বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহতায়ালা সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা দিয়েছেন। এই স্বাধীনতাকে কোন্ খাতে প্রয়োগ করলে পার্থিব শান্তি ও পরকালীন মুক্তি পাওয়া যাবে তাও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু মানুষ প্রায়ই আল্লাহকে ভুলে যায়। ফলে মানব প্রকৃতি হয়ে ওঠে স্বেচ্ছাচারী। নীতি-নৈতিকতা পরিত্যক্ত হয়। শঠতা, প্রতারণা, দুর্নীতি ইত্যাদি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে। রাজনৈতিক জুলুম, অর্থনৈতিক শোষণ, সামাজিক ভেদাভেদ, সাংস্কৃতিক নোংরামি ও অশ্লীলতা, পাপ-পংকিলতা এবং মানবাধিকার দলন অগণিত মানুষের জীবন থেকে শান্তি কেড়ে নেয়। বঞ্চিত মানুষ অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি পেতে চাইলে আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল (স.) প্রদর্শিত পথের কোন বিকল্প নেই। শান্তি কাকে বলে? শান্তি বলতে বুঝায়—স্থিরতা, প্রশান্তি, দুশ্চিন্তাহীনতা, হিংসা-মারামারি ও শত্রুতা না থাকা ইত্যাদি। ইংরেজিতে শান্তিকে বলা যেতে পারে- Peace, absence of passion, satisfaction, gratification, welfare, prosperity, comfort, happiness ইত্যাদি। ইসলাম শব্দের এক অর্থ শান্তিঃ ‘ইসলাম’ পরিভাষার মূল শব্দ হলো ‘সিলমুন’ বা সিন, লাম, মীম। ‘সিন’ দ্বারা ‘সালামত’ বা সুস্থতা, শান্তি, স্বস্তি, শালীনতা ইত্যাদি বোঝায়। ‘লাম’ দ্বারা ‘লিনাত’ বা নম্রতা, ভদ্রতা, বিনয়, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য ইত্যাদি বোঝায়। আর ‘মীম’ দ্বারা বোঝায় ভালবাসা, সম্প্রীতি, প্রেম-প্রীতি ইত্যাদি। কাজেই ‘ইসলাম’ শব্দের মাঝেই লুকিয়ে আছে শান্তি, স্বস্তি, সুস্থতা, সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য, নম্রতা, বিনয়, পারস্পরিক ভালবাসা, সম্প্রীতি ইত্যাদি মানবীয় গুণ, যা মানুষকে প্রকৃত ‘মানুষ’ হতে শেখায়। (৭) কাজেই ইসলাম নিঃসন্দেহে শান্তির ধর্ম। ইসলাম শান্তি এ অর্থে যে, ‘ইসলামহীনতাই অশান্তি।’ মানবাধিকার বলতে সেই অধিকারকে বোঝায় যা নিয়ে মানুষ জন্মায় এবং যা তাকে বিশিষ্টতা দেয় এবং যা হরণ করলে সে আর মনুষ্যত্ব নিয়ে টিকে থাকতে পারে না। বিশ্বরাজনীতিতে অত্যন্ত তাত্পর্যের সাথে আলোচিত Fundamental Rights, Basic, Human Rights, Birth Rights of Man -এ জনপ্রিয় শব্দগুচ্ছ প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকারের অর্থেই ব্যবহূত হয়। (মানবাধিকার ভাষ্য, গাজী শামছুর রহমান, পৃ-১১) রাসূলুল্লাহ (স.) -এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত মদিনা রিপাবলিকে ৬২২ ঈসায়ী সনে প্রণীত ৪৭টি শর্ত সম্বলিত ‘মদিনা সনদ’ বা Charter of Madina— ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান (First written constitution of the world)। এ সনদে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অধিকার ও মর্যাদার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। খ্রিস্টান, ইহুদি, পৌত্তলিক ও মুসলিম সমভিব্যাহারে গঠিত মদিনার বহু ধর্মভিত্তিক সমাজে প্রণীত উক্ত সনদে উল্লেখ ছিল— ‘মদিনায় ইহুদি, নাসারা (খৃষ্টান), পৌত্তলিক এবং মুসলিম সকলেই এক দেশবাসী, সকলেরই নাগরিক অধিকার সমান’ (বিশ্বনবী-গোলাম মোস্তফা)। সমানাধিকারের ভিত্তিতে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পৃথিবীর বুকে এটিই ছিল প্রথম। পাশ্চাত্যের মানবাধিকার সংক্রান্ত চিন্তা-চেতনা পরিবর্তনশীল সংকীর্ণ, পক্ষপাত দোষে দুষ্ট এবং তা প্রামান্য বা দলীলভিত্তিক নয়। অপরদিকে ইসলামের মানবাধিকার সংক্রান্ত আইন অসংশোধনযোগ্য, সার্বজনীন, প্রামাণ্য ও দলীলভিত্তিক এবং পক্ষপাতহীন। কাজেই, ইসলামই গোঁড়ামী পরিহার করে সহনশীলতা, ধীর-স্থিরতা, উদারতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ অবদান রাখতে পারে। আল কুরআন বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অনন্য গাইড বুক। ইসলাম শোষণ-বঞ্চনা দূর করে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ বিষয়ে আল কুরআনের নির্দেশ হলো-দুষ্টকে দমন করে শিষ্টের লালন করতে হবে। অর্থাত্, সত্ ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা দান করতে হবে এবং অপরাধী ও অসত্ লোকদের অন্যায় ও অবিচারকে প্রতিহত করতে হবে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম নির্দেশিত মৌলিক ৪টি দায়িত্ব সম্পর্কে আল কুরআন ঘোষণা করেছে ‘যদি আমি তাদের (বা মুসলমানদের) কে কোন ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠা দান করি তাহলে তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করে ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করে। সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারে।’ (২২/সূরা আল হাজ্জঃ ৪১) অর্থাত্, কুরআন নির্দেশিত দায়িত্বগুলো হলোঃ ১. সচ্চরিত্র জাতি গঠনের জন্য নামায প্রতিষ্ঠিত করা (২৯/সূরা আনকাবুত-৪৫ দ্রষ্টব্য) ২. ন্যায়বিচারপূর্ণ অর্থব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে যাকাত আদায়ের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা (৯/তাওবা-৬০) ৩. জনকল্যাণমূলক সকল কাজ চালু করা এবং ৪. অনিষ্টকর সকল কাজ বন্ধ করা। আল্লাহপাক যে বিধান আল কুরআনের মাধ্যমে দিয়েছেন আল্লাহর দৃষ্টিতে তা প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম করাই একজন প্রকৃত শান্তিকামী মানুষের পরিচয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলামঃ ইসলামে নিছক নেতার পরিবর্তন কামনা করে না। নেতা পরিবর্তন করার মধ্যে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ জড়িত। ইসলামের লক্ষ্য হলো নীতির পরিবর্তন করা। ইসলামের মূল চাওয়া হচ্ছে, সব মানুষ আল্লাহর গোলাম হয়ে যাক, মানুষ যেন একে-অপরের গোলামী না করে। তাইতো আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রেখ, তাঁরই কাজ সৃষ্টি করা ও আদেশ দান করা (৭/সূরা আরাফ-৫৪)। (চলবে)
