বেড়ানো

বলীখেলার মেলায়

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:৫২
১৩১৬ বঙ্গাব্দের ১২ বৈশাখ। খ্রিস্টাব্দ ১৯০৯। চট্টগ্রামের বদরপতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর চালু করেন বর্ণাঢ্য এক কুস্তি প্রতিযোগিতার। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করতেই তিনি এ খেলার সূচনা করেছিলেন। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ এবং একই সঙ্গে বাঙালি যুবকদের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আবদুল জব্বার এ বলীখেলার প্রবর্তন করেন। তার মৃত্যুর পরে এ খেলা পরিচিতি পায় জব্বারের বলী খেলা নামে। এরপর থেকে প্রতি বছর একই তারিখে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এ বলী খেলা। এ বছর বসছে জব্বারের বলীখেলার ১০৪তম আসর। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে চট্টগ্রামের মানুষ জমায়েত হন অন্যতম এ সামজিক উত্সবে। চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় বৈশাখি মেলাটিও বসে এ খেলাকে ঘিরেই। ১২ বৈশাখ, ২৫ এপ্রিল বলী খেলার মূল আসর বসলেও আগে পরে চার-পাঁচদিনের মেলা বসে চট্টগ্রামের লালদিঘীতে। এখনও বেশ জাঁকজমকভাবে আয়োজন করা হয় জব্বারের বলী খেলার। পঞ্চাশের অধিক বলী প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী আসেন খেলা উপভোগ করতে। একে একে লড়তে থাকেন বলীরা। শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই শেষে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় একজনকে। এখানকার বৈশাখী মেলার বিস্তৃতি আন্দরকিল্লা মোড় থেকে লালদিঘীর চারপাশ, হজরত আমানত শাহ (রহ.)-এর মাজার ছাড়িয়ে জেল রোড, দক্ষিণে বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়িয়ে কোতোয়ালির মোড় এবং পশ্চিমে সিনেমা প্যালেস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এটি মূলত চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম পুরোনো এবং বড় বৈশাখি মেলা। আগেই বলা হয়েছে জব্বারের বলী খেলার প্রধান আকর্ষণ বৈশাখি মেলা। এ মেলাকে ঘিরে নানান গ্রামীণ পণ্যের পসরা নিয়ে আসেন বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গা থেকে। নানান কুটির শিল্প সামগ্রী যেমন, মাছ ধরার চাঁই, বেতের তৈরি চালুনি, তৈজসপত্র, মাটির তৈরি পুতুল, মাটির তৈরি খেলনা, ফুলদানি, তালপাখা, টব, হাঁড়ি-পাতিল, কাঠ-বাঁশ বেতের তৈরি আসবাবপত্র, হাতপাখা, ঝাড়ু, কুলা, শীতল পাটি, পলো, মুড়ি-মুড়কি, নাড়ু, গাছের চারা, দা-বটি, বৈশাখি ফল, সবকিছুই পাওয়া যায় এ মেলায়। তবে এককালে মেলায় যেমন লোকজ গ্রামীণ পণ্যের অধিপত্য ছিল, বর্তমানে তাতে কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে। মৃত্ শিল্প কিংবা দারু শিল্পের পাশাপাশি প্লাস্টিক পণ্যেও সয়লাব হয়ে যাচ্ছে মেলা প্রাঙ্গণ। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও সুদূর আরাকান অঞ্চল থেকেও বলীরা এ খেলায় অংশ নিতে আসতেন। অতীতকালে রাজা-বাদশা কিংবা জমিদারদের কাছে কুস্তিগীরদের কদর ছিল। বীরের মর্যাদা পেতেন তারা। কিন্তু আধুনিক যুগে শত্রু দমনে নতুন নতুন অস্ত্র ব্যবহারের ফলে দিনে দিনে কমতে থাকে কুস্তিগীরদের কদর। তবে এখনও বৃহত্তর চট্টগ্রামের কিছু শৌখিন কুস্তিগীর খেলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। যাতায়াত ঢাকা থেকে সড়ক, রেল ও আকাশ পথে যাওয়া যায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। ঢাকা থেকে সড়কপথে গ্রিনলাইন পরিবহন, সোহাগ পরিবহন, সৌদিয়া পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, টি আর ট্রাভেলস ইত্যাদি পরিবহন সংস্থার শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল বাস চলাচল করে চট্টগ্রামের পথে। ভাড়া ১০০০-১২৫০ টাকা। এ ছাড়া এস আলম, সৌদিয়া, ইউনিক, শ্যামলী, হানিফ, ঈগল প্রভৃতি পরিবহনের সাধারণ মানের নন-এসি বাসও চলে এ পথে। ভাড়া ৩৫০-৫৫০ টাকা। রেল পথে ঢাকা-চট্টগ্রামের পথে মহানগর প্রভাতী ঢাকা ছাড়ে সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে, চট্টলা এক্সপ্রেস সকাল ৯টা বিশ মিনিটে, মহানগর গোধূলি ঢাকা ছাড়ে বিকেল ৩টায়, সুবর্ণ এক্সপ্রেস ঢাকা ছাড়ে বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে, তূর্ণা ঢাকা ছাড়ে রাত এগারোটায়। ভাড়া এসি বার্থ ১০৯৩ টাকা, এসি সিট ৭৩১ টাকা, প্রথম শ্রেণী বার্থ ৬৩৫, প্রথম শ্রেণী চেয়ার ৪২৫, স্নিগ্ধা শ্রেণী ৬১০ টাকা, শোভন চেয়ার ৩২০, শোভন ২৬৫, সুলভ ১৬০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমান, ইউনাইটেড এয়ার, রিজেন্ট এয়ার এবং নভো এয়ারের বিমানে সরাসরি যেতে পারেন চট্টগ্রাম শহরে। কোথায় থাকবেন চট্টগ্রাম শহরেই বিভিন্ন মানের বেশ কিছু হোটেল আছে। তবে এ ভ্রমণে থাকার জন্য লালদিঘী এলাকার কাছাকাছি জুবিলী রোড ও স্টেশন রোডের হোটেলগুলো ভালো হবে। জুবিলী রোডের ভালো মানের হোটেলগুলো হলো হোটেল টাওয়ার ইন, হোটেল সফিনা, হোটেল আল ফয়সাল ইত্যাদি। এসব হোটেলে ৮০০-৩৫০০ টাকায় রাত যাপন করা যাবে। এ ছাড়া স্টেশন রোডে থাকতে পারেন হোটেল এশিয়ান, হোটেল সুপার ইত্যাদিতে। খরচ জুবিলী রোডের মতোই। আলোকচিত্র :সৈয়দ জাকির হোসেন/বেঙ্গলপিক্স