(পূর্ব প্রকাশের পর)
মুহাম্মদ (স.)কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা পৃথিবীর সবচেয়ে উত্কৃষ্ট মজিজা দান করেছেন। যার মাধ্যমে মক্কার অবিশ্বাসীরা বারবার হতবাক হতভম্ব স্তম্ভিত হয়েছে মনের অজান্তে। আর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠতম পয়গম্বর মুহাম্মদ (স.) প্রত্যেকটি প্রতিকূল বিপদসংকুল পরিবেশ থেকে রক্ষা পেয়েছেন সম্মানের সঙ্গে। একদিন রসূলের চাচা আবু লাহাব দেখলো মরুভূমির মধ্যদিয়ে মুহাম্মদ (স.) আসছেন। সে পায়ের কাছ থেকে একখণ্ড পাথর নিলো। হাতের মুঠিতে সেটা ভরে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছিল। এক সময় মুহাম্মদ (স.) এর কাছে চলে এলো এবং বললো মুহাম্মদ, আমার হাতের মুঠায় কি আছে? বলতে পারলে তোমার নবুওয়াত বিশাস করবো। রসূল (স.) গায়েব জানতেন না। তিনি আমাদের মত রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন। কোনো মানুষই গায়েব জানেন না। আল্লাহর ফেরেশতা সায়্যেদুল মালাইকা হযরত জিব্রাইল (আ.) আসলেন এবং বললেন, হে রসূল (স.), আবু লাহাবের হাতের মুঠায় রয়েছে একখণ্ড পাথর, ওটা আপনার নির্দেশে কালিমাও পড়বে। রসূল (স.) বললেন, আবু লাহাব তোমার হাতের মধ্যে কি আছে সেটা আসল বিষয় নয়, তোমার হাতের মধ্যে যা আছে সেই যদি আমার নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ সম্বলিত কালিমা পাঠ করে তাহলে কি তুমি ঈমান আনবে? আবু লাহাব মুচকি হাসলো আর ভাবতে থাকলো আমার হাতের মুঠায়তো রয়েছে একখণ্ড পাথর। পাথরে তো কথা বলতে পারে না। হ্যাঁ মুহাম্মদ, আমার হাতের মধ্যে যা রয়েছে তা যদি তোমার নবুওয়াতের সাক্ষ্য দেয় তাহলে অবশ্যই আমি তোমার নবুওয়াত বিশাস করবো। এই কথা বলা মাত্র রসূল (স.) আবু লাহাবের হাতের দিকে ইশারা করলেন। তখন হাতের মধ্যের ঐ পাথর ‘লা ইলা হা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ (স.)’ এই ঘোষণা দিল। তখন আবু লাহাব বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল এবং বলল, মুহাম্মদ তুমি যে সত্যিই জাদুকর তার প্রমাণ পেলাম। রসূল (স.) ও মুসলমানদের যখন মক্কার কাফেরেরা শিবে আবু তালিবে বন্দী রাখেন তখন কাফেরদের সেই বন্দী চুক্তির দলিল-দস্তাবেজ পোকায় খেয়ে ফেললে রসূলের এক সাহাবী তা স্বপ্নে দেখেন। এর পরে ঐ স্থানে গিয়ে দেখা গেলো সত্যিই ঐ দলিল পোকায় খেয়ে ফেলেছে। তখন মুসলমানেরা বন্দী জীবন থেকে মুক্তি পায়। রসূলের অন্যতম মুজিজা হলো আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং তাকে আল কুরআন মুখস্ত করিয়ে দিয়েছেন। ছানুকরিউকা ফালা তানছা অর্থাত্ আমি আপনাকে পড়াতে থাকবো; আপনি কখনোই ভুলে যাবেন না। আর কাফেরদের জুলুম নির্যাতন থেকে তাকে হেফাজতের আশ্বাসবাণী শুনানো হয়েছে। যা অন্য কোনো নবী-রসূলদের ক্ষেত্রে হয়নি। বলা হয়েছে— “আল্লাহু ইয়াছিমুকা মিনান নাছ,” আমি তোমাকে কাফের মুশরিকদের অত্যাচার থেকে বাঁচিয়ে দেবো। তখন রসূল (স.) নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্তে ইসলামের সমুহান দাওয়াত শুরু করলেন। পোষ্যপুত্র জায়েদ বিন হারেসাকে সঙ্গে করে নিয়ে মক্কা থেকে ১২০ মাইল দূরে তায়েফে ইসলামের দাওয়াত প্রদানের জন্য আগমন করলেন। সেখানের মানুষেরা তাকে কেউ বিশ্বাস করতে চাচ্ছিলেন না। তিনি দশদিন ইসলামের দাওয়াত