ধূমপানে আয়ু কমে

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৩, ১৮:৫৯
অধ্যাপক ডা.অরূপ রতন চৌধুরী বিভাগীয় প্রধান, ডেন্টেষ্ট্রি বিভাগ বারডেম, ইব্রাহীম মেডিকেল কলেজ চেম্বার:১৫/এ গ্রীণ রোড, ঢাকা কবিগুরু রবীন্দ্র নাথের ‘আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান’ গানের মতই, যারা খারাপ নেশা করে তাদের অধিকাংশই জানে আসক্তির নেশা জীবন নষ্ট করে তারপরও তারা ঐ নেশার মধ্যে থাকতে চায়। মানুষ কি শুধু দুঃখ-পরাজয়-হতাশায় দুর্বিসহ যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাবার জন্যই নেশা করে, নাকি মজা পাওয়ার জন্য? ‘এক ছিলিমে যেমন তেমন দুই ছিলিমে মজা, তিন ছিলিমে উজির-নাজির, চার ছিলিমে রাজা’ এই ধরনের ছড়া তো সমাজে চালু আছে সেই আদি যুগ থেকে। সুতরাং এই নেশার আসক্তির পরিনাম এই কবিতায় বুঝানো হয়েছে। সমপ্রতি একটি গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের জীবনের আয়ুকাল বা অপমৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ধূমপান, রেড মিট ভক্ষণ, অতিরিক্ত সময় বসে কাটানো এবং অতিরিক্ত পরিমাণে মদ্য পান। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন গবেষণাই এসব বদঅভ্যাস গুলোর প্রতিদিনের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণগুলো হিসেব করে নাই। একজন বৃটিশ পরিসংখ্যানবিদ ডেভিড স্পাইগেল হলটার সমপ্রতি বৃটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন কোন কোন বদঅভ্যাস মানুষের জীবনের আয়ু কমাতে সাহায্য করে? এটা কি অতিরিক্ত মদ্য পান নাকি বসে বসে অতিবাহিত করা জীবন যাত্রার অভ্যাস? কোনটা বেশী দায়ী? এটা নিরুপন করতে গিয়ে তিনি একটি পরিমাপ করার সুত্র আবিস্কার করলেন যার নাম দিলেন ‘মাহক্রলাইফ’ যেটার পরিমাপ হলো ৩০ মিনিটের আয়ুসড়াল। অন্যান্য গবেষণায় সাথে এই পরিমাপ করতে গিয়ে তিনি দেখতে পেলেন যে, যারা নিয়মিত অতিরিক্ত ধূমপান করেন তারা প্রতিদিন জীবন থেকে ৫ ঘন্টা সময়কাল হারিয়ে ফেলেছেন, যারা প্রতিদিন বসে বসে অন্তত: ২ ঘন্টা সময় টেলিভিশন দেখেন তারা জীবন থেকে প্রতিদিন ৩০ মিনিট আয়ু কমিয়ে ফেলছেন। স্পাইগেল হলটার উল্লেখ করেন যে, আমি মানুষের জীবনব্যাপী বদঅভ্যাস গুলোর সাথে স্বাস্থ্যের ক্রমাগত অবনতির বিষয়টি স্বাভাবিক জীবন যাত্রা প্রণালীর সাথে তুলনামূলক পরিমাপ করার চেষ্টা করেছি। গবেষণায় তিনি আরও দেখিয়েছেন যে, প্রতিদিন দু’কাপ কফি পান একটি বার্গার গ্রহণ এর ক্ষতিকে পুষিয়ে দিতে পারে। তিনি বলেছেন মানুষ যখন এই ধরনের আয়ু কমে যাওয়ার কথা শুনে তখন ভাবে তারা হয়ত জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই আয়ুকাল কমতে থাকে। তিনি মনে করেন তাদের বরং ভাবা উচিত যে তারা বুড়িয়ে যাবেন এবং ধূমপানের কারণে একজন ফুসফুসের ক্যান্সারে তাড়াতাড়ি আক্রান্ত হয়ে অধূমপায়ীদের তুলনায় বেশি তাড়াতাড়ি মৃত্যুর মুখে পতিত হবেন। গবেষক আরও বলেছেন, যদি আপনি একজন ধূমপায়ী হন তবে আপনি মৃত্যুর দিকে ক্রমেই ঢলে পড়ছেন এবং আপনি হয়ত