লেখা মুস্তাফিজ মামুন
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরব, আমাদের অহংকার। একসাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল এ স্বাধীনতা। এটা স্বাধীনতার মাস। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আর নানান স্থাপনা। চলুন ঘুরে আসি এসব জায়গা থেকে
অপরাজেয় বাংলা
মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ঐতিহ্যের প্রতীক বলা হয় অপরাজেয় বাংলাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে এ ভাস্কর্যটির অবস্থান। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলার নারী-পুরুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং বিজয়ের প্রতীক এই ভাস্কর্য। এর নির্মাতা মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ। অপরাজেয় বাংলার তিনটি মূর্তির সর্বডানে প্রত্যয়ী এক যোদ্ধা নারীর মূর্তি। এর পাশে কাঁধে রাইফেল, ডান হাতে দৃঢ় প্রত্যয়ে রাইফেলের বেল্ট ধরা এক যুবক যোদ্ধা। অন্যটির চোখে-মুখে স্বাধীনতার দীপ্ত চেতনা, হাতে রাইফেল। ১৯৭২-৭৩ সালে ডাকসুর উদ্যোগে অপরাজেয় বাংলার কাজ শুরু হয়। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এর নির্মাণ কাজ বন্ধ থাকে। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসে পুনরায় আবার কাজ শুরু হয়। নির্মাণ শেষে একই বছর ১৬ ডিসেম্বর ভাস্কর্যটির উদ্বোধন হয়। ৬ ফুট বেদির ওপরে নির্মিত এ ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট আর প্রস্থ ৮ ফুট।
স্বোপার্জিত স্বাধীনতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি পশ্চিম পাশে সড়ক দ্বীপে ডাসের পেছনে এ ভাস্কর্যটির অবস্থান। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এ ভাস্কর্যের মাধ্যমে। ৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার আর নিপীড়নের চিত্রও ফুটে উঠেছে এ ভাস্কর্যে। এর নির্মাতা ভাস্কর শামীম সিকদার। এতে তার সহকর্মী ছিলেন শিল্পী হিমাংশু রায়। ১৯৮৭ সালে কাজ শুরু হয় এ ভাস্কর্যের। এক বছর পরে ১৯৮৮ সালের ২৫ মার্চে এটির উদ্বোধন হয়। চার কোনাকৃতির একটি বেদির উপর মূল ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছে। পুরো ভাস্কর্যজুড়ে খচিত আছে স্বাধীনতাযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনার চিত্র।
স্বাধীনতার সংগ্রাম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে ব্রিটিশ কাউন্সিল ছাড়িয়ে সামান্য দক্ষিণে সড়ক দ্বীপে ছড়ানো অনেকগুলো ভাস্কর্য। এখানে ২৫ ফুট উঁচু বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের প্রতিকৃতি ছাড়াও আছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বাউল সম্রাট লালন শাহ, মরমী কবি হাছন রাজার মতো অনেক বরেণ্য ব্যক্তির ছোট ছোট ভাস্কর্য। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনেরও একটি ভাস্কর্য আছে এখানে। এগুলোরও শিল্পী ভাস্কর শামীম সিকদার।
রমনা রেসকোর্স
বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত রমনা রেসকোর্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে। হাইকোর্ট থেকে শাহবাগমুখি সড়ক ধরে চললে এর প্রধান ফটকের হদিস মিলবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের পূর্বপাশেও এর আরেকটি প্রবেশপথ আছে।
১৮২৫ সালে ঢাকার ব্রিটিশ কালেক্টরেট মি. ডয়েস জঙ্গলাকীর্ণ রমনা রেসকোর্স পরিষ্কার করে রমনা কালী মন্দির ছাড়া এখানকার সব স্থাপনাই সরিয়ে ফেলেন। ঢাকা শহরের অন্যতম পুরোনো এ মন্দিরটি ভাওয়ালের রানি বিলাসমণি দেবী সংস্কার করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাক হানাদার বাহিনী মন্দিরটি ধ্বংস করে ফেলে। ঢাকার নবাবদের কাছে ঘোরদৌড় খুবই প্রিয় ছিল। নবাবরা তাই রেসকোর্স এলাকার উন্নয়ন করে এখানে সুন্দর একটি বাগান তৈরি করে এর নাম দেন শাহবাগ।
১৯৬৯ সালে বাঙালির অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলনরত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে মুক্তি পেলে তাকে এখানেই সংবর্ধনা দেওয়া হয়। রমনা মাঠের এ সমাবেশেই ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয় তাকে। আবার ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনার এই রেসকোর্সের মহাসমাবেশেই বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণটি দেন। নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী এখানেই নতি স্বীকার করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ এ মাঠের এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু এবং ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভাষণ দেন। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।
বর্তমানে এ এলাকাটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের পর এক বিনোদনের উদ্যানে রূপ দেওয়া হয়। পার্কের একাংশে স্থাপন করা হয় ঢাকা শিশু পার্ক। পরে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি স্মরণীয় করে রাখতে এখানে স্থাপন করা হয় ‘শিখা চিরন্তন’। পাকবাহিনী ১৯৭১ সালে যে জায়গাটিতে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেছিল সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