দিলেন। শেষ পর্যন্ত তায়েফের মানুষেরা দুষ্ট বালকদের লেলিয়ে দিলো। আর ঐ দুষ্ট বালকেরা নবীজীকে এতো পরিমাণ প্রহার করলো যে, সমস্ত শরীর রক্তাক্ত হয়ে রসূল (স.) মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। বেহুশ হয়ে গেলেন। শরীরের রক্তে পাদুকা জমাট বেঁধে গেলো। জায়েদকেও মারপিট করলো। তিনিও রক্তাক্ত জখম হলেন। রসূল (স.) দীর্ঘ সময় পরে যখন জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন সম্মুখে জিব্রাইল (আ.)কে দেখলেন। তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ (স.), হুকুম করুন—সমগ্র তায়েফবাসীকে জমিন উল্টিয়ে ধ্বংস করে দিয়ে যাই। রসূল (স.) বললেন, হে জিব্রাইল, কারো ধ্বংস করার জন্য আমি এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হইনি, বরং সবার মাঝে তাওহীদের বীজ বপন করার জন্য আমি এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছি। হয়তো তারা না বুঝে আমার ওপর অত্যাচার করেছে। কিন্তু তাদের পরবর্তী বংশধর হয়তো আমাকে চিনবে এবং আমার দাওয়াত কবুল করে মুসলমান হয়ে যাবে।” রসূল (স.) এর হিজরতের প্রাক্কালেও একটি মুজিজা প্রদর্শিত হয়েছিল। যা সমগ্র বিশ্বকে হতবাক না করে পারে নাই। আরবের বিভিন্ন গোত্র হতে শক্তিমান যুবকেরা নাঙ্গা তরবারী নিয়ে রসূলের বাড়ীর চতুষ্পার্শে অবস্থান করছিল। রসূল (স.) যখন গেট দিয়ে বের হবেন তখন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা বললেন, হে রসূল (স.) এক মুষ্টি বালু নিন এবং তা নিক্ষেপ করুন। রসূল (স.) তাই করলেন। আর সেগুলো মুহূর্তের মধ্যে সকল কাফেরের চোখে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। কুরআনে বলা হয়েছে “অমা রমাইতা ইজ রমাইতা অলা কিন্নাল্লাহা রমা” অর্থাত্ হিজরতের প্রাক্কালে যে বালু বা কংকর আপনি নিক্ষেপ করেছিলেন তা আপনি নিক্ষেপ করেছিলেন মাত্র কিন্তু তা কাফের মুশরেকদের চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। এর পরে যখন সওর পর্বতের গুহায় ঢুকেন তখনও ঠিক এরকম একটি মুজিজার অবতারণা হয়েছিল। রসূল (স.) ও আবু বকর (রা.) ঐ গুহায় ঢোকার পরে আবু বকরকে (রা.) সাপে দংশন করেছিল তখন রসূল-এর মুখের লালা লাগানোতে বিষ চলে যায়। পরবর্তীতে যখন কাফেরেরা অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গুহার সন্নিকটে অগ্রসর হচ্ছিল তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা গুহার মুখে মাকড়শা দিয়ে জাল তৈরি করে দেন। কবুতর পাঠিয়ে দেন যে ডিম পেড়ে তাও দিতে থাকে। কাফেরেরা যখন গুহার কাছে আসে তখন একজন বললেন, দেখ দেখ, এই গুহাটিও দেখ। অন্যজন বললো, প্রয়োজন নাই। কারণ যে গুহার মুখে অবিচ্ছিন্ন মাকড়শার জাল সেখানে কোনো মানুষ থাকতে পারে না। আর যদি ঐ গুহায় মানুষ থাকতোই তাহলে গুহার মুখে কবুতরের বসে থাকার কথা নয়। তখন সবাই অন্য দিকে চলে যায়। কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, “ইজহুমা ফিল গারে ইজ ইয়াকুলু লিসাহিবিহি লা তাহঝান ইন্নাল্লাহা মাআনা” অর্থাত্ যখন আপনারা (আবু বকর (রা.) ও রসূল (স.) গুহার মধ্যে ছিলেন তখন আপনার সাহাবী আপনাকে বলছিলেন যে, ঐ দেখুন শত্রু বাহিনী আমাদের ধরে ফেললো, সেই সময় আপনি (রসূল স.) সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ভয় পেয়ো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। তারপর