বাংলাদেশে অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসা ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে ব্যবহারকারীদের কাছে। মানুষ ক্রমেই অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় তো করছেই এখন জীবন সঙ্গী খুঁজে নিতেও অনলাইনের উপর নির্ভর হচ্ছে অনেকে। জীবন সঙ্গী খুঁজে নিতে সহায়তাকারী একটি প্রতিষ্ঠান হলো বিবাহ বিডি ডটকম। সমপ্রতি প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় ১২ বছর অতিক্রম করেছে। এ উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটি নতুন বেশ কয়েকটি সেবা নিয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেছে। এ বিষয়ে সমপ্রতি দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সিইও জি এম ফ্রেজারের কথা হয় । সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মাহবুব শরীফ
বিবাহ বিডি মূলত একটি সামাজিক সেবা প্রতিষ্ঠান। অনেকেই মনে করেন যে, বিবাহ বিডি মনে হয় ঘটকের কাজ করে। ধারণাটা আসলে সম্পূর্ণ ভুল। আসলে বিবাহ বিডি হলো বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশি পাত্র-পাত্রী খোঁজার একটি ডাটাবেইজ অ্যাপ্লিকেশন। এই ওয়েব সাইট বা অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে একজন পাত্র-পাত্রী বা তাদের অভিভাবকগণ ঘরে বসেই অনলাইনে তাদের পছন্দের প্রফেশন, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা তাদের নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী বিবাহ বিডির ডাটাবেইজের অসংখ্য প্রোফাইল থেকে পছন্দের প্রোফাইলগুলো বেছে নিয়ে নিজেরাই সরাসরি একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন। আমরা নিজে থেকে কোনো ইউজারকে খুঁজে ম্যাচ ম্যাকিং করে দিই না, এমন দুপক্ষের কোনোরকম ভূমিকাতেই আমরা জড়িত থাকি না। পুরো সার্ভিসটাই হলো সেলফ সার্ভিস।
২০০৯ সালের ১৪ এপ্রিল (পহেলা বৈশাখ) বিবাহ বিডি ডটকম আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। যারা উচ্চ শিক্ষিত, বিবাহযোগ্য, ইন্টারনেট চালাতে সক্ষম তাদের নিয়েই মূলত এই সাইটি কাজ করে। দেশে প্রথম এই ধরনের আইডিয়া নিয়ে কাজ শুরু করে বিবাহ বিডি ডটকম।
অনলাইন ভিত্তিক এই সাইটি যে বিষয়ে কাজ করে সে সম্পর্কে জি এম ফ্রেজার বলেন, ‘উচ্চ শিক্ষা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হবার পরও যদি আপনি বা আপনার পরিবারের কোনো সদস্য উপযুক্ত সঙ্গীর সন্ধান না পান তখন আমরা আমাদের সাইট বিবাহ বিডি ডটকমের মাধ্যমে আপনাদেরকে সহায়তা করি। এ জন্য আপনাকে কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।’
গত মাসে বিবাহ বিডি ডটকম-এর ১১ বছর পূর্তি হলো। সফলভাবে দীর্ঘ পথ চলায় যারা আপনাদের সঙ্গে ছিলেন তাদের জন্য আপনারা কোনো সুখবর এনেছেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে জি এম ফ্রেজার বলেন, ‘বিবাহ বিডি ডটকমকে গ্রাহকরা যেভাবে গ্রহণ করেছে তাতে আমরা অত্যন্ত খুশি। গ্রাহকদের অনুপ্রেরণায় আমরা ১১ বছরের লম্বা সময় অতিক্রম করতে পেরেছি। যারা আমাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন এবং আমাদের পথ চলার সঙ্গী হিসেবে ছিলেন তাদের জন্য বিবাহ বিডি ডটকম নতুন কয়েকটি সেবা উপহার দিতে চলেছে। গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা জেলাভিত্তিক বিবাহ বিডি ডটকম-এর অফিস চালু করা। আমরা তাদের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে জেলা ভিত্তিক এজেন্ট নিয়োগ দিতে শুরু করেছি। এতে করে গ্রাহকরা জেলা ভিত্তিক অফিসগুলোতে ভিজিট করতে পারবেন। এছাড়াও জেলা পর্যায়ে অফিস কার্যক্রম চলমান হলে গ্রাহকদের আস্থা আরো বৃদ্ধি পাবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘চলতি বছরের আগস্ট মাসে আমাদের ওয়েব সাইট আরো উন্নত করা হবে। এতে আরো নতুন নতুন বেশ কয়েকটি সার্চ ক্যাটাগরি যুক্ত হবে।’
ওয়েব সাইটের উন্নত সংস্করণের পাশাপাশি নতুন কোনো ক্যাটাগরি যুক্ত হতে চলেছে আপনাদের কার্যক্রমে? এমন প্রশ্নের জবাবে জি এম ফ্রেজার বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা কয়েটি সেবা চলুও করে দিয়েছি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি নতুন সেবা ব্যবস্থা। অনেক সময় দেখা যায়, অনেকেই ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন অথবা নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কিন্তু সে কোনো না কোনোভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী।
হয়তো সে কানে কম শোনেন, চোখে কম দেখে, শ্বেতী রোগী, তোতলামিজনিত সমস্যা, কিংবা এক্সিডেন্টে শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় ভুগছেন। যারা এমন তাদের জন্য আমাদের সেবাটি সুন্দরভাবে কাজ করে। সমপ্রতি আমরা এমন সেবা চালু করেছি। ইতিমধ্যে এমন গ্রাহক সংখ্যা পেয়েছি ৬ শতাধিক।’
‘সিঙ্গেল মাদার ও সিঙ্গেল ফাদার’ নামে আমাদের আরো দুইটি সেবা চলমান রয়েছে। এদের বৈশিষ্ট্য হলো- তারা হয়তো বিধবা কিংবা বিবাহ বিচ্ছেদ করেছে কিন্তু তাদের সন্তান রয়েছে। তাদের জন্য আমাদের নতুন সেবা চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে সিঙ্গেল মাদার ক্যাটাগরিতে পাঁচ শতাধিক ও সিঙ্গেল ফাদার ক্যাটাগরিতে আট শতাধিক অ্যাকাউন্ট নিবন্ধিত হয়েছে।’ বলছিলেন জি এম ফ্রেজার।
তিনি আরো বলেন,‘২০১৯ সালের ৩১ মার্চ আমরা ব্যবহারকারীদের উপর একটি জরিপ চালিয়েছিলাম। এতে ২৮ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছে তারা আমাদের সার্ভিসে অনেক খুশি। ৪০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছে, তারা আমাদের সার্ভিসে খুশি। ২৩ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছে, তারা আমাদের সেবায় মোটামুটি খুশি এবং ৯ শতাংশ জানিয়েছে, তারা আমাদের সেবায় খুশি না। এই ধরনের জরিপের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে আমরা পরবর্তী বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকি। যারা খুশি, তারা কি কারণে খুশি এবং যারা অখুশি তারা কি কারণে অখুশি তা সনাক্ত করে তা সমাধান করার চেষ্ট করে থাকি। ’
আমরা শুধু প্রত্যেকটা প্রোফাইল ভেরিফিকেশনের দায়িত্ব নিচ্ছি, কারো কোনো তথ্যে সন্দেহ থাকলে রিলেটেড পেপার চাচ্ছি। মূলত বিবাহ বিডিতে যে কেউ চাইলেই প্রোফাইল খুলে মেম্বার হতে পারেন। যতক্ষণ আমাদের ইউজার সাপোর্ট টিম যাচাই-বাছাই করে একজন নতুন ইউজারকে আমাদের ওয়েব সাইট ব্যবহারের অনুমোদন দিয়ে থাকে। যেমন ধরুন- যে প্রার্থী রেজিস্ট্রেশন করেছে তার প্রদত্ত তথ্যগুলো সঠিক কিনা, ইমেইল আইডিটি সচল কি না, ছবিটি আসল কি-না এবং পরিশেষে প্রার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে শতভাগ নিশ্চিত হলেই তবেই ঐ ইউজারকে বিবাহ বিডিতে লগ-ইন করার সুযোগ দেয়া হয়। এখানে ভুয়া আইডি খুলে সার্ভিস নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমনটিই জানিয়েছেন জিএম ফ্রেজার। বিবাহ বিডি তো একটি ভিন্নধর্মী সেবা ব্যবসা বা অনলাইন ম্যাট্রিমনিয়াল সাইট। এ পর্যন্ত আপনারা কি ধরনের প্রতিবন্ধকতার স্বীকার হয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ আমার ভাষায় আমি বলবো- আমাদের দেশে অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন প্রয়োজনীয় গবেষণা বা ডাটার অভাব রয়েছে। এর মধ্যে দেশের মোট কতো শতাংশ ইউজার এই মুহূর্তে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, কত শতাংশ প্রত্যহ ইন্টারনেট ব্যবহারে অভ্যস্ত, কি পরিমাণ ইউজার ট্রাফিক দেশের প্রতিদিন বাইরে থেকে আসছে, কোন্ কোন্ দেশ ও শহর থেকে আসছে তার সুনির্দিষ্ট অথবা গড় কোনো বিশ্বাসযোগ্য ডাটা আমাদের কাছে নেই।
যার কারণে আমরা বুঝতে পারছি না আমাদের দেশের ভিতরে ও আন্তর্জাতিক মার্কেট ইউজার গ্রুপটি কতটুকু বিস্তৃত এবং কিভাবে স্বল্প ব্যয়ে আমরা আমাদের টার্গেট ইউজারদের কাছে পৌঁছাতে পারবো। তাছাড়া বাংলাদেশের যেসব ওয়েব সাইটের ইউজার ট্রাফিক বেশি সে সকল সাইটে বিজ্ঞাপন মূল্য বেপরোয়া, বিজ্ঞাপন মূল্যের বিপরীতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয় না। ফলে তারা ডলারে বিনিময়ে দেশের মানুষের কাছে পৌঁছাতে বিদেশি সাইটগুলোতে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। আর যার ফলে উদ্যোক্তাদের জন্য এমন সামঞ্জস্য পরিবেশে টিকে থাকা সত্যি দুরূহ ব্যাপার। আরো একটি বড় ব্যাপার হলো ই-কমার্স (অনলাইনে সেবা বা পণ্য বিক্রি) ব্যবসায় কোনো ব্যাংক অর্থায়ন বা বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে না। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সুবিধা একেবারেই অপ্রতুল। ব্যাংকগুলো যদি সহজশর্তে আমাদের দিকে এগিয়ে আসে, তাহলে এই খাত দ্রুত একটি শক্ত অবস্থানে যেতে পারবে।’
