মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে

আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৩, ২১:২৮
২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। প্রলম্বিত বিশ্বমন্দায়ও ভালো পারফর্ম করে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছি আমরা। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর রেটিংয়েও এগিয়েছে দেশটি। তা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার গতি ধীর বলে জানাচ্ছে বিশ্বব্যাংক-এডিবির মতো সংস্থা। এ ক্ষেত্রে সুশাসনের অভাবকে বড় করেই দেখছেন সবাই। নির্ধারিত সময়ে মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে উঠতে হলে বিশেষত উত্পাদনমুখীখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আমাদের অর্থনীতি রফতানিনির্ভর, তাও আবার গার্মেন্টসকেন্দ্রিক। এতে বিপুলসংখ্যক নারীর কর্মসংস্থান হলেও টেকসই উন্নয়নে চাই রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ। অভ্যন্তরীণ বাজার সমপ্রসারণেও দৃষ্টি দিতে হবে। আয় বৃদ্ধির ধারায় এখানে চাহিদার ধরনেও পরিবর্তন লক্ষণীয়। একে সদ্ব্যবহারপূর্বক অর্থনীতির গতি বাড়াতে পণ্য ও সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে বৈশ্বিক মন্দা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই দুই বিপর্যয় সত্ত্বেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভালো করছে এমন উন্নয়নশীল ২৫টি দেশের অন্যতম হিসেবেও বাংলাদেশকে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে এ সাফল্য প্রশংসিত হলেও ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে ঠাঁই পেতে হলে আরও জোরে এগুতে হবে। জিডিপিকে নিতে হবে ৮ শতাংশ উচ্চতায়। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিও নিশ্চিত করতে হবে। ২০২১ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়া বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার হলেও সরকারি হিসাবেই এ ক্ষেত্রে অগ্রযাত্রা খুব একটা সুখকর নয়। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের প্রতিবেদনে বিনিয়োগ পরিস্থিতি সম্পর্কে হতাশা ব্যক্ত করে বলা হয়েছে, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নির্ধারিত বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার প্রশংসা করা হলেও একইসঙ্গে বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের ব্যর্থতাকে তুলে ধরা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে ব্যক্তিখাত উন্নয়নের জন্য নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। প্রতি বছর ১৮ লাখ মানুষ এ মিছিলে যোগ দিচ্ছে। তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শ্রমঘন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে নজর দিতে হবে। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ব্যাপারেও গুরুত্বারোপ করেছে বিশ্বব্যাংক। বৈশ্বিক মন্দা বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ধকল সৃষ্টি করেছে কোনো জাতিরই তা থেকে মুক্ত থাকার উপায় নেই। এ বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই সব জাতিকে এগুতে হবে। বৈশ্বিক মন্দা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের পণ্যের উত্পাদন খরচ কমাতে চাইছে। শ্রমের দাম এ দেশে কম হওয়ায় বাংলাদেশের সামনে সৃষ্টি হয়েছে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে বিনিয়োগের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। কেন বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না খুঁজে বের করে সে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, বাংলাদেশের অগ্রগতির পথে বড় বাধা হচ্ছে দুর্বল অবকাঠামো। মূলত এ কারণে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে গত পাঁচ বছরে ক্রমে পিছিয়েছে দেশ। এ ক্ষেত্রে গ্যাস-বিদ্যুত্ স্বল্পতার পাশাপাশি বেহাল যোগাযোগব্যবস্থাও নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে একাধিক বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও শেষ হয়নি তার একটিও। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ সহজ করতে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে দেখা দিয়েছে জটিলতা। রাজধানীর যানজট কমাতে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলের মতো প্রকল্প দ্রুতই শেষ করা প্রয়োজন। বন্দর ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে ব্যবসার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য মসৃণ আর্থিক খাত থাকা প্রয়োজন বৈকি। ব্যাংক ও আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনায়ও কিন্তু দক্ষতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। শেয়ারবাজার, হলমার্ক কেলেঙ্কারির মধ্য দিয়ে এ খাতে দেখা দিয়েছে অস্থিরতাও। এতে উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখা বেসরকারিখাত কিছুটা হলেও শঙ্কিত হয়ে পড়ছে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশবাসী এই লক্ষ্যে উজ্জীবিত। পোশাকশিল্পে বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা প্রভৃতি কারণে যদিও দেশে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তবে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো। দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং তা রফতানির মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। সরকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে মানুষের জীবন, সম্মান ও সম্পত্তির নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিক এটাই সবার কামনা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ ও মূল্য পরিস্থিতিকে মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে নিয়ে আসা, আইনের শাসন কায়েম, অসাধু ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট ভেঙে জনস্বার্থের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং সম্পদের সুষম বণ্টনসহ মৌলিক ইস্যুগুলো যদি সরকার সমাধান করতে পারেন তাহলে দেশ স্বাভাবিক গতিতেই এগিয়ে যাবে এবং মধ্যম আয়ের কেন, শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হতেও বাধা থাকবে না এমনটিই আমার বিশ্বাস। বাংলাদেশ সম্ভাবনার দেশ। এই সম্ভাবনাকে সর্বাত্মক কাজে লাগাতে হবে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারলেই আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবো। ঢাকা