স্নানোত্সবে রামগড় সীমান্তে দুই বাংলার মিলন মেলা

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৫০
ঐতিহ্যবাহী বারুণী স্নানোত্সবকে ঘিরে গতকাল সোমবার রামগড় সাবরুম সীমান্তের ফেনী নদী পরিণত হয় বাংলাদেশ - ভারত দু’দেশের নাগরিকদের মিলন মেলায়। উভয় দেশের হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীর সমাগমে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুখরিত ছিল ফেনী নদী। সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই চৈত্রের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশি তিথিতে প্রতিবছর ফেনী নদীতে বারুণী স্নানে মিলিত হন দুই দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ। তারা পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির জন্য তর্পণ করেন এখানে। রামগড় ও সাবরুম অংশে নদীর দুই তীরে দুই দেশের পুরোহিতরা সকালেই বসেন পূজা অর্চনার জন্য। পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনা ছাড়াও নিজের পুণ্যলাভ ও সকল প্রকার পাপ-পংকিলতা থেকে মুক্ত হওয়ার আশায় ফেনী এই উত্সবে ছুটে আসেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। সকাল ৭টা থেকেই শুরু হয় বারুণী স্নানোত্সব। স্নান কিংবা পুজা অর্চনা ছাড়াও দুই দেশে অবস্থানরত আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা করার জন্যও অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ছুটে আসেন। ঐতিহ্যবাহী এ বারুণী মেলা উপলক্ষে বহুকাল থেকেই এই দিনে দুই দেশের সীমান্ত কিছু সময়ের জন্য উন্মুক্ত থাকে। এ সুবাদে এপার বাংলার মানুষ ছুটে যায় ওপারের সাবরুম মহকুমা শহরে , আবার ওপারের লোক এসে ঘুরে যান রামগড়। এ মেলাকে ঘিরে দুই দেশের মানুষের মধ্যে তৈরী হয় ভ্রাতৃত্ব ও সমপ্রীতির মেলবন্ধন। হিন্দু সমপ্রদায়ের বাইরে ত্রিপুরা, মারমা, চাকমা, মুসলিম প্রভৃতি ধর্মের মানুষেরও সমাগম ঘটে এখানে। বারুণী মেলা সম্পর্কে রামগড়ের অধিবাসী ও অবসরপ্রাপ্ত সহকারী জেলা শিক্ষা অফিসার রামেশ্বর শীল বলেন, ‘ভারত বিভক্তির পূর্বে এখানে বারুণী মেলায় বাংলাদেশ ভারত দুই দেশের দূর-দূরান্তের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুল পুণ্যার্থীর সমাগম হত। পাকিস্তান আমলেও ফেনী নদীতে বারুণী মেলা বসতো। এ মেলাটি এখন দুই দেশের সংস্কৃতির অংশ হয়ে পড়েছে।’ তার এ কথার প্রতিফলন পাওয়া যায় মেলায় আগত কয়েকজনের সাথে আলাপ করে। সাবরুমের মনু বাজারের বাসিন্দা প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের মাটিতে আমার জন্ম। ১৯৬৩ সালের সামপ্রদায়িক দাঙ্গার সময় বাবা-মা’র সাথে আমিও ভারতবাসী হই। জন্মভূমির মাটির ছোঁয়া পেতেই আজ বাংলাদেশে এসেছি।’ কুমিল্লা থেকে আসা সমীর চন্দ্র বলেন,‘সাবরুম যাচ্ছি দাদা-দাদীর সাথে দেখা করতে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি ভারত ছেড়ে এ দেশে চলে আসি বাবা-মা’র সাথে। কিন্তু দাদা, দাদী ও কাকারা ভারতে থেকে যায়। প্রতি বছর বারুণী মেলায় তাদের সাথে সাক্ষাত্ করতে এখানে চলে আসি।’ মেলা উপলক্ষে রামগড় বাজার মুখরিত হয়ে উঠে ভারতীয়দের কেনাকাটা,পদচারণায়। ওপারের সাবরুম থেকে হাজার হাজার ভারতীয় ছুটে আসেন রামগড়ে। একইভাবে রামগড় থেকেও ওপারে যান অগণিত মানুষ। রামগড় বাজারে ঘুরতে আসা সাবরুমের সুমন, রাজু, সুনিল বলেন,‘এখানে ঘুরে মনে হচ্ছে ভারতেই আছি। কারণ চারদিকে ভারতের লোকজনদেরকেই দেখছি।’ ভারতীয়রা রামগড় বাজার থেকে সেমাই, নারিকেল, সাবান, শুঁটকি মাছ ইত্যাদি কিনে নিয়ে যায়। আবার ওপারের সাবরুম থেকেও এপারের লোকজন বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনে আনে।