বাংলাদেশ কেমন আছে?

আপডেট : ০৫ মে ২০১৯, ২২:১৪

মুক্তা আক্তার

স্বাধীনতার পর থেকে এই দেশটিকে সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্য নিয়ে যে অবিরাম ছুটে চলার সংকল্প জাতি করেছে তাতে সমানে সমান অংশগ্রহণের দাবি রাখে। অথচ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন শুধু কিছু রাজনৈতিক দল কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। একটি পরিবার যেমনি একজন পরিবার প্রধানের তৈরি করা নিয়ম, শৃঙ্খলা মেনে সুষ্ঠু-সুন্দর ও আনন্দময় জীবন গড়ার উদ্দেশ্যে সদস্যদের গতিপথ ও সীমানা নির্ধারণ করে দেয় তেমনি একটি দেশের প্রধান তার দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, সর্বোচ্চ জনস্বার্থ রক্ষা ও সুখ-দুঃখ বিলিয়ে দেবার কাজে তত্পর থাকে। তার মানে এই নয় যে সকল দায় শুধু দেশপ্রধানের। দেশের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ভূখণ্ডে অবস্থিত সকল শ্রেণির মানুষের সাহায্য ও সচেতনতা একান্ত প্রয়োজন।

ব্যবসায় শিক্ষা প্রশাসনে একটি নীতি রয়েছে যে, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও মালিক তথা মালিকানা সত্তাকে পৃথক চিন্তা করতে হবে যা মালিকের নিকট ব্যবসায়ের দায় নির্দেশ করে থাকে। ঠিক একইভাবে যদি বাংলাদেশকে তার ভূখণ্ডে বসবাসরত প্রতিটি ব্যক্তিসত্তা থেকে পৃথক চিন্তা করা হয় তবে নিঃসন্দেহে দেশের প্রতি আমরাও গভীরতর দায়বদ্ধ; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সে দায়ের পরিমাণ চিন্তা করা দূরে থাক  আমরা কখনো কখনো বাংলাদেশের অংশ হয়ে বাংলাদেশকে অন্ধকারে ঠেলে দেই।

সক্রিয়ভাবে অন্যায়, দুর্নীতি,  সহিংসতা, রাহাজানি, দেশের সম্পদ হরণ কিংবা অরাজকতার মতো হাজারটা অন্যায় করে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নষ্ট করে শুধু নিজের নয় সর্বোপরি দেশের জন্য হুমকি ডেকে আনছে। আফসোসের কথা যে, আগের মতো এ নিয়ে আর লেখালেখি, প্রতিবাদ কিংবা প্রতিবেদন প্রকাশ হয় না। অন্যায় অবিচার কমেনি, কমেনি নিম্নশ্রেণির প্রতি শোষণ, শুধু আগের মতো শোরগোল হয় না।

আপনি ঐ প্রবাদটি শুনেছেন নিশ্চয়ই যে, ‘স্পষ্টভাষী শত্রু নির্বাক মিত্র অপেক্ষা ভালো।’ যারা প্রকাশ্যে বাংলাদেশের কাঠোমোতে ক্ষতিকারক পোকার মতো বিনষ্ট সাধন করে চলেছে তার থেকে কয়েকগুণ বেশি ক্ষতির কারণ আপনার-আমার মতো মানুষগুলো যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার গুরুদায়িত্ব থেকে দূরে থেকে, পরোক্ষভাবে দেশের প্রতি নিজেদের অকৃতজ্ঞ চর্চা করে থাকি। শুধু কোনো রকমে জীবন-যাপন করে দিন পার করা মানব সৃষ্টির অপচয়ই নয় বরং স্রষ্টার অবমাননা।

দেশে বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে কথাটি থেকে বুদ্ধিজীবী জন্মান বন্ধ হয়ে গেছে আমার মনে হয়। সতেজ, তরুণ, বুদ্ধিদীপ্ত যুব সমাজকে অবমাননা করে দিনে দিনে বাংলাদেশের মেরুদণ্ড দুর্বল করে দিচ্ছে সে বিষয় সামান্য ভ্রুক্ষেপ নেই ক্ষমতাসীন সমাজের।

বাংলাদেশ কেমন আছে এ প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে অনেকগুলো বাড়তি প্রশ্ন ও বিষয় জড়িয়ে আছে যার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি। দেশের অভ্যন্তরীণ অরাজকতা কিছুটা কমলেও থেমে নেই দুর্নীতির কালো থাবা, কমেনি মাদক দ্রব্য পাচার ও সেবন। দলীয় স্বার্থ রক্ষায় আইন ও বিচারব্যবস্থা স্বার্থান্বেষী দল ও ব্যক্তিগণ নিজেদের হাতে নয় রীতিমতো মাথায় নিয়ে চলছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবলে একদিকে যেমন বাংলাদেশি হিসেবে আনন্দিত হবার ইচ্ছা জাগে ঠিক পরক্ষণে দেশের মধ্যকার সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষ, বৃদ্ধাশ্রমের নোংরা ঘরে পড়ে কাতরানো বাবা-মা কিংবা সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় বিনা চিকিত্সায় পড়ে থাকা মৃতদেহটার কথা মনে পড়ে শিওরে উঠি। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দরবারে নিজেকে পরিচিত করতে পারছে, সরকার সফলতা ও উন্নয়নের গতি বৃদ্ধি করেছে, কৃতিত্বগুলোকে বাঙালি নিজ নামে দেশের নামে ছড়িয়ে দিতে পারছে এটা আমাদের জন্য বাঙালি হিসেবে গর্বের অংশ; কিন্তু দেশের মধ্যে বসবাসরত মানুষগুলোর জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিম্নশ্রেণির মানুষকে স্বাভাবিক জীবন উপহার দেওয়া, বৃদ্ধাশ্রমের অসহায়দের উত্তম ভরণপোষণ কিংবা যুব সমাজকে হতাশা থেকে দূরীকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ কি বাংলাদেশের এখনকার, এই পরিস্থিতির আর সময়ের দাবি নয়? বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে উপস্থাপনের পূর্বে দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদান মূল লক্ষ্য হবার যোগ্যতা কি রাখে না?

বাংলাদেশকে নিজের থেকে আলাদা নয়, নিজেকে বাংলাদেশ মনে করতে হবে। দেশের সমস্যাগুলো সরকার বা দলগত মনে না করে ব্যক্তিগত চেষ্টা ও উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। নিজ ও পরিবারকে ভালো চিন্তা, সুবুদ্ধি, দেশপ্রেম ও ধর্মের প্রতি দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হবার শিক্ষা দিতে হবে।

বাংলাদেশ ভালো নেই, তার দায় আপনার, আমার তথা আমাদের। আজকের অগোছালো বাংলাদেশ সুখী, নিরাপদ, দুর্নীতিমুক্ত, সমৃদ্ধ, সৃজনশীল ও উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার কৃতিত্ব আমার আপনার সক্রিয় চেষ্টা ও উদ্যোগের মাধ্যমে আমাদেরকেই অর্জন করতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী,  বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়