দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে শ্রমমন্ত্রীকে বিজিএমইএ

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৩, ২৩:০১
দেশের বিরাজমান সংকট নিরসনে ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজেএমই প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা জরুরীভিত্তিতে সৃষ্ট সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে দুই নেত্রীর প্রতি অনুরোধ জানাবে। তবে বিজিএমইএ বলছে তারা সৌজন্য সাক্ষাত্ করবে দুইনেত্রীর সঙ্গে। এতে রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো আলোচনা হবে না। মাসাধিককাল ধরে চলা সহিংস রাজনৈতিক আন্দোলনে দেশের ব্যবসা বাণিজ্য প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে। জনজীবনে অস্থিরতা-অস্বস্তি বাড়ছে। শিক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখা দুস্কর হয়ে পড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যান্য সব খাতের সঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য অশনিসংকেত দেখা যাচ্ছে। বিদেশি মিশনগুলো থেকে সরকারকে জানানো হচ্ছে যে, আমদানিকারক দেশগুলো থেকে তৈরি পোশাক শিল্প আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাজারকে নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে বলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী রাজিউদ্দিন রাজু গতকাল বিজেএমই’র প্রতিনিধি দলের সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের বলেন, এরকম তথ্য তিনি দলের সাধারণ সম্পাদককে জানিয়েছেন। এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতেও বলেছেন। এদিকে হরতালের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগ জানিয়ে আসছে এ খাতের সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার পোশাক উদ্যোক্তারা। চলমান অস্থিরতায় আমদানি রফতানি ভয়ানকভাব ব্যাহত হচ্ছে। গার্মেন্টস উত্পাদন প্রক্রিয়া হরতালের আওতামুক্ত হলেও এর সাথে জড়িত ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেলজ মালামাল কারখানায় আনা এবং তৈরি পণ্য বন্দরে পাঠানো এখন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকদের বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, অনেক হয়েছে। আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এই অবস্থায় দুই নেত্রীর সাথে সাক্ষাতের আগ্রহও ব্যক্ত করেছেন তিনি। তবে বৈঠক পরবর্তীতে বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, আমরা বিজিএমইএ’র নতুন কমিটি তাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত্ করতে চাই। অন্য কোন বিষয় নয়। তিনি বলেন, আমরা মন্ত্রীকে বলেছি, ‘নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে চাই। আমাদের সেই ব্যবস্থা করে দেন। বৈঠকে উপস্থিত বিজিএমইএ’র সহসভাপতি এস এম মান্নান কচি ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিবাদের ভিন্ন ভাষা চাই। এভাবে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি করে কেবল আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। বায়াররা (বিদেশি ক্রেতা) দেশে আসতে চাচ্ছে না। তারা বলছে থাইল্যান্ড, হংকং বা চীনে গিয়ে তাদের সাথে অর্ডারের বিষয়ে নেগোসিয়েট (দরাদরি) করতে। প্রসঙ্গত, দীর্ঘ মাসাধিকালব্যাপী দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংকট তৈরি হলেও তা নিরসনে রাজনৈতিক কোনো উদ্যোগ নেই। সহসা সংকট উত্তরণের কোনো লক্ষ্যণ দেখা যাচ্ছে না। যদিও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন শিগগির সংকট দূর হয়ে যাবে-সংলাপও হবে। কিন্তু মন্ত্রীদের বহুকথনে এখন আর কোনোটিই বিশ্বাস করতে চায় না মানুষ। দেখা যাচ্ছে, গত ফেরুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া সহিংস অরাজক পরিস্থিতি প্রশাসনের মাধ্যমে মোকাবেলার চেষ্টা চলছে। সহিংসতায় কিংবা আন্দোলন সংগ্রামে জড়িতদের গ্রেফতার করা বা মামলা মোকদ্দমা জড়িয়ে হেনস্থার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। সমপ্রতি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সম্মেলন করে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যকে রক্ষার দাবি করেছে। নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট নিরসনের প্রস্তাব করেছেন। জানা গেছে, এ সংগঠনের পক্ষ থেকেও দুই নেত্রীর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হতে পারে। হরতালে ক্ষতি: ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) সমপ্রতি একটি পরিসংখ্যান দিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিনের হরতালে আর্থিক সংশ্লিষ্ট খাতসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে ৩৬০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। এছাড়া সরকারের রাজস্ব আদায়ে ক্ষতি হয় ২৫০ কোটি টাকা। পাইকারি বাজার, শপিং মল, শো-রুমে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৬০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এছাড়া শিক্ষা খাতে ৫০ কোটি, আর্থিক খাতে ৫০ কোটি, ইন্স্যুরেন্স খাতে ১৫ কোটি, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৬০ কোটি, পর্যটন শিল্প খাতে ৫০ কোটি, উত্পাদন খাতে ১০০ কোটি ও অন্যান্য খাতে ৬৫ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। ডিসিসিআই হিসাব করে দেখিয়েছে বছরে গড়ে ৪০ দিন হরতাল হলে ৬৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, চার দিনের হরতালে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার তৈরি পোশাক পণ্য স্টকলট (যথাসময়ে জাহাজীকরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় অর্ডার বাতিলকৃত পণ্য) হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। হরতালের কারণে পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যার কারণে আর্থিক ক্ষতি হয়। এই সময়ে অর্ডার বাতিল হয়। এছাড়া সামপ্রতি রাজনৈতিক অস্থিরতায় এই খাতের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার অর্ডার অন্য দেশে চলে গেছে বলে জানিয়েছে তৈরি পোশাক উত্পাদকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এছাড়া পাইকারি বাজার, শপিং মল, শো-রুম ও ছোট ব্যবসায়ীদের প্রায় ২০ লাখ দোকান বন্ধ থাকে। এর ফলে গড়ে প্রতিটি দোকানের ৩ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। দেশে চলতি অর্থবছরে প্রাক্কলিত মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) ৯ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসেবে এক বছরের হরতালে জিডিপি’র প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ ক্ষতি হয়। এই হরতাল না হলে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি ‘ডাবল ডিজিট’ হতে পারত বলে মনে করে ঢাকা চেম্বার।