জাপায় দুই বলয়

আপডেট : ০৫ মে ২০১৯, ২২:১৯

দলীয় চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের অবর্তমানে ভবিষ্যত্ নেতৃত্ব ও পদ-পদবি নিয়ে জাতীয় পার্টি (জাপা) দৃশ্যত দুটি বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এরশাদ অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে যাওয়ায় একটি বলয় সৃষ্টি হয়েছে তার স্ত্রী ও দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদকে ঘিরে। আরেকটি বলয় গড়ে উঠেছে এরশাদের সহোদর ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে কেন্দ  করে। দুই বলয়ে এখন চলছে শক্তি অর্জনের প্রতিযোগিতা। দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কাছে টানতে উভয় পক্ষের মধ্যে চলছে রশি টানাটানি। নেতারাও যার যার বর্তমান ও ভবিষ্যত্ রাজনৈতিক                 অবস্থান এবং সুবিধা-অসুবিধার হিসাব কষছেন।

গত কয়েক মাস ধরেই জাপা ভেতরে-ভেতরে মচকে গেলেও শনিবার মধ্যরাতে জি এম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করায় বিভক্তি নতুন করে গতি পেয়েছে। বিভক্তির কারণে দলটির মহাসচিব পদেও যে কোনো সময় পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমান মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার স্থলে মহাসচিব পদে দেখা যেতে পারে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এরশাদের ভাগ্নি জামাই জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলুকে। বাবলু এর আগেও এক দফা দলটির মহাসচিব ছিলেন।

বর্তমানে এরশাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও প্রায় প্রতিদিন তার বারিধারার বাসায় যাতায়াত রয়েছে এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শনিবার রাতে জি এম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণার সঙ্গে মহাসচিব হিসেবে বাবলুর নামও ঘোষণার কথা ছিল এরশাদের। কৌশলগত কারণে সিদ্ধান্ত বদল করে শুধু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন করে কোনো ঝামেলা সৃষ্টি না হলে মহাসচিব হিসেবে বাবলুর নাম ঘোষণা সময়ের ব্যাপার মাত্র। সূত্রমতে, শনিবার রাতে বাবলুও এরশাদের বাসায় দীর্ঘসময় ছিলেন। রাত নয়টার দিকে তিনি এরশাদের বাসা থেকে বেরিয়ে যান। এ ব্যাপারে বাবলু গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘এরশাদের সঙ্গে আমার শুধু দলীয় রাজনীতির সম্পর্কই, বিষয়টি এমন নয়। যেহেতু তিনি অসুস্থ, সেই কারণে প্রায়ই আমি ও আমার স্ত্রী তার বাসায় গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে থাকি। শনিবার রাতেও সেভাবেই গিয়েছিলাম। মহাসচিব পদ বা রাজনৈতিক কোনো আলোচনাই হয়নি।’ অন্যদিকে, মহাসচিব পদে পরিবর্তনের গুঞ্জন সম্পর্কে মসিউর রহমান রাঙ্গা গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘স্যার (এরশাদ) আমাকে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন, এখন অব্যাহতিও দিতে পারেন। সেই ক্ষমতা চেয়ারম্যান হিসেবে তার রয়েছে।’

গভীর রাতে সাংবাদিকদের এরশাদের বাসায় ডেকে নিয়ে জি এম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণার প্রক্রিয়া নিয়েও মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে জাপার অভ্যন্তরে। দলটির প্রেসিডিয়ামের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা শনিবার রাতেই ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘জি এম কাদেরকে তো এর আগেও এরশাদ একবার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেছিলেন, পরে আবার বাদও দিয়েছেন। সহোদরকে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করতেই পারেন। কিন্তু এভাবে মধ্যরাতে কেন এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। পরদিন দিনের বেলায়ও সেটা হতে পারতো। সেজন্যই বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।’

এ ব্যাপারে জি এম কাদের বলেন, ‘এখানে সন্দেহের কিছু নেই। শনিবার সন্ধ্যার পর আমি ওনার (এরশাদের) বাসায় গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে আবার চলে আসি। তখন দলের রাজনীতি নিয়ে কোনো আলাপ হয়নি। এরপর উনিই আবার আমাকে ডেকে পাঠান। তখন তিনি বললেন—আমি কতদিন বেঁচে থাকি ঠিক নেই, তোমাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করতে যেতে চাই।’

রওশন এরশাদ দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান হলেও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করে জি এম কাদেরকে কার্যত এরশাদের অবর্তমানে দলে তার উত্তরসূরি ঘোষণা করায় বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছেন রওশনপন্থিরা। মহাসচিব পরিবর্তনের আভাসেও এই অংশটির কেউ কেউ ক্ষুব্ধ। যা প্রকাশ্য রূপ পায় শনিবার রাজধানীর বনানী কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর জাপার একটি বৈঠকে। ওই বৈঠকে ঢাকা মহানগর উত্তর জাপার সভাপতি এস এম ফয়সল চিশতি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘যখন তখন স্যারের স্বাক্ষর নিয়ে এভাবে দলের পদ-পদবি ভাগিয়ে নেওয়ার ঘটনা মেনে নেওয়া হবে না। ওই বৈঠকে দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘আমি তো মহাসচিব হতে চাইনি। স্যারই আমাকে হঠাত্ দায়িত্ব দিলেন। আলোচনার মাধ্যমে কিংবা সংগঠনের স্বার্থে কিছু হলে আমার আপত্তি নেই।’

এদিকে, জি এম কাদের পুনরায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের একীভূত করার চেষ্টা করছেন। শনিবার রাত থেকে গতকাল দিনভর তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে দায়িত্ব পালনে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। এ ব্যাপারে গতকাল বনানী কার্যালয়ে জি এম কাদের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন—এরশাদই আমাদের নেতা। তিনি যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন তার নির্দেশনাতেই জাপা চলবে। যারা সমালোচনা করেন তারা সমালোচনার জন্যই নানা কথা বলতে পারেন। দলের সিনিয়র নেতারা ফোন করে অনেকেই আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং সবাই আমার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন বলে আশা করছি।