পারকিনসন্স রোগের সাথে পথচলা

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৩, ২০:২৩
অধ্যাপক ডা:মো:আশরাফ আলী নিউরোলজি বিভাগ ল্যাবএইড হাসপাতাল পারকিনসন্স রোগ মস্তিষ্কের একটা ক্ষয়জনিত রোগ। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে এ্যালঝেইমারসের পরেই পারকিনসন্স রোগ মস্তিষ্কের দ্বিতীয় ক্ষয়জনিত রোগ। মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত রোগে স্নায়ুকোষগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে আগেই মারা যায় এবং এগুলোর প্রতিস্থাপন হয় না। পারকিনসন্স রোগ সাধারণত: ৬০ বছর বয়সের পরে দেখা দেয়। তবে ৬০ বছর বয়সের নীচেও পারকিনসন্স রোগ দেখা দিতে পারে। সেগুলো সাধারণত: বংশগত কারণে হয়, তবে তার সংখ্যা খুব কম। ১১ এপ্রিল, বিশ্ব পারকিনসন্স দিবস। যে সমস্ত রোগীরা পারকিনসন্স রোগে ভুগছে তাদেরকে ভালো চিকিত্সা এবং উন্নতর জীবন ব্যবস্থা প্রদান এবং সমাজ সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য প্রতি বছর ১২ এপ্রিল বিশ্ব পারকিনসন্স দিবস পালিত হয়। পারকিনসন্স রোগে মস্তিষ্কের বেসাল গ্যাঙ্গলিয়া নামক জায়গাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেসাল গ্যাঙ্গলিয়ার মধ্যে সাবসটেনসিয়া নায়গ্রা জায়গাটি ক্ষতিগ্রস্থ হয় বেশী। এখানে ডোপামিন নামক একটা পদার্থ কমে যায়। বৃটিশ চিকিত্সক জেমস পারকিনসন্স সর্ব প্রথম ১৯১৭ সালে পারকিনসন্স রোগের উপর একটা বই লেখেন। এই বইটির নাম ছিলো “এন ইজি অন দ্যা সেকিং প্লে”। পরে একজন ফ্রেন্স স্নায়ুরোগ বিশেজ্ঞ ‘সেকিং প্লে’ রোগটির নাম জেমস পারকিনসন্স নাম অনুসারে পারকিনসন্স ডিজিজ রাখেন। পারকিনসন্স রোগ কাদের বেশী হয়, যাদের বেশী বয়স, বংশগত কারণ এবং পরিবেশগত কারণ এর জন্য দায়ী। ক্ষয়জনিত কারণের জন্য বয়স্ক লোকদের মাঝে এ রোগটি দেখা দেয় বেশী। বংশগত কারণে যখন পারকিনসন্স রোগ হয় তখন অল্প বয়সেই অর্থাত্ ৪০ বছর বয়সের নীচেই পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হতে পারে। পরিবেশগত কারণের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে কীটনাশক অথবা জৈব পদার্থের সংস্পর্শে আসলে পারকিনসন্স রোগ দেখা দিতে পারে। উপাদারণ হিসাবে বলা যায়, এস, পি, টি, পি নামে একটা রাসায়নিক পদার্থ যা গাছ-গাছালি, আগাছা মারার জন্য ব্যবহার করা হয়। এর সংস্পর্শে আসলে পারকিনসন্স রোগ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় যারা বড় ওয়েল্ডিং-এ কাজ করে তাদের পারকিনসন্স রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যখন বড় ওয়েল্ডিং করা হয় তখন ম্যাঙ্গানিজ নামক এক গ্যাস নির্গত হয়, যে গ্যাস শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে অনেক দিন ধরে শরীরে প্রবেশ করলে পারকিনসন্স রোগ হতে পারে। এই বিষাক্ত গ্যাস যাতে শরীরের ঢুকতে না পারে সেজন্য ওয়েল্ডিং এর সময় মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। পারকিনসন্স রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো হলো, হাতের লেখা ক্রমশ: ছোট হয়ে যাওয়া, গলার স্বর নরম হয়ে যাওয়া, মুখের প্রকাশভঙ্গি কমে যাওয়া এবং কাজ-কর্মের গতি