ওবামার মধ্যপ্রাচ্য সফর

ইসরাইলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৩, ২০:৩২
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবারের মতো ইসরাইল ও ফিলিস্তিন ভূখন্ড সফর করলেন। পূর্বসূরিদের মতোই গতানুগতিক কায়দায় তিনি ইসরাইলের নেতাদের সাথে সাক্ষাত্ করেন। জেরুজালেমে ইয়াদ ভেশেম মেমোরিয়ালে শ্রদ্ধা জানান হত্যাকাণ্ডের শিকার ইহুদীদের প্রতি। আর ঐতিহাসিক এলাকা ঘুরে দেখেন, যেন সেটাই ইহুদিদের প্রাচীন আবাসস্থল। ইসরাইলের প্রতি ওয়াশিংটনের অকুণ্ঠ ভালবাসার কথা জানিয়ে দৃপ্তকণ্ঠে তাই ইহুদী রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দাবি করেন ওবামা। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ওবামার সফর যে তেমন ভূমিকা রাখবে না, শুরু থেকেই বিশ্লেষকরা এমন আশঙ্কা করছিলেন। তিনদিনের সফরকালে ইসরাইলকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন এবং ইরানের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। আর ফিলিস্তিন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে বুঝিয়েছেন যে, তিনি ফিলিস্তিনীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা ভুলে যাননি। তবে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় পূর্বঘোষিত দ্বি-রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা অনুচ্চারিতই থেকে গেছে। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবার পর কায়রোতে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ায় ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি নেতাদের মধ্যে প্রত্যক্ষ আলোচনা শুরু করেছিলেন বারাক ওবামা। এরই মধ্যে দখলকৃত আরবভূমিতে বসতি নির্মাণ স্থগিত রাখার বাধ্যবাধকতার মেয়াদ শেষ হলে তা আর নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেয় ইসরাইল। শুরু হয় দ্রুত গতিতে বসতি নির্মাণের কাজ। অন্যদিকে, বসতি নির্মাণ বন্ধ করার দাবিতে শান্তি আলোচনা বয়কট করে ফিলিস্তিন। এরপর ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা আর ফিরে তাকাননি মধ্যপ্রাচ্যে। তার প্রথম মেয়াদে আরো দু’টি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। ইসরাইলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র মিসরে ইহুদী বিদ্বেষী কট্টরপন্থি মুসলিম ব্রাদারহুডের ক্ষমতায় আরোহণ এবং ভূমধ্যসাগরে ফিলিস্তিনীদের জন্য পাঠানো ত্রাণবাহী জাহাজে ইসরাইলের হামলা। ঐ হামলার পর ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে তুরস্ক। মধ্যপ্রাচ্যে একরকম বন্ধুহীন অবস্থায় ওবামা প্রশাসনের উপর সন্দেহ বাড়তে থাকে ইসরাইলের। তবে বলা দরকার, শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে দ্বি-রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসছিলো ইসরাইল। প্রেসিডেন্ট ওবামার ইসরাইল সফরকে বলা হচ্ছে প্রতীকী এবং বেশ ইঙ্গিতবাহী। বিশ্লেষকরা কেউ কেউ ওবামার মধ্যপ্রাচ্য সফরকে ব্যাখ্যা করছেন তার দ্বি-রাষ্ট্রীক সমাধান বাস্তবায়নে কতটুকু সফল হলেন, তার ভিত্তিতে। কূটনৈতিক বাচনভঙ্গি, শব্দ চয়ন ও বৈঠক বা সাক্ষাতের স্থায়িত্ব দিয়েও অনেকে বিষয়টি নানাভাবে ব্যাখ্যা করছেন। তারা বলছেন, ইসরাইলে প্রেসিডেন্ট ওবামার বক্তব্যে ছিলো স্বপ্নাবিষ্ট প্রাঞ্জল ভাষা। কিস্তু এর মূল কথা ছিলো অস্পষ্ট। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনীতি ব্যর্থ হওয়ায় দ্বিতীয় মেয়াদে এ ইস্যুতে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ওবামা প্রশাসন। পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাওয়ার আগে ওবামা তাই চেয়েছেন শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষীণ আশার আলো জিইয়ে রাখতে। আর তা করতে গিয়ে ইসরাইলের সব কৃতকর্মের প্রতি নিরব সমর্থনের পুরোনো ধারাবাহিকতাই বজায় রাখতে হয়েছে তাকে। কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, প্রেসিডেন্ট ওবামা ও নেতানিয়াহু দুইজন দুই দিকে চললেও ইসরাইল