ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী
ভাস্কর, মুক্তিযোদ্ধা
অন্তপুরের সাধারণ মেয়ে থেকে হয়ে ওঠেন নন্দিত ভাস্কর। ভাস্কর্যের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত অসামান্য প্রতিভা। তার অন্য পরিচয় তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আড়াই লক্ষের অধিক বীরঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার একজন। সামাজিক প্রেক্ষাপট যখন একাত্তরের বিভীষিকাময় দিনগুলোকে কটাক্ষ করে চলছিল অবিরাম, ঠিক সেইসময় ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন প্রিয়ভাষিণী। সমাজের তীর্যক দৃষ্টি উপেক্ষা করে নিমগ্ন হন গাছের শেকড় , শুকনো পাতা আর মরা ডালপালার মাঝে জীবন খুঁজে পেতে। বেছে নেন এক নির্মোহ শিল্পীজীবন। নিজের ‘বীরঙ্গনা’ পরিচয় প্রকাশ করে তিনি লাখ লাখ বীরমাতার প্রতিনিধিত্ব করে জানান দিয়ে গেছেন, মুক্তিযুদ্ধ তাদের জন্য লজ্জার বা কলঙ্কের নয়, মুক্তিযুদ্ধ গৌরব ও সম্মানের। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে এক কঠিন সময়ে তিন পুত্র সন্তান বুকে নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ঘর বেঁধেছিলেন প্রিয়ভাষিণী। জীবনসঙ্গী আহসানউল্লাহ আহমেদের সাথে বন্ধুর মতো সম্পর্ক থাকলেও তথাকথিত সম্ভ্রান্ত শ্বশুরালয়ে তিন শিশুকন্যা সমেত হয়েছিলেন পারিবারিক নির্যাতনের শিকার। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। কনিষ্ঠতম সন্তান হিসেবে দেখেছি প্রিয়ভাষিণীর আমৃত্যু সংগ্রামী জীবন। দেখেছি পোড় খাওয়া জীবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে তার আগুনপাখি ফিনিক্স হয়ে ওঠা। ছয় সন্তানের মা থেকে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের প্রিয় ‘মা’ হয়ে ওঠা। চাকরি করতেন বলে আমার শৈশবে মাকে তেমন কাছে পাইনি। ঘরে-বাইরে বিশাল পরিবারের দায়িত্ব দুই হাতে সামলেছেন। নিভৃতে করেছেন সমাজকর্মও। সেই সাথে চলেছে বাড়ির আঙিনায় তার সুনিপুণ ছন্দময় শিল্পকর্ম। স্বাধীনচেতা এ ভাস্কর প্রকৃতিকে যেমন আপন খেয়ালে চলতে দিতে ভালোবাসতেন, সন্তানদেরকেও প্রকৃতির মতো আপন স্বাধীনতায় বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছেন। লেখাপড়ার খোঁজ রাখতেন না খুব একটা। অবসরে একসাথে বসে হারমোনিয়ামে গান শেখাতেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা আবৃত্তি করে শোনাতেন। শিখিয়েছেন নিজেকে সম্মান করতে। উচ্চাভিলাষ নয়, বরং দেশপ্রেম আর এক আশ্চর্য জীবনবোধ গড়ে দিয়েছিলেন অজান্তে। মনের যে শক্তিতে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে জীবনের উত্সবে যোগ দেয়া যায় অনায়াসে। মায়ের চেয়ে পরম বন্ধু আর কে আছে এ ভুবনে?
আইভি জামান
ভাস্কর, প্রভাষক, উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়
মাটি, কাঠ, পাথর, মার্বেল এবং ব্রোঞ্জেঠাসা তার ‘সাহসী ভাস্কর্য সম্ভার’। তিনি এ দেশের খ্যাতিমান ভাস্কর আইভি জামান। ভাস্কর্যের সাথে জড়িয়ে আছেন প্রায় ৪০ বছর ধরে। পাশাপাশি শিক্ষকতায় যুক্ত রয়েছেন দীর্ঘ ৩৫ বছর। উদয়ন স্কুলের ছাত্রদের নিজের সন্তান বলেই ভাবেন তিনি। সামনে সন্তানসম একদল ছাত্রকে নিয়ে যুক্তরাজ্য যাচ্ছেন। হেনরি মুরের শিল্পকর্ম থেকে শেকসপিয়রের বাড়ি সব কিছু দেখানোর পাশাপাশি নতুন নতুন ভাবনা ভাগাভাগি করে নিতে চান ওদের সাথে। ক্লাসরুমে ঢুকে আম, আপেল, পটোল আঁকতে না শিখিয়ে বরং বাচ্চাদের ইচ্ছেখুশিমতো আঁকতে দেন। ক্লাসঘরটাকে আর্ট ইস্কুল বলে মনে হয় তখন। শিক্ষক হিসেবে না, মা হিসেবে ক্লাসে প্রবেশ করতে ভালো লাগে তাঁর। ‘কে হবে জয়নুল? কে হবে পিকাসো?’ এমন প্রশ্নের জবাবে যখন সবাই একসঙ্গে হাত তোলে গর্বে তাঁর বুকটা ভরে যায়, কেননা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে, একবার যে রংতুলি হাতে নেয় সে কোনো অন্যায় করতে পারে না। ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তান কপার আর অভয়ের স্নেহময়ী মা তিনি। শিল্পী মায়ের সন্তান কপার ফটোগ্রাফি নিয়ে ব্যস্ত। অভয় দেশের বাইরে কম্পিউটার সাইন্সে অধ্যয়নরত। মায়ের কাজের ব্যস্ততা বোঝেন, নতুন কাজের খোঁজখবর নেন নিয়মিত। এ অভ্যস্ততা তৈরিতে মায়ের অবদানই সবচেয়ে বেশি। সন্তানদের এই পাশে থাকা যেমন তাঁকে প্রাণিত করে তেমনি মনে করেন, ভালো কাজে পারিবারিক সমর্থন অর্জন করে নিতে হয়। নিজের ইচ্ছাশক্তি থাকলে কেউ কারো পথরোধ করতে পারে না। একুশ বছর বয়সে আইভি জামান যখন প্রথম মা হলেন তখন তিনি ঢাকা চারুকলার ভাস্কর্য বিভাগের ছাত্রী। দুই সন্তানের দেখভাল করে, তাদের স্কুলে দিয়ে অথবা খেলা বা ঘুমের সময়টাতে নিজের শিল্পকর্মে ঠিকই মনোনিবেশ করেছেন। বাচ্চাদের যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য বাড়িতেই স্টুডিও গড়েছেন। তারপরও বড় কোনো কাজের জন্য প্রয়োজনে ওয়ার্কশপে যেতে হয়েছে। কাজের ক্ষেত্রে জীবনসঙ্গী প্রখ্যাত ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান তাঁর সহযাত্রী বা অনুপ্রেরণা হলেও ভাস্কর আইভি তাঁর নিজের শিল্পকর্মের স্বকীয়তা বজায় রেখে কাজ করে চলেছেন নিয়ত। ভাস্কর্যের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ কখনো খরচসাপেক্ষ হয়ে উঠলে তা নিজের জমানো অর্থ থেকে ব্যয় করেন আইভি জামান। শখের কেনাকাটার চেয়ে নিজের পয়সায় ভাস্কর্য নির্মাণ তাঁর কাছে অধিক প্রিয়। শখ বা বিলাসিতা বলতে তাঁর কাজটুকুই। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তাঁর কাজের আনন্দকে দ্বিগুণ করে। নিজের মাকে হারিয়েছেন বহুদিন। জন্মভূমির মাটিতে মিশে আছে মায়ের দেহাবশেষ। দেশের মাটি তাই তাঁর কাছে মায়ের সমান। মা হিসেবে ভাস্কর আইভি জামানের প্রত্যাশা এদেশের সন্তানেরা সবাই সুন্দর মনের মানুষ হয়ে উঠুক। এই দেশ, মাটি ও মাকে ভালোবাসুক।
উর্মিলা শুক্লা
শিল্পী, ডিজাইনার, ফ্যাশন হাউজ ‘খুঁত’
উর্মিলা শুক্লা। এই সময়ের এক অনন্য শিল্পী মা। ছোট্ট তোতার মা। চারুকলা থেকে পাস করে দীর্ঘ সময় ডিজাইনার হিসেবে যাত্রার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর নিজেই গড়েছেন অনলাইনে খুঁত নামের ফ্যাশন হাউজ। পাতাটুনির মতো নিখুঁত বুননে ক্যারিয়ারের সঙ্গে জুড়ে নিয়েছেন শিল্পকর্ম আর সংসার। পোশাক বা গহনায় ডিজাইনের কাজটা বাড়িতে বসেই অনেকটা এগিয়ে নিলেও ছেলেকে স্কুলে আনা-নেওয়ার ফাঁকে নিজের কারখানায় নিয়মিত সময় দিয়ে থাকেন গুণী এ শিল্পী। জীবনসহচর রাহুল আনন্দ একাধারে গানের মানুষ, চিত্রশিল্পী এবং অভিনেতা। ছেলে তোতার সঙ্গে তার মায়ের সম্পর্ক সমবয়সী বন্ধুর মতো। মায়ের যতই ব্যস্ততা থাকুক, তোতার খেলার সঙ্গী, গল্প বলা বা শোনার সঙ্গী তাকে হতেই হয়। এমনকি ৯ বছরের তোতার নিজস্ব পাপেট দল আবোলতাবোল পাপেট থিয়েটারের একজন সক্রিয় সদস্য মা শুক্লা। তোতার বানানো পাপেটের গায়ের জামাগুলোর নকশা মাকেই করতে হয়। পুত্রের বাদ্যযন্ত্রের শ্রোতা হওয়া থেকে শুরু করে বায়না মেটাতে তার নির্দেশনা মেনে মা-ছেলে একসঙ্গে রান্না করাটাও তাদের কাছে এক মজার খেলা। নালন্দা বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র তোতা লেখাপড়ায় খানিকটা উদাসীন হলেও মা শুক্লা লেখাপড়ার চাপে সন্তানের শৈশবের সারল্য কেড়ে নিতে রাজি নন। জন্মলগ্ন থেকেই তোতা তার বাড়িতে শিল্পচর্চার শুদ্ধতার মাঝে লতায়-পাতায় বেড়ে উঠছে। মায়ের কাছ থেকে পাঠ নিচ্ছে ধরণীর বুকে ‘বন্ধনহীন, জন্মস্বাধীন, চিত্ত কোমল শতদল’ হয়ে আনন্দিত জীবনযাপনের। শিল্পী মায়ের সবুজ ছত্রছায়ায় তোতার আপন ভুবন তাই শৈশবের সহজ আনন্দে টইটম্বুর। মাতৃত্ব আর সৃজনশীলতার রঙে সদা বর্ণিল উর্মিলা শুক্লার শিল্পী জীবন।
