বলা হচ্ছে আমাদের তরুণসমাজ জেগেছে। তাদের উত্থাপিত দাবি ও শপথের দৃশ্য দেখেছি প্রচার মাধ্যমে। তাহলে তো আমরা এবার আশা করতে পারি— তারা গাড়িতে বয়োজেষ্ঠ্যদের সিট ছেড়ে দিতে কার্পণ্য করবে না; সর্বত্র দলবাজির ফলে মানবতার যে চরম লঙ্ঘন হচ্ছে সেগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে; অযোগ্যের আস্ফাালনে যোগ্যদের যে অসহায়ত্ব নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে সেদিকটায় তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখবে; মহাসমাবেশ ঘটাবে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে; অশ্লীলতামুক্ত মার্জিত সমাজ গঠনে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালাবে। আরো আশা করতে পারি বিশ্বজিেক নির্মমভাবে পিটিয়ে মারার দৃশ্যটি বুকে ধারণ করে ঘাতকদের প্রতি ঘৃণা উত্সারিত করবে ও তাদের শাস্তি দাবি করবে; ধর্ষণে সেঞ্চুরি করে উত্সব পালনকারী সেঞ্চুরিয়ানকে শতবার ফাঁসি দেওয়া হোক—এই দাবি উচ্চারণ করবে লক্ষ কণ্ঠে। যেসব শিক্ষার্থী শিক্ষক পেটানোর মতো ক্ষমার অযোগ্য কাজটি করে চলেছে তাদের সেই দানবাধিকারের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করবে; খাবারে ও ওষুধে ভেজাল দানকারীদের ফাঁসির দাবি করবে।
আরো আশা করতে পারি, নিজের কর্তব্য-কর্ম আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবে। গার্মেন্টসসহ কলেকারখানায় যে লাখ লাখ তরুণ কাজ করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে এবং জীবন সংগ্রামে ব্যাপৃত রয়েছে তাদেরকেও তরুণ বলে স্বীকার করতে দ্বিধা করবে না; আর ঐ তরুণ গোষ্ঠী কাদের অদক্ষতা ও অক্ষমতার কারণে সুবিধা বঞ্চিত হয়ে সামান্য কয়টা টাকার জন্য সারাদিন খেটে মরছে তা খুঁজে বের করে দোষীদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।
আরো আশা করতে পারি, যারা বন ও পাহাড় কেটে টাকার পাহাড় গড়ছে তাদের হাত গুঁড়িয়ে দেবে। কোনো ঘুষখোর, চোরাকারবারি, ঋণখেলাপি, মিথ্যাবাদী, খুনি, ধর্ষককে কথায় কথায় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি ব্যবহারে ঘোর আপত্তি জানাবে এবং আসন্ন সংসদ নিবাচনে নমিনেশন পেতে দেবে না। যে কোনো সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের প্রতি দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলবে আশা করি। কারণ মুক্তিযুদ্ধটা হয়েছিল ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে। তাই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি তারাই যারা দলাদলির ঊর্ধ্বে থেকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে টিকিয়ে রেখেছে—এ কথা জাতিকে বোঝাতে সক্ষম হবে এবং নিজেরাও মেধা আর শ্রম দিয়ে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে তরুণদের শপথ যা হবে বলে আশা করতে পারি, তাহলো—‘আমি কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করবো না; কোথাও কোনো অন্যায় সুবিধা নেবো না এবং কাউকে তা দেবো না; অবৈধ পন্থায় চাকরি নেবো না দেবোও না; ঘুষ খাবো না দেবোও না; মদ সিগারেট পান করবো না; মাদক ব্যবসা করবো না; নারীর সম্ভ্রমহানি করবো না; বিজ্ঞানের অনৈতিক ব্যবহার করবো না; জবাবদিহিতার চর্চা করবো ঊর্ধ্ব থেকে নিম্ন, নিম্ন থেকে ঊর্ধ্ব এবং প্যারালাল পদ্ধতিতে; অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবো; নিজ ধর্মকে মেনে চলবো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সম্মান করবো; প্রতিদিন আত্মসমালোচনা করে নিজের ভুল শুধরে নেবো।’
হে তরুণসমাজ, এ চাওয়া আমার একার নয়, এ দেশের অগণিত মানুষের। তরুণদের ‘জাগরণ’ বলতে তারা এগুলোকেই বোঝে। আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হবে তো?
ফেনী