ও ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যগত সম্পর্কে এর কোন প্রভাব পড়বে না। ইসরাইলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানান, প্রেসিডেন্ট ওবামার সাথে বৈঠকের পরিবেশ যে কোন সময়ের তুলনায় ভাল ছিলো। হোয়াইট হাউজও জানায়, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা যতটুকু সময় কথা বলেছেন, বিশ্বের অন্য কোন নেতা এ যাবত্কাল এমন সুযোগ পায়নি। তাদের বৈঠকের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিলো ইরান। তেহরান যাতে কোনমতেই পরমাণু বোমা হাতের নাগালে না পায়। বুধবার তেলআবিবে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, ওবামার কথায় তিনি পুরোপুরি আশ্বস্ত। এমন মন্তব্যকে ‘খুবই অর্থবহ’ ও ‘শক্তিশালী বিবৃতি’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। জেরুজালেমের শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যামোজ আসায়েলের মতে, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে প্রায় পূর্ণাঙ্গ বোঝাপড়া হয়েছে বলেই মনে হয়। বিশেষ করে, আগামী জুন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করার ব্যাপারে তারা একমত। অ্যামোজ আসায়েল বলেন, জুনে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক অভ্যুত্থান ঘটার অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল। আর তেমনটি হলে এর সুবিধা নিতে ছাড়বে না এ দুই দেশ। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃৃদ্ধকরণ মাত্রার উপর নির্ভর করে একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। যাকে বলা হচ্ছিল ‘রেড লাইন’। ঐ সময়সীমার মধ্যে তেহরান তার কাঙ্ক্ষিত কর্মসূচি থেকে সরে না আসলে একতরফা হামলা চালানোর ঘোষণাও দিয়েছিলো ইসরাইল। তবে ইসরাইলের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা গিওরা এইল্যান্ডের মতে, তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ হয়তো এখন এতো সহজ হবে না। কেননা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল নিজেই এখন অনেকটা একঘরে। নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে ইসরাইলের স্বার্থে তুরস্ককে আবারো কাছে পাওয়া খুবই প্রয়োজন। এমন প্রয়োজনীয়তা থেকেই প্রেসিডেন্ট ওবামা টেলিফোনে নেতানিয়াহুকে তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তায়েপ এরদোগানের সাথে কথা বলিয়ে সমঝোতা করে দেন। এর পরপরই আত্মম্ভরিতা ভুলে ২০১০ সালে তুর্কি জাহাজে হামলার ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায় ইসরাইল। এর মাধ্যমে স্বল্প পরিশ্রমে অপ্রত্যাশিতভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় তুর্কি-ইসরাইল কূটনৈতিক সম্পর্ক। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনা আবারো কীভাবে শুরু করা যায়, তেমন নতুন কোন প্রস্তাব নিয়ে ইসরাইলে যাননি প্রেসিডেন্ট ওবামা। তবে বৃহস্পতিবার ইহুদী ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ওবামা বলেন, শান্তি চুক্তি না হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে ইসরাইলের একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ইহুদি বসতি স্থাপন বন্ধ করার কথাও বলেন তিনি। ‘ইহুদি বসতি স্থাপন শান্তির অন্তরায়’ এমন সাদামাটা বক্তৃতাকে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস স্বাগত জানালেও পিএলও নেতা ওয়াসেল আবু ইউসুফের মতে, সমস্যার সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র কত কম আন্তরিক, তার প্রমাণ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। তেল-আবিবের থিংক ট্যাঙ্ক রিউট ইনস্টিটিউটের প্রধান গিডি গ্রিনস্টেইনের মতে, ইসরাইল ও ফিলিস্তিনকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রচেষ্টার যুগ শেষ। তাই মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধান নয়, বরং তা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারেই ওয়াশিংটন বেশি আগ্রহী।