ক্যারিয়ারে বন্ধুত্ব

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৩, ২০:৫৩
বন্ধু। শব্দটা সত্যিই কেমন যেন আপন মনে হয়। মনে হয় খুব কাছের কেউ। যার পাশাপাশি পথ চলে কাটিয়ে দেয়া যায় বছরের পর বছর। বন্ধু ছাড়া স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় কেউ পাড় হয়নি একথা সবাই জানে। কাছের হোক বা দূরের হোক, বন্ধু বন্ধুই। চাকরি ক্ষেত্রে বন্ধুত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অতএব চাকরিতে বন্ধুর ভূমিকা থাকবে না—তা কী হয়? চোখ-কান খোলা রেখে সতর্কতার সাথে বন্ধু নির্বাচন করলে সেই বন্ধুটি হয়ে উঠতে পারে আপনার আস্থা ও নির্ভরশীলতার প্রতীক। চাকরিতে সমমনা বন্ধু ক্যারিয়ারে আপনার মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আর আনুগত্যের বন্ধুত্ব খুবই প্রয়োজন। পড়াশোনা শেষ হয়েছে সেই কবে। বহু প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভিউ দিয়েও চাকরি হচ্ছে না। তাই বলে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। কারণ স্কুল কলেজ এমন কি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রচুর বন্ধু-বান্ধবী ছিল আপনার। আর পাড়া বা মহল্লায় বাল্যবন্ধুরা তো আছেই। তাদের খোঁজ নিতে দোষ কি! তারা অনেকেই হয় তো বড় বড় প্রতিষ্ঠানে আছেন। দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই বলে দ্বিধা করার কোন কারণ নেই। এক্ষুণি হাতে তুলে নেয়া যাক ফোনটা। কথা হোক, হোক দেখা। এটা কর্পোরেট যুগ। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো এখন আর শুধু সিভি দেখে না। ইন্টারভিউয়ের চেয়ে যোগাযোগটাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মামা-চাচার যোগাযোগ না। এটি জব নেটওয়ার্কিং সিস্টেম। যেখানে সুপারিশের জন্য কাছের বন্ধুটিই যথেষ্ট। কোম্পানিগুলো এখন একজন দক্ষ কর্মচারির মাধ্যমে আরেকজনকে নেয়। অতএব ঘনিষ্ট বন্ধুটি অবহেলা করা উচিত নয়। বর্তমান সময়ে চাকরি খোঁজার আগে বন্ধু খোঁজা প্রয়োজন। তাহলেই পথটা সহজ হয়ে যায়। অনেক সময় বন্ধু হয়তো সরাসরি কিছু করতে পারে না। অন্য কাউকে অনুরোধ করে। তাতে কি? কাজটা তো হলো। দি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এ প্রকাশিত এক জরিপে পাওয়া গেছে মজার তথ্য। চাকরি খুঁজছেন, এমন ৩৫১ জনের উপর চালানো হয়েছিল জরিপটা। তাতে দেখা গেছে শতকরা ৬০ ভাগই চাকরি পেয়েছেন তাদের বন্ধু, সাবেক সহপাঠী বা সহকর্মীর মাধ্যমে। ১৭ ভাগ এজেন্সির মাধ্যমে। আর মাত্র ১৫ ভাগ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে, ইন্টারভিউ দিয়ে। ভয় পাবার কোন কারণে নেই। সবারই তো অনেক বন্ধু বান্ধব আছে। না-ই হলো চাকরি বাকরির বিষয়। সমমনা বন্ধুদের সঙ্গে বসুন। সময় দিন তাদেরকে। অনেকেই হয়তো স্বাধীনভাবে ব্যবসা করছেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন। সম্ভব না হলে বেকার বন্ধুরা মিলেই একটা উদ্যোগ নিন। তবে যাই করা হোক না কেন, অবশ্যই সবাই মিলে চিন্তা ও আলোচনা করে করতে হবে। বন্ধুরা মিলে গড়ে তুলেছে, এমন প্রতিষ্ঠানের রেজাল্ট অনেক ভালো। কারণ একজন আরেকজনের পাশে থাকছে সব সময়। সে জন্য সাফল্যও বেশি। মানসিকতাটাই আসলে জরুরি। অন্তত স্বাধীন ব্যবসার ক্ষেত্রে। বুটিকের দোকান, ফাস্টফুড, বায়িং হাউস, ফ্যাশন হাউস থেকে শুরু করে এক্সিবিশন পর্যন্ত আজকাল বন্ধুরা মিলে করছে। অতএব আপনাকেও প্রচেষ্টা চালাতে হবে অন্তত ভালো ভাবে জীবন যাপনের জন্যে ভাল কিছু তো করতে হবে। বন্ধু যখন কলিগ বন্ধুটি যদি আপনার কলিগ হয়, তাহলে সে নানাভাবে উপকারে আসতে পারে। অনেক এক্সিকিউটিভের মতে, কাজের জায়গাটি হতে হবে পরিবারের মতো। অর্থাত্ যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রতি যত্নশীল হবে। বন্ধুত্বপূর্ণ হবে। এতে কাজের গতি বাড়ে। আনন্দ আসে। কাজ বেশি হয়। উত্পাদন ও টিমওয়ার্কে এর বিরাট প্রভাব পড়ে। সব কিছু মিলিয়েই গড়ে ওঠে একটি কর্পোরেট ফ্যামিলি। কোম্পানির উন্নতির মূলেই ফ্রেন্ডশিপ থিয়োরি। তবে কর্মক্ষেত্রে বন্ধুত্ব খুব গভীর না হওয়াই ভাল। একটা না দেখা দূরত্ব মেনে চলতেই হবে। ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোকে কাজের জায়গায় টেনে না আনাই ভাল। আপনার স্ত্রীও আপনার কলিগ হতে পারে। তবে কাজের ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়তে দেয়া যাবে না। কর্মক্ষেত্রে বন্ধুত্ব আর ব্যক্তিজীবনে বন্ধুত্ব গুলিয়ে ফেলা যাবে না। তাহলে পদে পদে শুধু ঝামেলাই দেখা দেবে। বন্ধু: জুনিয়র না সিনিয়র জুনিয়র বন্ধুরা কখনো কখনো বিপদের কারণ হতে পারে। একটু অসাবধানতার দরুন আপনাকে পড়তে হতে পারে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। সিনিয়ররাও কিন্তু কম যান না। এই সব ম্যানেজ করতে হবে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী। অফিস কালচার এবং পলিটিক্সটা বুঝতে হবে। মনে রাখতে হবে কর্পোরেট জগত্ খুবই কন্টকাকীর্ণ। এখানে বন্ধুই পতনের মূল কারণ হতে পারে। অতএব, কর্মক্ষেত্রে এমন বন্ধু চাই, যে সত্যিই বন্ধু। যে আপনার কল্যাণে এগিয়ে আসবে। শিক্ষিত বন্ধু হয়তো সবার সাথে সব সময় যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয় না। তবু যদ্দূর সম্ভব সব বন্ধুর সঙ্গেই যোগাযোগ রক্ষার চেষ্টা করুন। শুধু চাকরিজীবী বন্ধুই নয়, ব্যবসায়ী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, শিল্পী, লেখক যে কোন বন্ধুই উপকারে আসতে পারে। বন্ধু বদলে দিতে পারে আপনার জীবন। তাই তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াটা বোকামি। এ ছাড়া নিজেকে গুটিয়ে রেখে লাভ কি? একটু কান পাতলেই শুনতে পাবেন অনেক বন্ধুর ডাক। নিজেকে বড় মনে করে বন্ধুর ডাকের অপেক্ষায় থাকা উচিত নয়। বড়ত্ব ভুলে গিয়ে নিজেই ডাকুন তাদেরকে। নিজের হাতটা আগে বাড়িয়ে দিলে বন্ধু এসে পাশে দাঁড়াবেই। সুখ দুঃখের সাথী হবেই হবে। আর তখন