কমে যাওয়া। এছাড়া শরীর কাঁপা এবং চলাফেরা ও ভারসাম্য রক্ষা করার সমস্যাও দেখা দেয়। অনেক সময় পারকিনসন্স রোগীদের ঘ্রানশক্তিও কমে যায়। এদের স্মরণশক্তির কিছুটা ব্যাঘাত ঘটে। সাধারণত: যারা অনেক দিন ধরে পারকিনসন্স রোগে ভুগছে তাদের মাঝে স্মরণশক্তির ব্যাঘাত দেখা দেয়। এরা অনেক সময় ডিপ্রেসনে ভোগে এবং কোন কিছুতে আগ্রহ পায় না এবং সব সময় চিন্তিত ভাবে থাকে। এদের ঘুমের ব্যাঘাত হয়। যেমন শরীরটা শক্ত হওয়ার কারণে বিছানায় ঘুরাফেরায় অসুবিধা হয়, বিছানা থেকে উঠতে-নামতে কষ্ট হয়। এই সমস্ত রোগীরা অনেক সময় ঘুমের মধ্যে শব্দ-চেচাঁমেচি করে পাশের জনকে আঘাত করে এবং অনেক দু:স্বপন্ন দেখে। ঘুমের এই অসুবিধাগুলো পারকিনসন্স রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবেও দেখা দেয়। অনেক পারকিনসন্স রোগী মাথা ঘুরার সমস্যা নিয়ে আসে, বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠলে অথবা বেশী খাবার খাওয়ার পরে। ঘুম থেকে হঠাত্ করে দাঁড়ালে ব্লাড প্রেসার অনেক নেমে যায় ফলে মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। যার ফলে মাথা ঘুরতে থাকে। সেজন্য ঘুম থেকে ধীরে ধীরে উঠে কিছু সময় পরে দাঁড়ানোই ভালো। গত কয়েক বছরে পারকিনসন্স রোগের চিকিত্সার অনেক উন্নতি হয়েছে। লেভোডোপা এবং অন্যান্য ওষুধ বাজারে আসার ফলে পারকিনসন্স রোগীদের গড় আয়ু বেড়ে গেছে। পারকিনসন্স রোগীদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামে একটা পদার্থ কমে যায়। ডোপামিন সমৃদ্ধ ওষুধগুলোই পারকিনসন্স রোগের আসল চিকিত্সা। ডোপামিন সমৃদ্ধ ওষুধগুলো যেমন- লেভোডোপা, রোপিনিরোল আমাদের দেশে পাওয়া যায়। লেভোডোপা সর্বপ্রথম ১৯৬৮ সালে বিশ্ব বাজারে আসে। লেভোডোপা শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া এবং কাজ কর্মের ধীর গতির লক্ষণগুলোকে উন্নত করে। শুধু লেভোডোপা সেবন করলে বমি বমি ভাব হয়। সেটা দুর করার জন্য লেভোডোপার সাথে কার্বিডোপা নামে আরেকটা ওষুধ যোগ করা হয়। দীর্ঘ দিন লেভোডোপা সেবন করলে দু’রকম অসুবিধা দেখা দেয়। যেমন- শরীরে কিছু অযাচিত নড়াচড়া দেখা দেয় এবং দিন দিন এর কার্যক্ষমতার সময় কমে যায়। ফলে ডোপামিন সৃমদ্ধ ওষুধগুলো শুধু রোগের লক্ষণগুলোকে উপশম করতে পারে কিন্তু রোগের অগ্রগতিকে প্রতিহত করতে পারে না। তার ফলে যারা অনেক দিন ধরে পারকিনসন্স রোগে ভুগছে তাদের বেলায় ওষুধের কার্যকারিতা কমে যায়। তখন মস্তিষ্কের ভিতরে পেসমেকারের মতো জিনিস প্রতিস্থাপন করে লক্ষণগুলো উপশম করা হয়। অনেক সময় ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট এবং স্পীচ থেরাপিস্ট নিয়ে একটা দল গঠন করা হয় যারা বিভিন্ন সময়ে পারকিনসন্স রোগীর লক্ষণগুলো দূর করতে সাহায্য করে। ফিজিওথেরাপিস্ট দৈনন্দিন চলাফেরা, ভারসাম্য রক্ষা এগুলোতে সাহায্য করে। অকুপেশনাল থেরাপিস্ট প্রতিদিনের কাজ কর্ম কিভাবে পালন করবে তা ঠিক করে দেয়। স্পীচ থেরাপিস্টগণ কথা বলার সমস্যাগুলো ঠিক করে দেন। তখন বিশ্বব্যাপী গবেষণা চলছে রোগ প্রক্রিয়ার অগ্রসরকে বন্ধ করা যাতে পারকিনসন্স রোগীদের অনেক দিন ধরে রোগে ভুগতে না হয় এবং তারা যেন সম্পূর্নরূপে আরোগ্য লাভ করে।