শিক্ষাক্ষেত্রে মানোন্নয়ন নাকি মানের অবনমন ঘটছে?

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৫৩
একটা সময় পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে পরীক্ষার ফল নিয়ে উদ্বেগ থাকতো। শ্রেণির প্রথম দিকের ক্রমিক নম্বরধারীরা ছাড়া সকল শিক্ষার্থীই পাস-ফেলের চিন্তায় চিন্তিত থাকতো। বর্তমানে সেই অবস্থা অনেকটাই নেই। ভালো শিক্ষার্থীদের মধ্যে জিপিএ ৫ পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও ফেলের শতকরা হার কমে যাওয়ায় দুর্বল শিক্ষার্থীদের ফেল নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেকটাই কম। ফেল করাটাই এখন কঠিন—আনাচে কানাচে এমনটিও এখন শোনা যায়। শিক্ষার মানের উন্নতির কারণে এমনটি হচ্ছে বলে যদি আমরা ধরে নেই তবে কিছু বাস্তবতা থেকে চোখ অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ ৫ প্রাপ্তির পরও অনেক শিক্ষার্থী মেডিকেল, বুয়েট তো দূরের কথা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না। এমনটি দূর অতীতে ঘটলেও সংখ্যার বিচারে কম হওয়ায় সেগুলোকে আমরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে ধরে নিতাম। কিন্তু বর্তমানে এমন ঘটনার সংখ্যাধিক্য চিন্তিত করেছে বোদ্ধামহলকে। সরকার শতভাগ পাসের কৃতিত্ব নিজেদের কাঁধে নেওয়া কিংবা শিক্ষাখাতে বিদেশি অর্থ সহজ শর্তে প্রাপ্তির লক্ষ্যে যদি অতি সূক্ষ্ম কৌশলে পাসের হার বৃদ্ধির নেশায় মেতে ওঠে, তবে তা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে না। এর সুদূরপ্রসারি কুফল একটা সময় দেশকে পশ্চাদগামী করতে বাধ্য করবে। পাবলিক পরীক্ষার সময় অধিকাংশ কেন্দ্রেই আর আগের মতো কড়া পরীক্ষা গ্রহণ করা হয় না বলে লোকমুখে গুঞ্জন রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার হলে সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় দুর্বল শিক্ষার্থীরা শ্রেণির পাঠ গ্রহণে আগ্রহ হারাচ্ছে। মাধ্যমিক পাস করা একজন শিক্ষার্থী একটা আবেদনপত্র বাংলা কিংবা ইংরেজিতে লিখতে পারবে না—এটাও আজ আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে। পরীক্ষার হলের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। কেন্দ্র সচিব, হল সুপারদের মৌন কিংবা সরব সম্মতিতেই পরীক্ষার হলে কর্তব্যরত কক্ষ পরিদর্শকদের দ্বারা, কখনো বিষয় অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দ্বারা পরীক্ষার হলে উত্তর সঠিক করে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। আর কোনো কক্ষে একজন পরীক্ষার্থী একটা প্রশ্নের উত্তর পারলে কক্ষের বাকি পরীক্ষার্থীরাও সেটির অনুরূপ অনুলিপি করছে। এখন পরীক্ষার হলে কক্ষ পরিদর্শক কোনো পরীক্ষার্থীকে অসদুপায় অবলম্বনের জন্য বহিষ্কার করেছে—এমনটি বিরল। পরীক্ষা নেওয়ার অর্থ শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞানের সঠিক মূল্যায়ন। কিন্তু উপর্যুক্ত বিষয়সমূহের কারণে পরীক্ষা নেওয়ার যৌক্তিকতা এবং যথার্থতা হারাচ্ছে দিন দিন। এরপর খাতা মূল্যায়নেও আরেক দফা হতাশা। কোনো পরীক্ষার্থীকে ফেল করানো যাবে না—অঘোষিত এমন একটা বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে মানসিক চাপে থেকে পরীক্ষককে খাতা মূল্যায়ন করতে হয়। সরকারের এ নীতি বাস্তবায়নের কারণেই হোক আর অন্য কোনো মানবিক উদ্দেশ্য কিংবা নাগরিক অধিকারের কারণেই হোক প্রচলিত এ নীতি পরিবর্তন জরুরি। মৌলিক শিক্ষা ছাড়া দেশের কিংবা নাগরিকের মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। সম্ভব নয় দেশের অগ্রগতির ধারা সচল রাখা। কাগুজে সনদ অর্জনের মাধ্যমে কেউ দেশ, জাতি ও নিজের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটাতে পারবে না। নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে কাগুজে সনদ অর্জন করে একটা সময় শিক্ষিত কিংবা উচ্চ শিক্ষিতের কাতারে নিজের নাম লেখাতে সচেষ্ট হলেও মৌলিক জ্ঞান, সৃজনশীল চিন্তা আর উদ্ভাবনী শক্তির অভাবে সম্ভব হবে না প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে নিজের কৃতিত্ব জাহির করে সম্মানজনক চাকরি অর্জন করা। শিক্ষিতের তকমা শরীরে থাকায় তথাকথিত এই শিক্ষিত শ্রেণি না পারবে কৃষি কিংবা শিল্প কারখানায় শ্রমজীবী হিসেবে ভূমিকা রাখতে। তখন একটাই ঠিকানা হবে সমাজবিরোধী হিসেবে। এমনটি কারোই প্রত্যাশিত নয়। ফরিদপুর