বাংলা
মোস্তাফিজুর রহমান লিটন, সিনিয়র শিক্ষক
বীরশ্রেষ্ঠ নূরমোহাম্মদ পাবলিক
কলেজ,ঢাকা
সোনার তরী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অনুশীলনীর সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর
১. নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও
বোকা বুড়োর গল্প শুনো
* * * * * * * * *
ছেলের হাত ধরে এগিয়ে চলে
দূরের পাহাড়টাকে একাই কাস্তে হাতে
করে দিতে সাফ
উত্তরে হাওয়া আনে হিম ঝড়
ছোট্ট ছেলের মনে পড়ে যায় ঘর
* * * * * * * * * *
একদিন গ্রামবাসী দেখল এসে
বিরাট পাহাড় গেছে ধুলোয় মিশে
সেখানে দিয়েছে দেখা এক সরোবর
কত পাখি গান গায় তীরে বসে
বোকা বুড়ো, মরে পড়ে আছে সেখানে
পাখিরা গাইছে তার শেখানো সেই গান
ক. ‘সোনার তরী’ কবিতাটি কোন ছন্দে রচিত?
খ. ‘সোনার তরী’ কবিতায় বহু জায়গায় দ্বিরুক্ত শব্দ ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করো।
গ. অনুচ্ছেদের হিম ঝড়ের সঙ্গে ‘সোনার তরী’ কবিতার সাদৃশ্যপূর্ণ চরণের ব্যাখ্যা করো।
ঘ. ‘অনুচ্ছেদটিতে ‘সোনার তরী’ কবিতার মূলভাব ফুটে উঠেছে’- মন্তব্যটির যথার্থতা বিচার করো।
১ নম্বর প্রশ্নের ‘ক’-এর উত্তর
‘সোনার তরী’ কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত।
১ নম্বর প্রশ্নের ‘খ’-এর উত্তর
মূলত কোনো বস্তু বা ভাবের আধিক্যকে বোঝাতে এমন দ্বিরুক্ত শব্দ ব্যবহার করা হয়।
‘সোনার তরী’ কবিতায় কবি অনেক জায়গায় দ্বিরুক্ত শব্দ ব্যবহার করেছেন। সাধারণত একের বেশি কোনো কিছুকে বোঝাতে দ্বিরুক্ত শব্দ ব্যবহার করা হয়, যাকে নির্ধারক বিশেষণ বলে। যেমন, ‘সোনার তরী’ কবিতায় “রাশি রাশি ভারা ভারা ধান” শব্দটির মতো কবিতার বহু পঙিক্ততে দ্বিরুক্ত শব্দ লক্ষ করা যায়।
১ নম্বর প্রশ্নের ‘গ’-এর উত্তর
উদ্দীপকে উল্লিখিত হিম ঝড়ের সঙ্গে ‘সোনার তরী’ কবিতার ঘন মেঘের তুলনা করা যায়।
‘সোনার তরী’ কবিতায় কবি প্রকৃতির নানা রূপ তুলে ধরেছেন। মানবজীবনের গভীরতর দর্শনকে রূপকার্থে তা প্রকাশিত হয়েছে। অনুচ্ছেদের হিম ঝড়ের সঙ্গে ‘সোনার তরী’ কবিতার সাদৃশ্য বিদ্যমান। এক্ষেত্রে অনুচ্ছেদের হিম ঝড়কে ‘সোনার তরী’ কবিতার ঘন মেঘের সঙ্গে সাদৃশ্য করা চলে।
অনুচ্ছেদে ‘উত্তরে হাওয়া আনে হিম ঝড়’ বক্তব্যটিতে প্রকৃতির যে বর্ণনা পাওয়া যায় ‘সোনার তরী’ কবিতায় ‘শ্রাবণ-গগন ঘিরে/ ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে’ পঙিক্তটির ভেতর তেমনটিই বক্তব্য লক্ষ করা যায়। এখানে দুটি কবিতাংশেই প্রকাশিত হয়েছে বৈরী প্রকৃতির স্বরূপ। তাই এ দুইয়ের বিশ্লেষণে বলা যায়, কবিতায় কবি যেখানে প্রকৃতির বৈরিতা প্রকাশ করেছেন, অনুচ্ছেদেও তার সুস্পষ্ট উপস্থিতি বিদ্যমান। এ অনুচ্ছেদে জীবনের গভীরতর তাত্পর্য প্রকাশ না পেলেও প্রকৃতিরাজ্যের এক অসামান্য শিল্প নিদর্শন কবি প্রকাশ পেয়েছে।
১ নম্বর প্রশ্নের ‘ঘ’-এর উত্তর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘সোনার তরী’ কবিতায় চিত্রধর্মী রূপক প্রকৃতির অন্তরালে মানুষের জীবনের নানা বিচিত্র রূপ ফুটে উঠেছে। প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাধ্যমে জীবনের মাহাত্ম্য তুলে ধরাই এ কবিতার মূল বক্তব্য; যা উদ্দীপকে বিদ্যমান।
‘সোনার তরী’ কবিতায় প্রকৃতির নানা দৃশ্যের উপস্থাপনা করে মানবজীনের অন্তর্নিহিত জীবনদর্শন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সময়ের চলমান স্রোতের প্রবাহমানতায় মানুষ তার অনিবার্য মৃত্যুকে রুদ্ধ করে রাখতে পারে না। তবে কোনো কীর্তিরই মৃত্যু হয় না। মহাকালের হিসাবখাতায় তার সবই লেখা থাকে। এটাই ‘সোনার তরী’ কবিতার সারকথা।
অপরদিকে অনুচ্ছেদে উল্লে¬খকৃত পঙিক্তর মধ্য দিয়ে বোকা বুড়োর যাবতীয় কাজকর্মকে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে বোকা বুড়ো মানবজাতির একজন প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচ্য। পাহাড়, হিম ঝড়, সরোবর, পাখির গান ইত্যাদি নানা অনুষঙ্গ দিয়ে অনুচ্ছেদটি সাজানো, যার মূলচরিত্র এক বোকা বুড়ো।
বুড়ো কাস্তে হাতে দূরের পাহাড়কে কেটে সাফ করতে যায় এবং উত্তরের হিম হাওয়ার কবলে পড়ে মৃত্যুবরণ করে। একদিন গ্রামবাসীরা তার মৃতদেহ দেখতে পায়। তারা সেখানে গিয়ে বিস্ময়ে শুনতে পায় বুড়োর শেখানো বুলিতে পাখিরা গান গেয়ে চলছে। এই দৃশ্যকল্পের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে কর্মের পার্থিব ফল। ‘সোনার তরী’ কবিতায়ও এমন দৃশ্যকল্প পরিলক্ষিত হয়। ছোট তরীতে সকল ধান তুলে দেওয়ার পর আর নিজের ঠাঁই না পাওয়ার মাঝে লুকিয়ে আছে সেই অন্তর্নিহিত জীবনের দর্শন, যা দিয়ে প্রকাশ পায় জীবনে কীর্তিটুকুই বেঁচে থাকে। বাকিটুকু কালের গর্ভে তলিয়ে যায়। ফলে মূল কবিতার আলোকে অনুচ্ছেদটি বিশে¬ষণ করলে দেখা যায়, কবিতার মূলভাবের সঙ্গে তা সঙ্গতিপূর্ণ।
