমাইয়া (রা.) নামক একজন ক্রীতদাস নারীকে আবু জাহেল বল্লমের আঘাতে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে উত্তপ্ত মরুপ্রান্তরে হত্যা করে। তার স্বামী ইয়াসিরকে (রা.) দুই পায়ে রশি বেধে দুই দিকে দুইটি উট ছুটিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলা হয়। কৃতদাস খাব্বাব, বেলালের (রা.) নির্যাতনের ঘটনা সবারই জানা। মোশরেকদের এই কঠিন নির্যাতনের মুখে প্রায় সকলের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে পড়ে। এত কুরবানী, এত নির্যাতন সহ্য করার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মানবজাতিকে এমন একটি জীবনব্যবস্থার অধীনে আনয়ন করা যাতে মানুষ পৃথিবীতে এবং পরকালে শান্তিলাভ করে। শান্তিময় ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের জন্য সর্ব প্রথম যে জিনিসটি প্রয়োজন তা হচ্ছে জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা। অর্থনৈতিক সুবিচার, তারপর ক্রমান্বয়ে আসে রাজনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি সুবিচার। এই প্রথমটি অর্থাত্ নিরাপত্তা সম্পর্কে স্রষ্টা আল্লাহর দেওয়া জীবনবিধানে যতটা গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে তা বোঝার জন্য একটি ঘটনা গভীরভাবে বিবেচ্য। ঘটনাটি এই— এই রকম কঠিন নির্যাতন চলাকালীন মানবজীবনের জন্য স্রষ্টার দেওয়া জীবনবিধান বহনকারী শেষ রসূল মুহাম্মদ (স.) কা’বা শরীফের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। হঠাত্ একজন সহচর (সাহাবা) বললেন, হে আল্লাহর রসূল! এই অত্যাচার নিপীড়ন আর সহ্য হচ্ছে না। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন আমাদের বিরোধীরা সব যেন ধ্বংস হয়ে যায়। কথাটাকে আল্লাহর রসূল কতখানি গুরুত্ব দিলেন তা বোঝা যায় এই থেকে যে, তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং ঐ সাহাবাকে বললেন, তুমি কী বললে? সাহাবা তার কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। শুনে আল্লাহর রসূল তাকে বললেন, ‘শোন, শীঘ্রই সময় আসছে যখন কোন যুবতী মেয়ে গায়ে গহনা পরে একা সা’না থেকে হাজরামাউত যাবে। তার মনে এক আল্লাহ এবং বন্য জন্তু ছাড়া আর কোন ভয় থাকবে না (হাদীস: খাব্বাব (রা.) থেকে বোখারী ও মেশকাত)।’ (চলবে)
