মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান ক্রমেই বাড়ছে। তবে বাজার থেকে ডলার কিনে নিয়ে কৃত্রিমভাবে টাকার মান কমিয়ে রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। টাকার মান বাড়ায় আমদানিকারকরা কিছু সুবিধা পেলেও রপ্তানিকারকরা লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। সাথে সাথে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে বৈদেশিক মূদ্রা পাঠান তারাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। টাকার সাথে ডলারের মান সামঞ্জস্য রাখতে গত আট মাসে বাজার থেকে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার ডলার কিনে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রপ্তানিকারকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত একবছরে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম তিন শতাংশের বেশি কমেছে। রপ্তানি আয়ের হিসাব করলে এখাতে রপ্তানিকারকরা একমাসে লোকসান দিয়েছেন ৩২০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করে টাকা শক্তিশালী হতে দিচ্ছে না। টাকার মান বেড়ে যাওয়ায় যেসব রপ্তানিকারক কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য রপ্তানি করেন তাদের লোকসান কম হলেও পণ্য রপ্তানিতে শতভাগ দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহারকারীদের লোকসান হচ্ছে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কেনায় বাজারে ডলারের দাম প্রত্যাশানুযায়ী কমছে না। গতকাল আন্ত:ব্যাংকে প্রতি ডলার লেনদেন হয়েছে ৭৮ টাকা ২২ পয়সা। ডলার না কিনলে বাজারে ডলারের দর আরো পড়ে যেতো বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত জুলাই থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত ৮ মাস ২৫ দিনে বাংলাদেশ ব্যাংক ৩৫০ কোটি ডলার কিনেছে।
একসময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও এখন তা আর করা যায় না। ২০০৩ সাল থেকে বাজারে ভাসমান মুদ্রা বিনিময় হার বা ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট চালু আছে। এ ব্যবস্থায় বাজারে চাহিদা এবং যোগানের ভিত্তিতে ডলারের দাম আপনা আপনিই নির্ধারিত হয়ে যায়। তবে ডলারের বাজার অস্থিতিশীল হলে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে বা ছেড়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করে।
বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদির মতে, আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে এখন ডলারের চাহিদা কম। আমদানি মূল্য পরিশোধের চাপও তেমন নেই। তিনি বলেন, একসময়ে আমরা প্রতি ডলারে ৮৫ টাকা পর্যন্ত পেয়েছি। এখন পাচ্ছি ৭৭ টাকা। এতে ছোট এবং মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সালাম মুর্শেদি এ সময়ে রপ্তানিকারকদের জন্য নীতি সহায়তার দাবি করেন।
এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এর সাবেক সভাপতি এবং তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক আনিসুল হক বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় রপ্তানিকারকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গত বছরের শুরুর দিকে রপ্তানিকারকরা এক লাখ ডলারের বিপরীতে ৮৪ লাখ টাকা পেতো। এখন তারা পাচ্ছে ৭৭ লাখ টাকা। প্রতিনিয়ত টাকা শক্তিশালী হওয়ায় রপ্তানিকারকদের শংকা বাড়ছে। তিনি মনে করেন, সরকার টাকার মান শক্তিশালী রাখতে পারে। তবে রপ্তানিকারক এবং রেমিট্যান্স এর জন্য সরকার ডলারের মূল্য আলাদা রাখতে পারে। আইএমএফ-এর চাপের কারণে এটিও সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। এদিকে বাজার থেকে ডলার কিনে নেয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। সমপ্রতি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারো ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে অতিক্রম করেছে। এ নিয়ে চলতি মাসে দুইবার বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার অতিক্রম করলো।
বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কেনায় বাজারে ডলারের বিপরীতে টাকা চলে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত ২৮ হাজার ১৩২ কোটি টাকা ছাড়া হয়েছে শুধুমাত্র ডলার কিনে। তবে মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখতে বাজারে টাকার প্রবাহ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক গত জানুয়ারি থেকে ডলারের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নগদ টাকা দিচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ডলার কেনা হচ্ছে।
ডলার বিক্রি করে বেকায়দায় পড়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ডলার বিক্রির প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা আটকে পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। এ কারণে এসব ব্যাংকের নিট লোকসান বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে গেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত অর্থের (রেমিট্যান্স) বিপরীতে সুবিধাভোগীরা টাকা নিচ্ছেন। এতে বাজারে টাকার সরবরাহ আরো বেড়ে চলছে। এজন্য মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যাংকগুলোকে ডলারের বিপরীতে বন্ড দেয়া হচ্ছে।
