আমদানি কমিয়ে বাজারে ভোগ্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। পণ্য মজুদের শতশত গুদাম খালি পড়ে রয়েছে। মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে নিয়োজিত কয়েকশ লাইটারেজ জাহাজ কর্ণফুলী নদীতে অলসভাবে পড়ে রয়েছে। আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা জানান, হরতালসহ রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দেশে আরো কম দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। যার কারণে পণ্য আমদানি কমিয়ে দিয়েছে ব্যবসায়ীরা। বিক্রীত পণ্যের কোটি কোটি টাকা বাজারে বকেয়া পড়ে থাকায় অনেকেই ব্যাংকের ঋণ খেলাপি হয়েছে। ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ দিতে চাচ্ছে না। ফলে ভোগ্যপণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় সামনে বাজার আরো অস্থির হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
দেশে ভোগ্যপণ্যের মধ্যে সবগুলোই আমদানি নির্ভরশীল। সয়াবিন, চাল, ডাল, চিনি, মিল্ক পাউডার, গম, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, জিরা, এলাচিসহ এসব পণ্যের মোট চাহিদার বেশির ভাগই আমদানি করা হয়। হরতালে পণ্য খালাস ও পরিবহন বাধার কারণে বন্দর ও গুদামে আমদানিকৃত পণ্য আটকা পড়ে রয়েছে। বিক্রীত মালামাল ট্রান্সপোর্টের কারণে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে ব্যাংক ঋণের সুদ গুণতে গিয়ে পণ্যের আমদানি মূল্য বেড়ে যাচ্ছে। অথচ তার চেয়ে আরো কম দামে দেশের বাজারে পণ্য পাওয়া যাচ্ছে।
নগরীর বিভিন্ন স্থানে তিন শতাধিক পণ্য মজুদের গুদাম রয়েছে। আমদানি করা ভোগ্যপণ্য এসব গুদামে ভাড়ায় রাখা হয়। মাঝির ঘাটের প্রায় ১৭টি ঘাট দিয়ে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস হয়ে বিভিন্ন গুদামে চলে যায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৬/৭ মাস যাবত্ অধিকাংশ গুদাম খালি পড়ে রয়েছে। শ্রমিকেরা যেখানে দৈনিক ২ হাজার টাকা আয় করতো, পণ্য না থাকায় সেখানে ৫০০ টাকাও আয় করতে পারছে না। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ঠিকাদার ও কমিশন এজেন্ট এসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান নেয়াজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘গুদামগুলোর ৮০ শতাংশ খালি। আমদানি কমে যাওয়ায় গুদামে মাল নেই। মাঝির ঘাট এলাকায় পণ্য খালাসে ঘাটগুলোতে অস্থির হয়ে পড়েছে। এতে গুদাম মালিকদের বিপুল পরিমাণ লোকসান দিতে হচ্ছে।’
সূত্র জানায়, মাদার ভেসেল থেকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্য খালাস করা হয়। এই ধরনের প্রায় ৬০০ লাইটারেজ জাহাজ রয়েছে; কিন্তু আমদানি কমে যাওয়ায় জাহাজগুলো অলসভাবে পড়ে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে লাইটারেজ জাহাজ মালিকদের সংগঠন ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল জানায়, গত কয়েক মাস যাবত্ আমদানি কমে যাওয়ায় দৈনিক ১২ থেকে ১৫টির বেশি জাহাজের প্রয়োজন হয় না। এতে লাইটারেজ জাহাজ মালিকরাও লোকসানের শিকার হচ্ছে।
আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা জানান, গত এক বছর যাবত্ পণ্য আমদানিতে মন্দা অবস্থা বিরাজ করছে। চড়া দামে পণ্য আমদানির পর দেশীয় বাজারে দাম কমে যাওয়ায় প্রচুর আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে অনেক আমদানিকারক। এতে অনেকেই আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমদানিতে সংকট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমদানিকারক নূরুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘গত ২০১২ সাল থেকে পণ্য আমদানিতে মন্দা বিরাজ করছে। অনেক আমদানিকারক পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। ব্যাংকে ঋণপত্র খুলছে না। হরতালের কারণে পণ্য দিনের পর দিন জাহাজে পড়ে থাকায় ব্যাংক ঋণের সুদ বেড়ে যাচ্ছে। পণ্যের মূল্যও বেড়ে যাচ্ছে। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে মন্দার কারণে সামনে বাজার অস্থিরতা বেড়ে যেতে পারে।’ অন্যদিকে চাল আমদানিকারক এনামুল হক এনাম ইত্তেফাককে বলেন, চাল আমদানি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ। গত বছর দেশে চাল উত্পাদন ভাল হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দেশীয় বাজারে চালের দাম অনেক কম। তবে গত কয়েক মাস যাবত্ চালের মূল্য বস্তাপ্রতি (২ মণ) ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে। এই সুযোগে স্থল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে কিছু চাল আসছে।’
তবে আমদানি কমে যাওয়া প্রসঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে হাজী মীর আহমেদ এন্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী ও আমদানিকারক এমএ সালাম ইত্তেফাককে বলেন, আমদানি কমেছে বলে মনে হয় না। বাজারে প্রচুর সরবরাহ রয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দাম কমছে। তিনি আরো বলেন, ‘গত ২/৩ বছর আগে দেশে প্রচুর ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে। এসব পণ্য এখন ব্যবসায়ীরা বাজারে ছেড়ে দিচ্ছে। তাই পণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে।’ আমদানিতে স্থবিরতা নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও একই কথা বলছে।