প্রতিদিন ২৪ ঘন্টার চাইতে ২৯ ঘন্টা অতিবাহিত করছেন। এখানে কয়েকটি বদঅভ্যাসের কারণে মানুষের যে আয়ু্কাল কমতে থাকে তার নমুনা দেয়া হলো, স্পাইগেলহলটার তার একটি নিবন্ধে বিভিন্ন গবেষণায় আয়ুকাল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে দেখিয়েছেন- ১. প্রতিদিন ১৫ থেকে ২৫টি সিগারেট ধূমপানের কারণে ৫ ঘন্টা আয়ূ কমে। ২. মদ্যপানকারীদের প্রতিদিন প্রথম পানাহারে ৩০ মিঃ এবং পরবর্তীতে প্রতি মদ্যপানে ১৫ মিঃ করে আয়ু কমে। ৩. যারা বসে বসে অলস জীবন যাপন করেন এবং সেই সাথে ঘরে বসে প্রতিদিন ২ ঘন্টার অধিক টিভি দেখেন তাদের প্রতিদিন আয়ু কমে ৩০ মিঃ। ৪. যারা প্রতিদিন ৩ আউন্সের মত রেড মিট গ্রহণ করেন তাদের আয়ু কমে ৩০ মিঃ। ৫. অপরদিকে যারা নিয়মিত অন্তত: পাঁচ বারে বিভিন্ন শাকসবজি, ফলমুল খান তারা প্রতিদিন ২ ঘন্টা আয়ু বাড়াতে পারেন। ৬. যারা নিয়মিত ২০ মিনিট সময় ব্যায়াম করেন তারা ১ ঘন্টা আয়ু বাড়াতে পারেন এবং যারা ৪০ মিঃ কাল ব্যায়াম করেন তারা অতিরিক্ত আরও ৩০ মিনিট আয়ু বৃদ্ধি করতে পারেন। ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলোর অন্যতম হচ্ছে- ১. প্রতি ৪ জন ধূমপায়ীর মধ্যে একজনের ফুসফুসের ক্যান্সার, ব্রঙ্কক্রাইটিস অথবা এম্পাইসিমা হতে পারে ২. Smokers cough যাদের হয় তাদের মধ্যে ও এ তিনটি রোগ হওয়ার সম্ভবনা থাকে । ৩.ধূমপায়ীদের স্ট্রোক হওয়ার সম্ভবনা অধূমপায়ীদের তুলনায় তিন গুন বেশী ৪. যাদের উচ্চ রক্ত চাপ আছে এমন ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে রক্তচাপ স্বাভাবিক অবস্থায় স্ট্রোক হওয়ার স্বম্ভবনা ৫ গুণ এবং তা অধূমপায়ীদের তুলনায় ২০ গুণ বেশী ঝুকিপূর্ণ। ৫. পরোক্ষ ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে অর্থাত্ যারা ধূমপায়ীদের সাথে বসবাস করেন তাদের স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি যারা ধূমপানমুক্ত পরিবেশে থাকেন তাদের চাইতে ২ গুণ বেশী। ৬. অনেকে বলেন আমার নানা বা চাচারা প্রতিদিন ৩০টা সিগারেট খেতেন এবং তারা অনেকে ৮৪ বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। সত্যি কথা হলো তারা ছিলেন ভাগ্যবান। গবেষণায় দেখা যায় প্রতি ২ জন ধূমপায়ীর একজন মারা যায় এবং ধূমপায়ীদের অর্ধেকই মারা যায় তাদের মধ্য বয়সে বা তরুণ বয়সে। ৮. প্রতি সিগারেটের ধোয়ায় ধূমপায়ীরা ৪০০০ রাসায়নিক পদার্থ গ্রহণ করে যার মধ্যে ৬০টি হচ্ছে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী এদের মধ্যে নিকোটিন মাদকাসক্তির কারণে ফুসফুসকে নষ্ট করে এবং কার্বন মনোক্সাইড মস্তিস্কের ব্রেন ও হূদপিন্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করে । একটি গবেষণায় দেখা গেছে ধূমপায়ীদের মধ্যে শতকরা ৯৮% ভাগই মাদকাসক্ত এবং তার মধ্যে শতকরা ৪৪% ভাগই বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত। সিগারেট থেকে নেশা শুরু করলেও মাদকের প্রতি আসক্তি তাদের ধীরে ধীরে শুরু হয়। বিশ্বে প্রতি ৬.