শিশুকে গল্প বলার মধ্যে দিয়ে একদিকে যেমন তার সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়, তেমনি নানা রকম জিনিসও শেখানো যায়। গল্প বলার মধ্য দিয়ে শিশুর শেখানো নিয়ে আমাদের বিশেষ আয়োজন। লিখেছেন নওশীন শর্মিলী
ছোট শিশুরা শেখার ক্ষেত্রে মনোযোগী ও সক্রিয় হয়। তাদের মধ্যে যদি আগ্রহ তৈরি করা যায় তবে তারা অনেক ভালো অংশগ্রহণকারী হয়। অক্ষর জ্ঞান ও ভাষা শেখার কাজে তারা অর্থপূর্ণভাবে অংশ নেয়। লক্ষ করলে দেখবেন শিশুরা যে ভাষায় কথা বলে কিংবা যে অঙ্গভঙ্গি করে সেটি মূলত বড়দের অনুকরণ করে। যে কারণে শিশুদের অক্ষর জ্ঞান ও ভাষা শেখানোর কাজে নিয়োজিত প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তিকে অনেক বেশি অভিব্যক্তিময়, সাড়ামূলক ও আনন্দদায়ক ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হয়।
শিশুকে ভাষা শেখানোর অন্যতম সহজ উপায় হলো গল্প বলা এবং সেই গল্প আবার শিশুর কাছ থেকে শোনা। গবেষণায় দেখা যায়, শিশু গল্প শোনা ও গল্প বলার মধ্য দিয়ে অনেক নতুন নতুন শব্দ শিখতে ও ব্যবহার করতে পারে। এমনকি অনেক জটিল বাক্যও তারা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বলতে শিখে। গুছিয়ে কথা বলতে পারে। মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে।
গল্প আকারে কোনো কিছু বললে শিশুরা সবচেয়ে ভালো মনে রাখতে পারে। যে কারণে শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কর্মরত অনেক বিশেষজ্ঞই শিশুদের পাঠক্রম তৈরির ক্ষেত্রে গল্প বলা বিষয়টিকে কিংবা গল্পকে প্রাধান্য দিয়ে পাঠক্রম সাজানোকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। গল্প বলা বিষয়টিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে এর যে আকর্ষণ শক্তি তাতে কোনো কিছু মনে রাখা, আমোদিত হওয়া, অনুপ্রাণিত হওয়া, সৃজনশীলতা বাড়ানো, শেখা ও জানা অনেক সহজ হয়ে যায়।
ছোট শিশুদের অক্ষর জ্ঞান ও ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে উচ্চৈঃস্বরে পড়া ও গল্প বলা উভয় পদ্ধতিই খুব কার্যকরী। শৈশবে বাড়িতে দাদা-দাদী, নানা-নানী কিংবা অন্য কেউ এবং একক পরিবারে মা-বাবা শিশুকে অনেক ধরনের গল্প শোনায় কিন্তু স্কুলের ক্লাসে গল্প বলার ঘটনা সেভাবে ঘটে না। মনে রাখতে হবে গল্প বলা শিশুদের জন্য শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়। শিশুরা গল্প শুনতে ও বলতে ভালবাসে এটা তাদের জন্য আনন্দের।
আর আনন্দের বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে ক্লাস রুমে পড়ার সঙ্গে মিলিয়ে শিশুদের যদি মজার মজার গল্প শোনানো যায় এবং সেই গল্পগুলো পুনরায় তাদের কাছ থেকে শোনা যায় তবে অল্প পরিশ্রমেই ছোট শিশুদের অক্ষর জ্ঞান ও ভাষা শেখানো যায়। গল্প পড়া আর গল্প শোনা এই দুইয়ের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। কেউ যখন গল্প বলে তখন সেটি অনেক বেশি অনানুষ্ঠানিক হয়। বইয়ের পৃষ্ঠায় ছাপানো শব্দের মতো সেগুলো নিষ্প্রাণ হয় না। বরং গল্প বলিয়ের ভাষা, অঙ্গভঙ্গি, মুখভঙ্গি ও চোখের ভাষা সবমিলিয়ে পুরো গল্পটি যিনি শোনেন তার কাছে জীবন্ত হয়ে উঠে। তিনি যেন সবকিছু তার চোখের সামনে ঘটতে দেখেন। এ কারণে গল্প বলা শিশুর ভাষা শেখার ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা পালন করে।
গল্প বলা শিশুর মৌখিক ও লিখিতভাবে মনের ভাব প্রকাশের ক্ষমতা বাড়ায়। তার শব্দের ভাণ্ডার বাড়ে। তখন সে জটিল বাক্যও তৈরি করতে শিখে। ভাষার কাজ হলো যোগাযোগ ঘটানো। একজন মানুষ অন্য আরেকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ভাষা ব্যবহার করে। গল্প বলিয়ের ভাষা ব্যবহার ও গল্প—দুয়ে মিলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয় যা শিশুর মনকে আন্দোলিত করে। তখন তারা গল্প শোনার পর নিজেরাই সেই গল্পটি বলতে পারে।
এভাবে গল্প বলতে গিয়ে দেখা যায়, শিশু যে শব্দ ও ভাষা শুনেছে নিজে বলার সময় নিজে থেকে নতুন শব্দ ও বাক্য বিন্যাস করছে। নিজের ভাষায় গল্পটি বলতে গিয়ে ভাষার উপর তাদের দখল তৈরি হয়। গল্প বলা শিশুকে শ্রুতিলিখন ও গল্প লিখতে উত্সাহিত করে।
শিশুদেরকে গল্প বলার নানা বিষয় ও কৌশল
শিশুরা একটা বিষয়ে খুব ছাড় দেয় আর সেটা হলো এই যে, ওরা একই গল্প বারবার শোনে একই রকমের আগ্রহ নিয়ে। মোটেও বিরক্ত হয় না, বিরক্তি দেখায় না। কিন্তু তারপরও আমরা বড়রা গল্প বলায় কৃপণতা দেখাই।
একটু খেয়াল করে দেখুন আপনি আসলে অনেক গল্পই জানেন কিন্তু ভুলে গিয়েছেন বহুদিন গল্পবলার চর্চা করেননি বলে। সেগুলো মনে করুন।
ছোটদের গল্পের বই কিনে পড়ুন। তবে এখানেও বলে রাখা দরকার যে, অযথা রাক্ষস, ভূত, ঠাকুরমার ঝুলি ইত্যাদি পরিহার করুন।
ঈশপের গল্প শোনাতে পারেন, তবে সেখানেও একটু বাছাই করার দরকার আছে। কেন দরকার আছে সেটা জানতে পড়ুন ‘ঈসপের গল্পগুলি এমন কেন?’।
যদি তারপরও কাজ না হয়, তবে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলুন।
মডেল তানিয়া ও শিশু মডেল নাফিজ, ছবি দীপঙ্কর দীপু
