মানবতার ফেরিওয়ালা

আপডেট : ০৭ মে ২০১৯, ১৯:৪১

টাকার অভাবে কারো চিকিত্সা বন্ধ, কারো একটি হুইলচেয়ার দরকার, অর্থাভাবে কারো লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার পথে, কোনো অল্প বয়সী বিধবা নারী একটা সেলাই মেশিন হলেই স্বাবলম্বী হবে—সমাজের এমন অসহায় মানুষের কষ্ট লাঘবে তাদের পাশে

গিয়ে দাঁড়ান এম মনসুর আলী। পেশায় তিনি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং চিকিত্সাসেবার সঙ্গেও জড়িত। ছোট কাল থেকেই তার নেশা মানুষের উপকার করা। ১৯৯০ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ অরুয়াইল বহুমুখী

উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৮ম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি লাভ করেন। অরুয়াইল হাইস্কুল থেকে ১৯৯৩ সালে ৭৮০ নম্বর পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় স্টার মার্ক পেয়ে উত্তীর্ণ হন। তারপর নরসিংদী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএইচসি ও বিএ পাস করেন। ফেসবুকের কল্যাণে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান এম মনসুর আলী। তার সাক্ষাত্কার নিয়েছেন আকরাম হোসেন নাঈম

 

বাবা-মায়ের ষষ্ঠতম সন্তান এম মনসুর আলী। বাবা একজন কৃষক। গত দেড় বছরে তাঁর ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে সহায়তা পেয়েছে শতাধিক অসহায়-দরিদ্র, বিধবা এবং প্রতিবন্ধী মানুষ। ৪৫ বয়সী প্রতিবন্ধী সাইফুল ইসলাম তাঁদের মধ্যে একজন। স্থানীয় বাজারের রাস্তার পাশে শুয়ে শুয়ে ভিক্ষা করেন। শুয়ে থাকতে থাকতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরেছে। দুর্গন্ধে কেউ কাছে দাঁড়াতে পারে না। চতুষ্পদ প্রাণীর মতো হাত-পা ব্যবহার করে বাড়ি থেকে বাজারে আসা যাওয়া করত। টাকার অভাবে হুইল চেয়ার কিনতে এবং চিকিত্সা করাতে পারছিলেন না। খবর পেয়ে সাইফুল ইসলামের বাড়ি যান এম মনসুর আলী। সাইফুল ইসলামের অসহায়ত্বের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সাহায্যের আবেদন জানান। স্বহূদয়বান অনেকেই তার পোস্টে সাড়া দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়ান। সরাইলের ইয়াং স্টার ক্লাব সাইফুল ইসলামকে হুইলচেয়ার দান করেন। পাশাপাশি তার চিকিত্সার দায়িত্বও নেন কয়েকজন। তাঁরাই ৫ মাস যাবত সাইফুল ইসলামের চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করে আসছেন। সাইফুল ইসলাম এখন আগের চেয়ে অনেক সুস্থ জীবন যাপন করছেন। এভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে অসহায় ছাত্র-ছাত্রী, বিধবা নারী ও প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন এম মনসুর আলী। 

বিধবা তাহেরা (২৫) তিন বছর আগে তাহেরার স্বামী বাদাম বিক্রেতা মস্তু মিয়া (২৯) হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। এরপর থেকেই তাহেরা বেগম চার সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে জীবণযাপন করছেন। খবর পেয়ে মনসুর আলী তাহেরার বাড়িতে যান। অল্প বয়সী বিধবা তাহেরার অসহায়ত্বের ভিডিও চিত্র ধারণ করেন। ফেসবুকে সেই ভিডিও পোস্ট করলে তাহেরার সাহায্যে এগিয়ে আসেন অনেকেই। অবশেষে তাহেরাকে দেওয়া হয় একটি সেলাই মেশিন।

এলাকার এক প্রতিবন্ধী হোসাইনকে সাহায্যের জন্যও এগিয়ে আসেন মনসুর আলী। উদ্যোগ নেন তাঁকে হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার। তিনি জানান, ‘আমি প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক হোসাইনকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এসে ভাবলাম কিভাবে তাকে একটা হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। ভাবলাম ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে দেখি। এরপর দিন হোসাইনের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলাম। পোস্টের ১০ মিনিট পরই আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার তখনকার ইউএনও উম্মে ইসরাত চেয়ার দেবেন বলেন বলে ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে লিখেন এবং আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে হোসাইনের হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করেন। এভাবে কয়েকজন প্রতিবন্ধীর হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করে এলাকায় প্রশংশিত হই। এরপর প্রশংসার লোভে একের পর এক কাজ করতে থাকি। এখন এটা নেশা হয়ে গেছে। না করে পারি না।’

ফেসবুকের মাধ্যমে কাজটা কিভাবে হয় এর উত্তরে তিনি জানান, ‘সমাজে প্রচুর ভালো মানুষ আছেন, যাঁরা মানুষকে সহায়তা করতে চান, কিন্তু মানুষ আস্থা পান না বলেই সহায়তা করতে চান না। আমি নিজেই এসব মানুষের তথ্য সংগ্রহ করে তাঁদের সমস্যাগুলো ফেসবুকে পোস্ট করে সাহায্যের আবেদন করি। এ আহ্বানে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে অনেকেই সাড়া দিয়ে অর্থ পাঠান।’ মনসুর আলী মনে করেন, এই অর্থ সঠিকভাবে খরচ হয় বলেই হয়তো এই কাজটি তিনি চালিয়ে যেতে পারছেন।