৫ সেকেন্ডে ১ জন লোক ধূমপানের কারণে মারা যায় সে হিসেবে প্রতি ঘন্টায় ৫৫২ জন, প্রতিদিন প্রায় ১৩,১৯২ জন এবং প্রতিমাসে ৩,৯৮,৭৬১ জন। ধূমপানের কারণে বর্তমান বিশ্বে ৫০ লক্ষ লোকই মৃত্যু হয়। যার মদ্যে ৭০ ভাগই আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২০ সালে বিশ্বে ১ কোটি লোক মারা যাবে। যার মধ্যে ৭০ ভাগই আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে নিয়মিত তামাক সেবনকারীর সংখ্যা ৪ কোটিরও বেশি। এর মধ্যে ৩ কোটিই ধূমপায়ী। এরা প্রতি বছর প্রায় ৭ হাজার শলাকা বিড়ি-সিগারেট কিনে থাকেন। এ হিসেবে দিনে বিক্রি হয় প্রায় ১৯ কোটি শলাকা সিগারেট। নতুন একটি গবেষণায় এ কথা বলা হয়েছে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাবে যত লোকের মৃত্যু ঘটে, তার সমানসংখ্যক মৃত্যু হয় শরীরচর্চা না করা বা শারীরিক নিস্ক্রিয়তার জন্য। গবেষণা- প্রতিবেদনটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী চিকিত্সা বিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আনুমানিক এক- তৃতীয়াংশই পর্যাপ্ত শরীরচর্চা করছে না। এ কারণেই বিশ্বে প্রতিবছর ৫৩ লাখ লোকের মৃত্যু ঘটছে। সংখ্যার হিসাবে এটা হূদরোগ, বহুমুত্র (ডায়াবেটিস) এবং স্তন ও মলাশয় ক্যানসারের মতো রোগে মৃত্যুর প্রতি ১০টি ঘটনার মধ্যে একটির সমান। বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের ফলে বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়। এ খাত থেকে বছরে আয় হয় দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকা। গবেষকেরা বলছেন, সমস্যাটা এতটাই উদ্ব্বেগজনক পর্যায়ে পৌছেছে যে, এটাকে এখন মহামারী ব্যাধি হিসেবে দেখা উচিত। আর তা মোকাবিলায় নতুন করে ভাবা দরকার। তাঁদের পরামর্শ, মানুষকে শুধু শরীরচর্চার উপকারিতার বিষয়ে সচেতন করার পরিবর্তে এখন বরং নিস্ক্রিয় থাকার ভয়াবহতার বিষয়ে সতর্ক করা দরকার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট ৩৩ জন গবেষকের একটি দল এই গবেষণাটি চালায়। গবেষকেরা আরও বলেছেন, শরীরচর্চা-সংক্রান্ত বিষয়ে সুযোগ- সুবিধা বৃদ্ধি ও উপকরণগুলোর দাম সামর্থ্যের মধ্যে রাখতে সরকারগুলোকে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিবেদনটিতে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, বাগানের কাজ বা এ রকম মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ উপার্জন হারের দেশগুলোতে লোকজনের শারীরিক সক্রিয়তা কম। গবেষকেরা বলেছেন, দেশভেদে এর তুলনা করা কঠিন। তরুণ বয়সে ধূমপান শুরু করলে ৫০ ভাগ মৃত্যুঝুঁকি থাকে। যারা ৭০ বত্সরের আগেই মারা যায় অর্থাত্ তারা জীবনের ২২ বত্সর কম বাঁচে। বাংলাদেশ প্রতিবছর ৮ হাজার কোটি টাকা কেবল সিগারেটের মাধ্যমে পুড়ে , যা দিয়ে অনায়াসে দুটি যমুনা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। আর এ অপচয় বন্ধ করা গেলে দেশে সোয়া কোটি ক্ষুধার্ত লোককে পর্যাপ্ত খাদ্য দেয়া যাবে। সুতরাং ধূমপানের মত বদভ্যাস ছেড়ে সুস্থ জীবন যাপন সকলের জন্যই মঙ্গল।