বাংলাদেশের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত নিদর্শন ও স্মারকচিহ্নসমূহ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্য ১৯৯৬ সনের ২২ মার্চ ঢাকা শহরের সেগুনবাগিচার একটি পুরোনো দ্বিতল বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য, প্রমাণাদি, নিদর্শন, রেকর্ডপত্র ইত্যাদি সংগ্রহ করে এখানে রাখা হয়। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ছয়টি গ্যালারি রয়েছে। প্রথম গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়েছে বাঙালির ঐতিহ্যের পরিচয় এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চিহ্ন। দ্বিতীয় গ্যালারিতে ১৯৪৭-এর দেশভাগ-পরবর্তী পাকিস্তানি শাসন-শোষণের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। তৃতীয় গ্যালিরিতে প্রদর্শিত হয়েছে একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন, ২৫ মার্চ সংঘটিত গণহত্যা, স্বাধীনতার ঘোষণা, প্রতিরোধ ও শরণার্থীদের জীবনচিত্র। দোতলার তিনটি গ্যালারিতে রয়েছে প্রতিরোধ ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক, পাকিস্তান সেনা ও তাদের দোসরদের বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং বাঙালির বিজয় দৃশ্য। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বিশ্বের অপরাপর আটটি দেশের সমভাবাপন্ন জাদুঘরের সঙ্গে মিলে গঠন করেছে ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন অব হিস্টিরিক সাইট মিউজিয়ামস অব কনসান্স। এ জাদুঘরের সংগৃহীত স্মারক সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি।
বঙ্গবন্ধু জাদুঘর
ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিধন্য বাড়িটি এখন জাদুঘর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের হাতে নির্মমভাবে নিহত হবার আগ পর্যন্ত এ বাড়িতেই বাস করতেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়ক বঙ্গবন্ধু। এ বাড়িটিকে রূপান্তরিত করা হয়েছে জাদুঘরে। এখানে সংরক্ষিত আছে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের নানান স্মৃতি, ব্যবহূত বিভিন্ন জিনিস। বাড়িটির দেয়ালে দেয়ালে বুলেটের দাগ। দর্শনার্থী ধারণা পাবেন ১৫ আগস্টের সেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কেও। বঙ্গবন্ধুর গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ সিঁড়ির যেখানে পড়েছিল সেখানে পুরনো রক্তের চিহ্ন অবশ্য প্রায় অদৃশ্য। স্থানটি এখন কাঁচ দিয়ে ঢাকা। বুধবার এবং সরকারি ছুটি ছাড়া প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জাদুঘরটি খোলা থাকে।
জল্লাদখানা বধ্যভূমি
মিরপুর দশ নম্বর থেকে এগারো নম্বরের দিকে কিছুটা গেলেই বেনারসি পল্লীর সড়ক ধরে সোজা পূবদিকে শেষ মাথায় জল্লাদখানা বধ্যভূমি। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ এলাকাটি ছিল প্রায় জনমানবহীন নিরব। হানাদারের দোসররা তাই এ জায়গাটিকেই বেছে নেয় মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার জন্য। সেসময়ে এখানে ছিল পরিত্যক্ত একটি পাম্প হাউস। ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এখানকার দুটি কূপের একটিতে ফেলা হতো খণ্ডিত মস্তক এবং অন্যটিতে ফেলা হতো দেহাবশেষ। ১৯৯৯ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় এর খনন কাজ শুরু হয়। সে সময়ে পরিত্যক্ত পাম্প হাউসের কূপ থেকে ৭০টি মাথার খুলি এবং ৫৩৯২টি হাড় উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়াও উদ্ধার করা হয় মেয়েদের শাড়ি, ফ্রক, ওড়না, অলঙ্কার, জুতা, তসবিসহ শহীদদের ব্যবহার্য নানা জিনিসপত্র। জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে একটি জাদুঘর নির্মাণ করে কিছু নিদর্শন রাখা হয়েছে প্রদর্শনের জন্য। পাম্প হাউসের অভিশপ্ত কূপটি বাঁধাই করে কাচ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে নৃশংসতার চিহ্ন হিসেবে। আর এখানে ‘জীবন অবিনশ্বর’ নামে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বর্বর হত্যাকাণ্ডের স্মরণে।
বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ
ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত শহীদ বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধ। মিরপুর ১ নম্বরের মাজার থেকে গাবতলীমুখি সড়কে সামান্য এগোলেই পশ্চিম পাশে বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে এটি অবস্থিত। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনী রাজাকার আলবদরদের সহায়তায় এ দেশের সূর্য সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নির্বিচারে হত্যা করে। তাদের স্মরণে ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর মিরপুরে এ স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়াও বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এলাকায় রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান এবং বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমানের সমাধি।
রায়ের বাজার বধ্যভূমি
ঢাকা শহরের পশ্চিমে মোহাম্মদপুরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশেই শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ অবস্থিত। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর দেশের প্রখ্যাত সন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করে এই স্থানের পরিত্যক্ত ইটের ভাটার পাশ্চাত্যের জলাশয়ে ফেলে রাখা হয়েছিল। এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ইটের ভাটার আদলে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। এই স্মৃতিসৌধে লাল ইট ও সিমেন্টের গাঁথুনির প্রাধান্যই বেশি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় খোলা আকাশের নিচে সৌধের একমাত্র দেয়ালটি নির্ভীক প্রহরীর মতো মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। এর স্থপতি ফরিদ উদ্দীন আহমেদ।
আলোকচিত্র : www.bengalpixbd.com
