কবে এই ঘৃণ্য কালিমা দূর হবে

আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৩, ২১:২৯
নারী নির্যাতন, ধর্ষণ-গণধর্ষণ, হত্যা এখন স্বাভাবিক সংবাদে পরিণত হয়েছে। ধর্ষণের পর অসহায় নারীদের হত্যা করতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না নরপশুর দল। এছাড়া যৌতুকের বলি যে কত নারী হচ্ছে তার হিসেব কে রাখে? কেবল গ্রামাঞ্চলেই নয়, শহরে যৌতুকের করাল গ্রাস কত নারীর জীবনকে প্রতিদিন মৃত্যু যন্ত্রণা দিচ্ছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রে নারী নির্যাতনের ঘটনা কয়টা বা প্রকাশিত হয়? বহু অত্যাচারিত নারীর দীর্ঘশ্বাস আমরা শুনতে পাই না। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, গত ৬ জানুয়ারি দিবাগত রাতে কক্সবাজারে গণধর্ষণের পর এক কিশোরীকে নির্মমভাবে খুন করে গলায় ফাঁস লাগিয়ে লাশ গাছে ঝুলিয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ৮ জানুয়ারি প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদ থেকে আরো জানা যায়, এক বছর আগে থেকে ১৬ বছর বয়সী অষ্টম শ্রেণির মাদ্রাসা ছাত্রী নিহত কিশোরীকে মাদ্রাসায় আসা-যাওয়ার সময় উত্যক্ত করে আসছিল কতিপয় বখাটে। এর মাত্রা বেড়ে গেলে অভিভাবকরা তার পড়াশোনা বন্ধ করে দেন। তবু ক্ষান্ত হয়নি বখাটে নরপশুর দল। গত ৬ জানুয়ারি তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণের পর হত্যা করে। এমন অনেক ঘটনার নজির রয়েছে। বাবা-মা একটু অসচেতন হলে শিশুকালেই নারীরা শিকার হচ্ছে ধর্ষণের। হাটে-মাঠে-ঘাটে, সিনেমা হলে, বাড়িতে, খেলার মাঠে, গরু-ছাগল চরাতে গিয়ে, রান্নাঘরে, স্কুলঘরে, গার্মেন্টসে, পুকুরঘাটে, নদীরপাড়ে, পাতা কুড়াতে গিয়ে এমনকি দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাদ্রাসায়ও। প্রতারক প্রেমিক, স্বামী, স্বামীর বন্ধু, দেবর, গৃহশিক্ষক, পার্শ্ববর্তী কেউ কিংবা নিকট আত্মীয় দ্বারাও অনেক সময় নারীরা ধর্ষিত হয়ে নিকষ কালো কষ্টের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। ছাড় দেয়া হয় না ভিক্ষুক, বোবা, অসুস্থ, পাগল কিংবা প্রতিবন্ধী কোনো নারীকেও। এমনকি চার বছরের মেয়ে শিশুকেও। যার জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ভালো-মন্দ, মানুষ-অমানুষ কোনো কিছুই বোঝার ক্ষমতা তৈরি হয়নি। এ যেন ভেদবিচার ভুলে পশুর মতো তাদের বিকৃত লালসা পূরণ করতে পারলেই হয়। কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হয় না এ নরপশুদের। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বড় একটি অংশ জুড়েও ছিল নারী নির্যাতন, নারী হত্যা। ২৫ মার্চের কালো রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ছাত্রীদের নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যে নারী নির্যাতনের সূত্রপাত হয়, সে বর্বরতা যুদ্ধের শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অসংখ্য নারী হত্যাকারী তার হাতের রক্ত মুছে সমাজ দেহে স্বাভাবিকভাবে বহু সম্মান নিয়ে নির্দ্বিধায় বিচরণ করছে। বহু ধর্ষণকারী তার বিকৃত লালসা চরিতার্থ করে সমাজ দেহে খুব নাম-যশ নিয়ে মিশে গেছে। নারীদের নিয়ে সন্ত্রাস যেভাবে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, সেভাবে সমাজে এসব বিকৃত নারী মাংসলোভী শকুনরা অবাধে বিচরণ করছে, এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, পূর্ববর্তী একই ধরনের অন্যায়কারী সন্ত্রাসী, ধর্ষণকারী এবং হত্যাকারীরা আইনের ফাঁকফোঁকর গলিয়ে পিছলে গেছে বলেই সমাজদেহে নারীর ওপর সন্ত্রাসীরা দুষ্টক্ষতের মতো মারাত্মকভাবে বিস্তার লাভ করছে। এমনও কিছু নরপশু আছে, অসহায় নারীদের বিবাহের প্রলোভন এবং জিম্মি করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল শেষ হলে, এই নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে তাদের মোবাইলে গোপনে ধারণকৃত অশ্লীল দৃশ্যগুলো বাজারে ছেড়ে দেয়ার ভয় দেখায়। সাম্প্রতিক সময়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে এই বিকৃত পাশবিকতাও। প্রতিটি নারীর ওপরই থাকে হাজার বিধিনিষেধের বেড়াজাল। তা সত্ত্বেও নারীরাই পরিবারের উন্নয়নে অনেক বেশি ভূমিকা রাখে। প্রতিটি নারীর সংসার-ভূমণ্ডলেই তাকে পাড়ি দিতে হয় জীবনের অনেকগুলো আঁকাবাঁকা পথ। শিশু বয়সে পিতা-মাতার সঙ্গে, বিয়ে হলে শ্বশুরবাড়ির স্বামীর সংসারে, সর্বশেষ অনেক দুঃখ কষ্টে, কারো সুখে-শান্তিতে সন্তানের সংসারেই কেটে যায় জীবন। চলার পথে হাজার সমস্যার কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাঙালি নারীরা এসব নির্যাতন নাড়ি ছেঁড়া ধন সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অথবা মান-সম্মানের দিকে তাকিয়ে কেউ-কেউ মুখ বুজে সহ্য করে যাচ্ছে। আবার কেউবা আত্নহননের পথ বেছে নিচ্ছে। যারা সন্তানদের কারণে আত্মহত্যা করতে পারে না, তারা নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেলে আইনি সহায়তা নেয়। এতেও নির্যাতনের মাত্রা কমছে না বৈ আরো বেড়ে চলছে। শান্তিতে স্বস্তিতে নেই অনেক নারীই। নারী অধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তনের যেটুকু আভাস লক্ষ করা যায়, বাস্তবে এখন সেরকম পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি। নারীরা তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে বলা হলেও কিন্তু বাস্তবিক অর্থে তারা অনেক-অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত। সরকার নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষণা করলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতন এখন স্বাভাবিক সংবাদে পরিণত হয়েছে। কবে সমাজ দেহের এই ঘৃণ্য কালিমা দূর হবে? নারী নির্যাতন বন্ধে যে আইন আছে তার প্রয়োগ যেমন অতি জরুরি তেমনি আমরা যদি সুস্থ স্বাভাবিক সভ্য সমাজে বাস করতে চাই, তাহলে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এসব জঘন্যতম অপরাধীকে শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। চট্টগ্রাম