যখন একটি উন্নয়নশীল দেশের দক্ষ কর্মী কাজের জন্য তার মাতৃভূমি ছেড়ে কোনো ধনী দেশে পাড়ি জমায় সাধারণত তাকে বলা হয় ব্রেইন ড্রেইন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতের পেশাজীবীদের জন্য বিষয়টি খুবই পরিচিত। যদিও কম্পিউটার সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ, ইঞ্জিনিয়াররাও কাজের জন্য এখন বিদেশ যাচ্ছেন। দিনে দিনে এ সংখ্যা বেড়ে এখন বিশাল। বর্তমানে প্রায় ২১ কোটি ৪০ লাখ লোক আন্তর্জাতিক অভিবাসী। মানে যে দেশে তারা জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেখানে না থেকে কাজের জন্য বসবাস করছেন অন্য দেশে। এসব দেশে তারা দক্ষতা ও শ্রমের মাধ্যমে স্থানীয় নাগরিকদের মতোই অবদান রেখে চলেছেন।
এ অভিবাসীদের দক্ষতার ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্যতা রয়েছে। কারণ এসব অভিবাসীর দক্ষতার স্তর ভিন্ন। আর তাদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা তাদের ক্যারিয়ারের একটি দীর্ঘ সময় নিজ দেশের বাইরে দেশের কাজ করছেন। অনেক অভিবাসী কর্মী তাদের যোগ্যতার চেয়ে নিচু মানের চাকরি করে থাকেন। অবশ্য এর পেছনের কারণটি হলো এ চাকরিতে তারা নিজ দেশের ভালো কাজের চেয়ে বেশি টাকা উপার্জন করছেন। খুবই দক্ষ এমন অভিবাসী কর্মীর সংখ্যা কম। তবে তারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ার্ক ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী অভিবাসীর সংখ্যা ৩৪ শতাংশ। যেখানে দেশটিতে জন্ম নেয়া ১৮ শতাংশ মানুষের ডিগ্রি রয়েছে। উন্নত দেশের অনেক উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন অভিবাসী রয়েছে ব্রিটেনে।
অনেক ধনী দেশ অভিবাসনের জন্য উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের উত্সাহিত করে থাকে। মূলত যাদের বিশেষ দক্ষতা রয়েছে তাদেরকেই উত্সাহিত করা হয়। এজন্য এসব ধনী দেশ একটুও লজ্জাবোধ করে না। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী নেয়ার জন্য পয়েন্ট সিস্টেমের চালু হয়েছে। অভিবাসীর দক্ষতা যাচাইয়ে এটা একটি স্বচ্ছ ও নৈবক্তিক প্রক্রিয়া। দেশটি নিজেদের কর্মী দক্ষতা হারাচ্ছে। এ কারণে তারা নিজেদের অর্থনীতি বা স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের জন্য দক্ষ অভিবাসদের সুযোগ নিচ্ছে।
অভিবাসনের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক মতও রয়েছে। এটা ব্রেইন ড্রেইন নয় বরং ব্রেইন গেইন। দি ইকোনমিস্ট এক্ষেত্রে মূল যুক্তিটি উপস্থাপন করেছেন। এটা হলো রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্স হলো নগদ টাকা যেটা অভিবাসী কর্মীরা তাদের দেশে পাঠায়।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রেমিট্যান্সকে এখন গুরুত্বপূর্ণ তহবিল উত্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এ রেমিট্যান্সের পরিমাণও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছর অফিসিয়াল তথ্যে দেখা যায়, এ রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিলো ৪০০ বিলিয়ন ডলার। এর বেশির ভাগ অর্থই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পাঠানো হয়। এছাড়া অপ্রদর্শিত চ্যানেল থেকেও প্রচুর রেমিট্যান্স পাঠানো হয়।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এ রেমিট্যান্সের পরিমান অনেক উন্নয়নশীল দেশকে দেয়া উন্নয়ন অনুদানের থেকে অনেক বেশি। মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট এর তথ্য হিসেবে দারিদ্র বিমোচনে, পরিবারকে সহায়তা, বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা চালুর ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। অবশ্য এসব দক্ষ অভিবাসীদের অনেকেই এক সময় নিজ দেশে ফিরে আসেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে ভারতের অনেক কম্পিউটার বিশষজ্ঞ কাজ করতেন। এটাকে প্রথমিকভাবে মনে করা হতো ভারতের দক্ষ কম্পিউটারবিদদের ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এখন এসব বিশেষজ্ঞরা দেশে ফিরে বড় কম্পিউটার সার্ভিস সিটি গড়ে তুলেছেন। এমনকি ব্যাঙ্গালুরুতে তাদের কম্পিউটার শিল্পভিত্তিক শহর গড়ে উঠেছে। যার নাম দেয়া হয়েছে, সিলিকন ভ্যালি অব ইন্ডিয়া।
অভিবাসন হলো মানব ইতিহাসের একটি চিরন্তন চিত্র। সমাজ বদলের একটি বড় নিয়ামকও বলা যেতে পারে অভিবাসনকে। বর্তমানে অভিবাসীর সংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ। বিশ্বের এ বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বিত ও স্থায়ী বৈশ্বিক সুশাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অভিবাসন সংশ্লিষ্ট জাতিসংঘের কোনো বিভাগও নেই। যারা অভিবাসীদের জন্য কাজ করতে পারে।
