গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আটক বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সকল বিবেচনায়ই নিম্ন আদালত জামিন দিতে পারতেন। ফৌজদারি কার্যবিধিতেও জামিন দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এমনকি আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইনে শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার অপরাধগুলোও জামিনযোগ্য। উচ্চ আদালতের রায়েও এসব অভিযোগে আসামিদের জামিন দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের জামিন না দেয়াকে বিস্ময়কর বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলেছেন, জামিন দেয়ার যে ক্ষমতা আইন নিম্ন আদালতকে দিয়েছে তা প্রয়োগ না করে জামিন প্রার্থীদের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন অভিযোগ করেছেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য নিম্ন আদালতের বিচারকগণের স্বাধীনভাবে বিচার করার যে সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে সে দায়িত্ব পালন না করে কোন কোন ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের আজ্ঞাবহ হয়ে বিচার কার্য পরিচালনা করছে। যার ফলে আজ বিচার বিভাগের উপর দেশবাসীর কোন আস্থা নেই।’
গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত বিভিন্ন মামলায় বিএনপির ৮ শীর্ষ নেতা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন। এরমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে তিনটি এবং সাধারণ আইনে চারটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। প্রত্যেকটি মামলায়ই ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত জামিনের আবেদন নাকচ করে দেন। ঢালাওভাবে সকল আসামিরই জামিনের আবেদন প্রত্যাখান করা হয়। এর আগে একই অভিযোগে বিএনপির আরো ১৫২ জন নেতা-কর্মীর জামিনের আবেদন নাকচ করা হয়। সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বেশ কয়েকজন নেতা এসব মামলার কয়েকটিতে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছিলেন। একবার আসামিরা জামিনে থাকলে এবং জামিনের অপব্যবহার না করলে জামিনে থাকার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা হয়। কিন্তু নিম্ন আদালত সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেনি।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ আদালতকে জানিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত একটি মামলার ঘটনার সংঘটিত দিনে তিনি ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি চিকিত্সার জন্য বিদেশে ছিলেন মওদুদ আহমদ। যেদিন জামিনের জন্য আদালতে হাজির হয়েছিলেন সেদিনই বিদেশ থেকে সরাসরি আদালতে যান তিনি। বিদেশে চিকিত্সা সংক্রান্ত কাগজপত্র আদালতে দাখিল করা হয়। ব্যারিস্টার মওদুদ ছাড়াও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমান, মির্জা আব্বাসসহ বেশ কয়েকজন অসুস্থতার যুক্তিতে জামিনের প্রার্থনা করেন। সাধারণত বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ বা সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে জামিনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বিরোধী দলের নেতাদের ক্ষেত্রে কোন বিবেচনায়ই আমলে নেয়নি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।
প্রসঙ্গত ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৬ ও ৪৯৭ ধারায় পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটকে কিভাবে জামিন দিতে হবে তার নির্দেশনা রয়েছে। ৪৯৬ ধারায় বলা হয়েছে, “জামিনের অযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যতীত কোন ব্যক্তি কোন থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার কর্তৃক বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার হইলে বা আটক থাকিলে বা আদালতে হাজির হইলে বা তাকে হাজির করা হইলে সে যদি উক্ত অফিসারের হেফাজতে থাকিবার সময় বা উক্ত আদালতের কার্যক্রমের কোন পর্যায়ে জামানত দিতে প্রস্তুত থাকেন তাহলে তাকে জামিনে মুক্তি দিতে হইবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত অফিসার বা আদালত উপযুক্ত মনে করিলে তাহার নিকট হইতে জামানত গ্রহণের পরিবর্তে সে অতপর বর্ণিতভাবে হাজির হইবার জন্য জামিনদার ব্যতীত মুচলেকা সম্পাদন করিলে তাহাকে মুক্তি দিতে পারিবেন।” আইনের এইরূপ স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও নিম্ন আদালত বিরোধী দলের নেতাদের জামিন পাওয়ার অধিকারকে খর্ব করেছে।
উল্লেখ্য, জামিন অযোগ্য বিধানেও আদালত চাইলে যে কোন ব্যক্তিকে জামিন দিতে পারেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারায় এই নির্দেশনা রয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত কোন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন এই মর্মে আদালত নিশ্চিত হলে তাকে জামিনে মুক্তি দেয়া যাবে না।
বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন-২০০২ এর আওতায়। এই আইনেও আসামিদের জামিনের নির্দেশনা রয়েছে। আইনের ১৩ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, “ফৌজদারী কার্যবিধিতে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, রাষ্ট্রকে শুনানির যুক্তিসংগত সুযোগ দিয়া এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করিয়া আদালত কিংবা আপিল আদালত যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, এই আইনের অধীন অপরাধ সংঘটনের জন্য অভিযুক্ত কিংবা, ক্ষেত্রমত, দণ্ডপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তিকে জামিন দেয়া ন্যায়সংগত হইবে তাহা হইলে তদ্?মর্মে কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া আদালত কিংবা, ক্ষেত্রমত, আপিল আদালত উক্ত ব্যক্তিকে জামিনে মুক্তির আদেশ দিতে পারিবে?” এছাড়া আইনের ৪(১) ধারা অনুযায়ী তারা যদি দোষী সাব্যস্ত হন তাহলে ৫ বছরের বেশি তাদেরকে কারাদণ্ড দেয়া যাবে না। সাধারণত এ ধরনের মামলায় নিম্ন আদালতে অহরহ জামিনের ঘটনা ঘটছে। এর চেয়ে গুরুতর অপরাধের মামলায়ও অর্থাত্ খুন, ধর্ষণের মামলায়ও আসামিরা জামিন পাচ্ছেন। এমনকি হলমার্ক কেলেংকারি সংক্রান্ত ১৩টি মামলায় একদিনে জামিন পেয়েছিলেন জেসমিন ইসলাম।
অপরাধের গুরুত্ব যত বেশিই হোক না কেন আসামি পলাতক না হয়ে আদালতে উপস্থিত হলে এবং বিচারে হাজির থাকবেন নিশ্চিত হলে আদালত জামিন মঞ্জুর করতে পারেন। ঢাকা ল রিপোর্টের ১৬ তম সংখ্যায় ৩২১ নম্বর পৃষ্ঠায় প্রকাশিত উচ্চ আদালতের রায়ে এ নির্দেশনা রয়েছে। দ্রুত বিচার আইনে মামলার চার্জশিট দেয়ার পরেও বিএনপির শীর্ষ নেতারা পলাতক না হয়ে সরাসরি আদালতে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু আলোচ্য ক্ষেত্রে তাদের জামিন মেলেনি। আসামি অসুস্থ থাকলে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আসামি জামিন পাওয়ার অধিকারী। ঢাকা ল রিপোর্টের ১৮তম সংখ্যায় প্রকাশিত ৩৯০ পৃষ্ঠায় এ নির্দেশনা রয়েছে। আলোচ্য মামলায় ব্যারিস্টার মওদুদসহ একাধিক আসামি অসুস্থতা সংক্রান্ত চিকিত্সা সনদ দাখিল করেছিলেন।
আইন বিশেষজ্ঞ ও বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাবেক এটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ল’র পরিচালক ড. শাহদীন মালিক বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের জামিন না পাওয়ার ঘটনাকে বিস্ময়কর বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলেছেন, এ ঘটনা প্রমাণ করে নিম্ন আদালত এখনো স্বাধীন নয়। ড. শাহদীন মালিক বলেন, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির মাধ্যমে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