আল্লাহ তায়ালাই তোমাদের সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। এই গুহায় তিনদিন তিনরাত থাকার পর মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। হিজরতের সফরে আরো সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার সময় মক্কার একজন অন্যতম সন্ত্রাসী ডাকাত প্রকৃতির বেদুঈন যুবক সুরাকা বিন মালেক মুহাম্মদ (স.) এর হিজরতের কাফেলার সন্ধান পেলো কারো মাধ্যমে। এরপর নাঙ্গা তরবারী নিয়ে রসূল (স.)কে হত্যা করার মানসে ঘোড়ায় সওয়ার হলো। মরুভূমির মধ্য দিয়ে রসূল (স.) ও আবুবকর যাচ্ছিলেন। দূর থেকে সুরাকা রসূল (স.) ও আবু বকরকে দেখতে পেলো। মনে মনে আশান্বিত হলো, ঐতো শিকার। আর একটু সামনে গিয়েই তাকে হত্যা করবো এবং একশত উট পুরস্কার নেবো। যখন নিকটবর্তী হলো আবু বকর (রা.) বললেন, হে রসূল (স.) ঐ দেখুন সশস্ত্র শত্রু আমাদের ধরে ফেললো। রসূল (স.) বললেন, ভয় পেয়ো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। এরপর সুরাকা বিন মালেক কাছে এলে সুরাকার ঘোড়া একটি বড় পাথরে এমন জোরে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল যে, ঘোড়া বালুর মধ্যে গড়াগড়ি খেলো আর সুরাকা তো বহুদূরে সিটকে পড়লো। কিন্তু পুরস্কারের নেশা তাকে ছাড়লো না। আবারো ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে মুহাম্মদ (স.) এর কাফেলার একবারে কাছে পৌঁছে গেলো। তখন সুরাকার ঘোড়ার চারটা পা মরুভূমির বালুর মধ্যে এমনভাবে ডেবে গেলো যে, সেখান থেকে আর উঠতে পারছিলো না। ফ্যালফ্যাল করে রসূলের দিকে তাকিয়ে ছিলো। রসূল (স.) সুরাকার এই অবস্থা দেখছিলেন—একবার তার ঘোড়া পাথরে হোচট খায়। একবার বালুর মধ্যে ঘোড়ার পা ডেবে যায়। রসূল (স.) সুরাকার কাছে এসে বললেন, সুরাকা এখনো কি তোর বিশ্বাস হয় না যে, আমি আল্লাহর সত্য নবী? সুরাকা বললেন, এখন বিশ্বাস হয়েছে যে, আপনি আল্লাহর নবী। রসূল (স.) বললেন, তাহলে ঘোষণা দাও, কালিমা পড়। মুসলমান হয়ে যাও। সুরাকা কালিমা পড়ে মসলমান হয়ে যায়। এরপর সে বলে, হে রসূল (স.), আপনাকে হত্যা করতে পারলে একশত উট পুরস্কার পেতাম। এখন হত্যা না করায় কিছুই পেলাম না, সেই জন্য আপনি আমাকে কি কিছু দেবেন না? রসূল (স.) বললেন, তোমাকে রোম সম্রাটের হাতের বালা ও মাথার মুকুট দান করা হবে। রসূলের (স.) ইন্তেকালের পর আবু বকর (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব নেন। তার ইন্তেকালের পর দ্বিতীয় খলিফা হন হযরত ওমর। সে সময় ইসলামের কালজয়ী আদর্শের মহিমা ইন্দোনেশিয়ার যাকার্তা থেকে মরক্কোর রাবাত পর্যন্ত অর্ধেকটা দুনিয়া ছড়িয়ে পড়ে। তখন তাঁর সেনাপতি আমর বিন আস রোম বিজয় করেন সেই সঙ্গে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়ার্সের মাথার মুকুট ও হাতের বালা গনিমতের মালের সঙ্গে চলে আসে। সে সময় খলিফা ওমর (রা.) গনিমার মাল বন্টন শেষে এই দুটি বস্তু রেখে দেন এবং সুরাকাকে ডেকে লোক পাঠান। সুরাকা তখন বৃদ্ধ মানুষ। লাঠি ভর দিয়ে আমীরুল মো’মেনীনের দরবারে যখন আসেন। তখন হযরত ওমর (রা.) রোম সম্রাটের মাথার মুকুট ও হাতের বালা সুরাকার মাথায় ও হাতে পরিয়ে দিয়ে বলেন, সুরাকা, বিশ্বনবীর ভবিষ্যদ্বাণী কোনো দিন মিথ্যা হতে পারে না। (চলবে)
ই-মেইল: [email protected]