বিবর্ণ মুহূর্তগুলোই তার স্পর্শে হয়ে উঠবে রঙিন। সামাজিক শব্দে যাকে বলে ‘শিক্ষিত’, সেটা না হতেন। কারণ সাধারণ, শিক্ষিত না হলে আপনার চাকরি বা ব্যবসা করা হত না। চাকরি না হলে ছবি দেখা, গান শোনা কিংবা বেড়াতে যাবার টাকা আসত না। খেলাধূলার সরঞ্জাম কিংবা বই ম্যাগাজিনকেনার টাকাইবা আসত কোত্থেকে। নিত্য দরকারী জিনিসপত্র, খাবার-দাবার জামা-কাপড় ওষুধপত্র? এবার আপনার মনে হতে পারে কেবল টাকার জন্যই আমরা কাজ করি। আর কিচ্ছু না। আর কোনো কারণ নেই। কথাটি হয়তো উড়িয়ে দেয়ার মতোও না। টাকার জন্যই তো আমরা কাজের পেছনে সময় দিই। আমাদের প্রতিদিনের, এমনকি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টাই দেই। তাই ওই অর্থ উপার্জনের অন্য অর্থও আছে। অনেকে কাজ করেন। কারণ তিনি ভাল কিছু যে করছেন, তার স্বীকৃতি পান। যেমন সম্মান, কারো প্রতিভা দেশ ও জাতির উপকারে আসছে। এই আনন্দে তিনি কাজ করেন। কেউ স্রেফ আনন্দের জন্যও কাজ করে থাকেন। আবার কেউ নিজের আইডেন্টিটির জন্যে, কেউ পরের জন্য কাজ করেন। কৃতিত্বের মোহেও অনেকে ভীষণ মন দিয়ে কাজ করে চলেন আমরণ। এমন যদি হয়, অধস্তনের উপর আর কর্তৃত্ব থাকবে না, তাহলে এ কমিনিটও তিনি আর ওই কাজ করবেন না। ছেড়ে দেবেন। কাজ করার কারণ তাই একেক জনকে একেকভাবে আলোকিত করেছে। নিচের তালিকাটি দেখুন এবং চিহ্নিত করুন, কোন কারণে আপনি কাজ করছেন- - শুধু শুধু বসে থাকতে ভালো লাগে না। তাই নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্যে কাজ করেন। - নিজের প্রতিভা, ক্ষমতা ও দক্ষতা প্রমাণের জন্যে কাজ করেন। - বসে থাকলে যেহেতু এমনি এমনি আইডিয়া আসবে না, তাই নতুন কোন আইডিয়া পাবেন বলে কাজ করেন। - নানা ধরনের মানুষের সংস্পর্শে আসা যায় বলে। - নিজের সৃষ্টিশীলতা প্রমাণের জন্য কাজ করেন। - কর্মক্ষেত্রে অনেক বন্ধু পাওয়া যায় বলে। - কাজ করলে অনেকে চিনবে, জানবে, তাই। - অন্যদের উপর কর্তৃত্ব খাটানো যায় বলে। - সময়কে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে। - অর্থ উপার্জনের জন্যে। - যাতে জীবনটা হয়ে ওঠে সুখী ও আনন্দময়। - সমাজে অবদান রাখার জন্য। - শরীর যাতে কর্মক্ষম থাকে, সে জন্য কাজ করেন। - জীবনের উপভোগ্য উপাদানগুলো ভোগ করার জন্য। - নতুন নতুন বিষয় শিখে নিজের স্কিল আরো বাড়ানোর জন্য। - নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার ক্ষমতা অর্জনের জন্য। - চারপাশ ঘিরে প্রিয় মানুষেরা থাকবে, এই প্রত্যাশায়। - সমাজ এবং সম্প্রদায়ে সম্মান প্রতিপত্তি নিয়ে বাস করার জন্য। - জীবনে নিরাপত্তাবোধ থাকবে বলে। - নানারকম অর্জনের সুখ পাওয়ার ইচ্ছায়। যে কারণই হোক না কেন, কাজ করুন মনোযোগ দিয়ে। আর সাফল্যের জন্য আপনার এই আত্মজিজ্ঞাসার পাশপাশি আপনার বন্ধুর মতটাও গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই তাকে অবহেলা করবেন না। তিনি আপনাকে অনেক ভালোই চিনবেন। তাই হাত বাড়িয়ে দিন বন্ধুর প্রতি।