গতকাল রাজধানী ছিল অবরুদ্ধ

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪১
রাজধানী ঢাকা গতকাল শনিবার সারাদেশ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল। সড়কপথ, রেলপথ ও নৌপথে স্বাভাবিক যাতায়াত বন্ধ ছিল শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই। নাশকতার আশঙ্কার কথা বলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ঢাকার সঙ্গে নিয়মিত চলাচলকারী তাদের অধিকাংশ পূর্বনির্ধারিত ট্রেনের যাত্রা বাতিল করে দেয়। সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিগুলোও সকল রুটে তাদের গাড়ি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। একইভাবে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নৌরুটে চলাচলকারী লঞ্চ-স্টিমার এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে চলাচলকারী ফেরিও বন্ধ রাখা হয় টানা ২৪ ঘন্টা। এর ফলে ঢাকামুখী হাজার হাজার মানুষ যেমন বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়েন, তেমনি ঢাকা থেকে মফস্বলমুখী অগণিত মানুষও আটকে যান রাজধানীতে। হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ ও ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচি প্রতিহত করার লক্ষ্যে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সারাদেশে হরতালের ডাক দেয়। এছাড়া শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তারা হেফাজতের লংমার্চ প্রতিহত করতে ঢাকায় প্রবেশের সকল পথে অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করে। তাদের এই কর্মসূচির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতি, ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতি ও বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশন শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই ঢাকার সঙ্গে সারাদেশের সকল রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা। এ ব্যাপারে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, মূলত লংমার্চ কর্মসূচি পণ্ড করার অপচেষ্টার অংশ হিসাবেই সরকার সর্বাত্মক চাপ প্রয়োগ করে সড়ক ও নৌপথের মালিক সংগঠনগুলোকে দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। এমনকি রাজধানীর অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতেও বাস-মিনিবাস এবং বিভিন্ন ধরনের হিউম্যান হলার, ট্যাক্সিক্যাব, সিএনজি অটোরিক্সা ইত্যাদির চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। অন্যদিকে সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ট্রেন, ফেরি ও স্টিমার সার্ভিসও বন্ধ রাখা হয় শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত। ফেরি চলাচল বন্ধ থাকার কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটের উভয় তীরে হাজার হাজার মানুষ আটকা পড়েন। বিষয়টি নিয়ে ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো: আবু তাহের বলেন, হরতালে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণেই বাংলাদেশ রেলওয়ে তার ১৪টি পূর্বনির্ধারিত ট্রেনের যাত্রা বাতিল করে। এরমধ্যে ১০টি ট্রেন ছিল পূর্বাঞ্চলে এবং বাকি ৪টি পশ্চিমাঞ্চলে। এছাড়া অপর ট্রেনগুলো কিছুটা বিলম্বে ছেড়ে যায় বলে জানান তিনি। তবে রেলওয়ের অপর একটি সূত্র বলেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪টি ট্রেন বাতিলের ঘোষণা দেয়া হলেও কার্যত আরও বেশ কয়েকটি ট্রেনের যাত্রা অনানুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়। এ কারণে হাজার হাজার ট্রেনযাত্রী কমলাপুরসহ বিভিন্ন রেলস্টেশনে আটকা পড়েন। গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালে খবর নিয়ে জানা যায়, মালিক সংগঠনের কঠোর নির্দেশের কারণে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এই দুটি টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। একইভাবে ঢাকার বাইরে থেকেও কোন দূরপাল্লার বাস প্রবেশ করেনি গাবতলী ও মহাখালী টার্মিনালে। গাড়ি না ছাড়ায় শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত টারমিনালগুলোতে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন যাত্রীরা। পর্যাপ্ত যাত্রী থাকলেও মালিক সমিতির নিষেধাজ্ঞার কারণে গাড়ি ছাড়া হয়নি বলে জানিয়েছেন পরিবহন কর্মীরা। গাবতলী বাস টার্মিনালে ঢাকা-আক্কেলপুর রুটে চলাচলকারী একটি পরিবহন কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মিলন মিয়া বলেন, সকাল থেকেই আমরা কোন বাস ছাড়ছি না। ঢাকার বাইরে থেকেও কোন বাস আসছে না। যাত্রীদের প্রচণ্ড চাপ থাকলেও অন্য পরিবহনগুলো বাস চলাচল বন্ধ রাখায় আমরাও বন্ধ রেখেছি। তিনি বলেন, অনেকে অগ্রিম টিকিট বুকিং দিয়ে রেখেছিলেন। আমরা তাদের অনেককেই টেলিফোনে জানিয়ে দিয়েছি যে, গাড়ি চলবে না। তাররপরও অনেক যাত্রী কাউন্টারে এসে ভিড় করেছিল। তারা গাড়ি ছাড়তে অনুরোধ জানায়। কিন্তু আমরা তাদের অনুরোধ রাখতে পারিনি। কারণ, শুক্রবার রাতেই শ্রমিক লীগের একটি গ্রুপ এসে গাড়ি না চালাতে হুমকি দিয়ে গেছে। মহাখালী বাস টারমিনাল মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি শওকত আলী বাবুল বলেন, এক পক্ষ লংমার্চ করছে। আরেক দল অবরোধ-হরতালের ঘোষণা দিয়েছে। এ কারণে গাড়ির ক্ষতির আশঙ্কায় মালিকরা গাড়ি চলাচল বন্ধ রেখেছেন। একই বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই মালিকরা যানবাহন পথে নামাচ্ছেন না। সরকারের কোনো আদেশ বা নির্দেশ নেই দাবি করে তিনি বলেন, মালিক সমিতির পক্ষ থেকেও কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। পরিবহন কোম্পানিগুলোর মালিকরা নিজেরাই নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখেন। তিনি আরো বলেন, এর আগে বিগত কয়েকদিনের হরতালে শুধুমাত্র রাজধানীতেই শতাধিক বাস আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এখন থেকে এই ধরনের সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় তারা বাস রাস্তায় বের করবেন না। লঞ্চ মালিক সংগঠনের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, শুক্রবার দুপুরেই বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সাফ জানিয়ে দেয় যে, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকায় কোন লঞ্চ ঢুকতে পারবে না। এমনকি বাইরের কোন ঘাট থেকেও ঢাকার উদ্দেশে লঞ্চ ছাড়তে পারবে না। কেউ এ নির্দেশ না মানলে লঞ্চের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস বাতিলেরও হুমকি দেয়া হয়। এ কারণে লঞ্চ মালিকরা কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি হননি। বিআইডব্লিউটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে ফেরি চলাচল বন্ধের নির্দেশ আসে শুক্রবার বিকালে। তাত্ক্ষণিকভাবেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। এ কারণে দৌলতদিয়া ঘাটে এসে আটকা পড়ে হেফাজতে ইসলামের ৫০টি বাসের বহর।