হাতি দিয়া পথ আটকাইয়া চাঁদা তুলিবার ঘটনা নূতন নহে। যেই সকল হাতি দিয়া এই ধরনের চাঁদাবাজি করা হয়, সেই সকল হাতি বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কিছুদিন আগে চাঁদাবাজির সময় চাঁদার অঙ্ক মনঃপূত না হইবার জন্য হাতিকে চাঁদাবাজ মাহুত এমন ইঙ্গিত দিয়াছিল যে, ওই প্রশিক্ষিত হাতি চাঁদাদাতাকে শুঁড় দিয়া শূন্যে তুলিয়া আছাড় মারিয়াছিল। ঘটনাটি ঘটিয়াছিল গত ২৩ এপ্রিল, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার আগরপুর উত্তরপাড়ার রাস্তায়। সম্প্রতি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে হাতি দিয়া চাঁদাবাজির অভিযোগে দুই হাতির দুই মাহুতকে দুই বত্সর করিয়া কারাদণ্ড দিয়াছেন র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এই সময় হাতি দুইটিকেও আটক করা হয়।
হাতি লইয়া চাঁদাবাজি নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। তবে ইহাকে আমরা অন্য একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ হইতেও দেখিতে পারি। দেশে-বিদেশে বন্যহাতির তাণ্ডবের সংবাদ প্রায়শই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হইতে দেখা যায়। সুতরাং হাতিকে বশ মানানো সহজ কথা নহে। সার্কাসে ইহার বহুল ব্যবহার দেখা গেলেও বলা হয়, হাতি পোষিতে নাকি লাখ টাকা লাগে। ইহা অবশ্য আজকের আলোচ্য বিষয় নহে। বিষয়টি হইল, হাতিকে বিশেষভাবে পোষ মানানো। কিশোরগঞ্জের ঘটনায় হাতিটি তাহার মাহুতের এমনই আজ্ঞাবাহ যে, ১৪ বত্সর বয়সী পুঁচকে মাহুতটি তাহাকে বিশেষ ইঙ্গিতে ‘খোঁচা’ দেওয়া মাত্রই হাতিটি রুদ্রমূর্তি ধারণ করে কৃপণ চাঁদাদাতার প্রতি!
বন্য বাঘ, সিংহ হইতে শুরু করিয়া হিংস্র জন্তুজানোয়ারকে পোষ মানাইতে দেখা যায় ন্যাটজিও বা ডিসকভারির চ্যানেলে। প্রভুভক্ত হিসাবে কুকুর-বিড়াল তো বিশ্বজুড়িয়াই বিপুল জনপ্রিয়। বলিবার কথা হইল, হিংস্র পশু হইলেও একটি হাতি বা বাঘ কিংবা সিংহ তাহার খাদ্যদাতা ও আশ্রয়দাতার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। অর্থাত্ তাহারা এইক্ষেত্রে দারুণভাবে ‘চেইন অব কমান্ড’ মানিয়া চলে। সেই চেইন অব কমান্ডে তাহারা মনিবের আদেশে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ করিতেও কুণ্ঠিত হয় না। কারণ, তাহারা মানুষের আইন বোঝে না। তাহারা কেবল বোঝে মনিবের নির্দেশ। মনিবের নির্দেশই তাহাদের নিকট আইন।
পশুসমাজের এই কৃতজ্ঞবোধটি মানুষের জন্য সবিশেষ শিক্ষণীয়। মনে রাখিতে হইবে, চেইন অব কমান্ড না থাকিলে আইন এবং নিয়ম-কানুন না মানিলে পৃথিবীর কোনো জাতি উন্নতি করিতে পারে না। প্রকৃতি তথা বিশ্বজগতের ভিতরেও রহিয়াছে সুশৃঙ্খলতার অপূর্ব বিন্যাস। সেই অপূর্ব বিন্যাস দেখিয়া বোঝা যায়, সুশৃঙ্খলাই এই জগতের সবচাইতে বড় সৌন্দর্য। আমাদেরও সেই সৌন্দর্যকে ধারণ করিতে হইবে। জাতি হিসাবে উন্নতিসাধন করিতে হইলে ইহার কোনো বিকল্প নাই। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। পশু প্রজাতিরা যদি চেইন অব কমান্ড মানিতে পারে এবং সুশৃঙ্খলতার সৌন্দর্য ধারণ করিতে পারে, তাহা হইলে মানুষ হইয়া আমরা কেন চেইন অব কমান্ডকে অমান্য করিব?
